সেবা প্রকাশনী || এ এইচ এম বজলুর রহমানের পাঠজীবনের এক শেকড়স্মৃতি

সেবা প্রকাশনী || এ এইচ এম বজলুর রহমানের পাঠজীবনের এক শেকড়স্মৃতি

এএইচএম বজলুর রহমান || 

সেবা প্রকাশনীর মতো একটি আইকনিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম স্থগিত করেছে, এমন খবর জানা নিঃসন্দেহে গভীর বেদনার। কারণ সেবা প্রকাশনী শুধু একটি প্রকাশনা সংস্থা নয়; এটি বাংলাদেশের কয়েক প্রজন্মের পাঠাভ্যাস, কল্পনাশক্তি, ভাষার সঙ্গে সম্পর্ক এবং জনপ্রিয় বইপড়ার সংস্কৃতির এক বড় নাম।

১৯৬৩ সালের মে মাসে ঢাকায় লেখক ও প্রকাশক কাজী আনোয়ার হোসেনের হাতে সেবা প্রকাশনীর যাত্রা শুরু। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতে এক অনন্য অবস্থান তৈরি করে। মাসুদ রানা, কুয়াশা, রহস্যপত্রিকা, অ্যাডভেঞ্চার, থ্রিলার, গোয়েন্দা কাহিনি, অনুবাদ সাহিত্য ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মাধ্যমে সেবা প্রকাশনী বইকে শহুরে অভিজাত পাঠচক্রের বাইরে নিয়ে গিয়ে বৃহত্তর পাঠকসমাজের হাতে তুলে দেয়।

বাংলা পেপারব্যাক সংস্কৃতিকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে সেবা প্রকাশনীর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। ছোট আকারের বই, সুলভ মূল্য, সহজ ভাষা, দ্রুতগতির কাহিনি এবং নিয়মিত প্রকাশনার কারণে সেবার বই তরুণ পাঠকদের কাছে দ্রুত গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। অনেক পাঠকের কাছে সেবা প্রকাশনী ছিল বইয়ের প্রথম প্রেম, পাঠজীবনের প্রথম উত্তেজনা, কল্পনার প্রথম দরজা।

এ এইচ এম বজলুর রহমানের পাঠজীবনের সঙ্গে সেবা প্রকাশনীর সম্পর্কও তেমনই এক শেকড়স্মৃতি। ভোলা দ্বীপের লালমোহন উপজেলায় বসে তিনি নিয়মিত সেবা প্রকাশনীর বই পড়া শুরু করেন। তখন আজকের মতো অনলাইন অর্ডার, কুরিয়ার সেবা, ডিজিটাল পেমেন্ট বা ই-বুক ছিল না। দূরের বই পেতে হলে চিঠি লিখতে হতো, ডাকঘরের ওপর নির্ভর করতে হতো, অপেক্ষা করতে হতো। সেবা প্রকাশনী ডাকযোগে ভিপিপির মাধ্যমে তাঁর লালমোহনের ঠিকানায় বই পাঠাত। এই সরল অভিজ্ঞতার মধ্যে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের পাঠসংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস।

ভোলা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের নদীবেষ্টিত এক জনপদ। চারদিকে নদী, মাঝখানে মানুষ, বাজার, স্কুল, ঘাট, বইয়ের দোকান, ডাকঘর আর স্বপ্ন। রাজধানী ঢাকার বইয়ের জগৎ থেকে দূরে থেকেও একজন তরুণ পাঠক বইয়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, এটাই ছিল সেবা প্রকাশনীর বড় শক্তি। প্রকাশনা সংস্থা, ডাকব্যবস্থা এবং পাঠকের আগ্রহ মিলে তৈরি করেছিল এক অদৃশ্য পাঠ-সেতু। সেই সেতু রাজধানী থেকে দ্বীপে, বইয়ের দোকান থেকে ঘরে, প্রকাশক থেকে পাঠকের হাতে বই পৌঁছে দিয়েছিল।

মানুষের বই পড়ার অভ্যাস অনেক সময় বড় লাইব্রেরি বা নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু হয় না। কখনো তা শুরু হয় ছোট পেপারব্যাক বই দিয়ে, ডাকপিয়নের অপেক্ষায়, নতুন বইয়ের মলাট ছুঁয়ে, কিংবা বন্ধুকে বই ধার দেওয়ার আনন্দে। লালমোহনে বসে সেবা প্রকাশনীর বই পড়া মানে ছিল নিজের ভৌগোলিক সীমার বাইরে পৃথিবীকে কল্পনায় দেখা। নদীবেষ্টিত এক জনপদে বসে পাঠক প্রবেশ করছেন আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, অভিযাত্রা, রহস্য, গোয়েন্দা অনুসন্ধান, বিজ্ঞান কল্পনা বা অনুবাদ সাহিত্যের জগতে। এই অভিজ্ঞতা শুধু বিনোদন নয়; এটি চিন্তাকে বড় করে, ভাষার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে, কৌতূহল জাগায় এবং প্রশ্ন করতে শেখায়।

সেবা প্রকাশনীর বইয়ের একটি বড় শক্তি ছিল ভাষা। সে ভাষা সহজ, গতিশীল, দৃশ্যমান এবং কথোপকথননির্ভর। পাঠককে আটকে রাখত না, এগিয়ে নিয়ে যেত। গল্প দ্রুত চলত, পাঠকও দ্রুত গল্পের ভেতরে ঢুকে যেত। আমাদের দেশে অনেক তরুণের বই পড়ার প্রথম বাধা হলো বইকে কঠিন মনে হওয়া। সেবা প্রকাশনী সেই ভয় ভেঙেছে। বই যে আনন্দের, উত্তেজনার, রহস্যের, কল্পনার এবং একাকিত্ব কাটানোর সঙ্গী হতে পারে, সেবা প্রকাশনী বহু পাঠককে তা বুঝিয়েছে।

পাঠাভ্যাস গঠনের জন্য আনন্দ একটি মৌলিক শর্ত। সেবা প্রকাশনী সেই আনন্দকে গণমানুষের নাগালে নিয়ে এসেছিল। সব পাঠক প্রথমেই উচ্চাঙ্গ সাহিত্য দিয়ে শুরু করেন না। অনেকে শুরু করেন রহস্য, থ্রিলার, অ্যাডভেঞ্চার বা অনুবাদ সিরিজ দিয়ে। পরে তাঁদের পাঠভুবন বিস্তৃত হয়। কেউ হয়তো রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মানিক, বিভূতিভূষণ, শরৎচন্দ্র, জীবনানন্দ, হুমায়ূন আহমেদ বা বিশ্বসাহিত্যের দিকে গেছেন। কিন্তু শুরুটা হয়েছে সেবা প্রকাশনীর কোনো পেপারব্যাক দিয়ে। তাই সেবাকে শুধু জনপ্রিয় সাহিত্যের প্রকাশক হিসেবে দেখলে তার পূর্ণ মূল্যায়ন হয় না; তাকে দেখতে হবে পাঠক তৈরির প্রতিষ্ঠান হিসেবে।

লালমোহনের মতো দূরবর্তী এলাকায় বসে ভিপিপির মাধ্যমে বই পাওয়া আজকের প্রজন্মের কাছে হয়তো অদ্ভুত মনে হতে পারে। এখন এক ক্লিকে বই অর্ডার করা যায়, পিডিএফ পাওয়া যায়, অডিওবুক শোনা যায়। কিন্তু একসময় ডাকঘরই ছিল দূরের জগতের দরজা। বইয়ের জন্য অপেক্ষা করা ছিল এক ধরনের আনন্দমিশ্রিত ধৈর্য। ডাকপিয়ন এলে মনে হতো, ঢাকা থেকে এক টুকরো সাহিত্য এসে পৌঁছেছে। খাম খুলে বই হাতে নেওয়া, নতুন বইয়ের গন্ধ নেওয়া, নিজের নাম লিখে রাখা, বন্ধুকে ধার দেওয়া, ফেরত চাওয়া, বই নিয়ে তর্ক করা, এসব ছিল সামাজিক পাঠসংস্কৃতির অংশ।

সেবা প্রকাশনী সেই পাঠসংস্কৃতিকে শক্তিশালী করেছিল। বই শুধু ব্যক্তিগত সম্পদ ছিল না; ছিল ভাগাভাগির বিষয়। একজন কিনত, পাঁচজন পড়ত। কেউ ভিপিপিতে আনত, অন্যরা ধার নিত। বইয়ের চরিত্র নিয়ে আলোচনা হতো, নতুন সংখ্যা কবে বের হবে তা নিয়ে অপেক্ষা থাকত। রহস্যপত্রিকা এ ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। রহস্য, রোমাঞ্চ, গোয়েন্দা ও অনুবাদ সাহিত্যের ধারাবাহিক প্রকাশ পাঠকের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করেছিল।

এ এইচ এম বজলুর রহমানের জীবনে সেবা প্রকাশনীর এই প্রভাব ব্যক্তিগত হলেও এর সামাজিক তাৎপর্য আছে। একজন তরুণ, যিনি ভোলা দ্বীপের লালমোহনে বসে সেবার বই পড়ছেন, পরবর্তী জীবনে গণমাধ্যম, ডিজিটাল গণতন্ত্র, তথ্যের অখণ্ডতা, যোগাযোগ অধিকার এবং উন্নয়ন ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তাঁর চিন্তার ভেতরে যে কৌতূহল, ভাষার প্রতি টান, বিশ্বকে জানার আগ্রহ, মানুষের গল্প বোঝার ক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তার শেকড়ে হয়তো সেই ভিপিপিতে আসা বইগুলোরও ভূমিকা রয়েছে।

বই মানুষকে শুধু তথ্য দেয় না; প্রস্তুত করে। বই একাকিত্বে সঙ্গ দেয়, ভাষা দেয়, কল্পনা দেয়, যুক্তি দেয়, ভেতরের পৃথিবীকে বড় করে। বিশেষ করে দ্বীপ, চর, মফস্বল বা দূরবর্তী অঞ্চলের তরুণদের জন্য বই অনেক সময় শহর, দেশ ও বিশ্বের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যম হয়ে ওঠে। লালমোহনে বসে সেবা প্রকাশনী পড়া মানে ছিল দূরত্ব অতিক্রম করা, নিজের সীমিত পরিবেশের বাইরে গল্প, চরিত্র, ভাষা ও কল্পনার বড় জগতে প্রবেশ করা।

আজকের ডিজিটাল যুগে এই স্মৃতি নতুনভাবে ভাবার দাবি রাখে। বই পৌঁছানোর মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু মূল প্রশ্ন একই আছে: আমরা কি তরুণদের হাতে বই পৌঁছে দিতে পারছি? গ্রাম, দ্বীপ, চর, পাহাড়, উপকূল, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, পাঠাগার ও কমিউনিটি সেন্টারে কি সুলভ ও আকর্ষণীয় বই পৌঁছাচ্ছে? ডিজিটাল কনটেন্টের ভিড়ে কি গভীর পাঠের আনন্দ টিকে আছে? শুধু পরীক্ষার বই নয়, কল্পনার বই, বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, রহস্য, ভ্রমণ, স্মৃতিকথা, ইতিহাস, জনপ্রিয় বিজ্ঞান, এসব কি তরুণদের নাগালে আছে?

সেবা প্রকাশনীর অভিজ্ঞতা আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়: পাঠক তৈরি করতে হলে বইকে সহজলভ্য, সুলভ, আকর্ষণীয় এবং নিয়মিত করতে হয়। বড় বড় সাহিত্য-আলোচনা পাঠক তৈরি করে না, যদি বই পাঠকের কাছে না পৌঁছায়। সেবা প্রকাশনী একসময় ডাকযোগে ভিপিপির মাধ্যমে সেই কাজ করেছে। আজকের দিনে একই কাজ করতে পারে অনলাইন বুকশপ, ই-বুক, অডিওবুক, মোবাইল লাইব্রেরি, কমিউনিটি পাঠাগার, স্কুলভিত্তিক বই ক্লাব এবং স্থানীয় বইমেলা। মাধ্যম বদলাতে পারে, কিন্তু লক্ষ্য একই: বইকে পাঠকের কাছে নিয়ে যাওয়া।

সেবা প্রকাশনীকে নিয়ে সমালোচনাও থাকতে পারে। অনুবাদ, রূপান্তর, কপিরাইট, সাহিত্যমান, জনপ্রিয়তার ধরন, এসব নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং হতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করা কঠিন: সেবা প্রকাশনী বাংলাদেশের বহু মানুষের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলেছে। এটি বইকে ভয়ংকর বা দূরবর্তী কোনো বস্তু হিসেবে রাখেনি; বরং পাঠকের হাতে এনে দিয়েছে। অনেকের কাছে সেবা ছিল সাহিত্যের প্রথম দরজা। সেই দরজা দিয়ে ঢুকেই বহু পাঠক পরে বড় সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি ও সমাজচিন্তার জগতে গেছেন।

এ এইচ এম বজলুর রহমানের সেবা প্রকাশনী-স্মৃতি তাই আমাদের সামনে একটি জরুরি প্রশ্ন রাখে: আমরা কি আজও এমন পাঠ-সেতু তৈরি করছি? যে তরুণ আজ ভোলা, লালমোহন, মনপুরা, চরফ্যাশন, হাতিয়া, কুড়িগ্রাম, বান্দরবান বা সুনামগঞ্জে বসে বই পড়তে চায়, তার কাছে কি বই পৌঁছাচ্ছে? নাকি ডিজিটাল বিনোদন, পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত কনটেন্ট তার গভীর পাঠের অভ্যাসকে সরিয়ে দিচ্ছে?

বই পড়া শুধু ব্যক্তিগত শখ নয়; এটি নাগরিক সক্ষমতার ভিত্তি। যে সমাজ পড়তে শেখে, সে সমাজ ভাবতে শেখে। যে সমাজ ভাবতে শেখে, সে সমাজ প্রশ্ন করতে শেখে। আর যে সমাজ প্রশ্ন করতে শেখে, সে সমাজ সহজে অন্ধকারে আটকে থাকে না। সেবা প্রকাশনীর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো একসময় সেই কৌতূহল জাগিয়েছে, যদিও তা শুরু হয়েছিল রহস্য, রোমাঞ্চ আর অ্যাডভেঞ্চারের আকর্ষণ দিয়ে।

ভোলা দ্বীপের লালমোহন থেকে সেবা প্রকাশনীর বই পড়ার স্মৃতি তাই শুধু এক ব্যক্তির পাঠজীবনের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের বই পৌঁছানোর ইতিহাস, পাঠক তৈরির ইতিহাস, জনপ্রিয় সাহিত্যের শক্তি এবং মফস্বল ও দ্বীপের তরুণ মনকে বিশ্ব-অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করার গল্প।

আজ যখন আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ, স্মার্ট বাংলাদেশ, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বা তথ্যসমাজের কথা বলি, তখন এই পুরোনো ভিপিপি স্মৃতির ভেতরেও এক শিক্ষা আছে। প্রযুক্তি বদলাতে পারে, মাধ্যম বদলাতে পারে, কিন্তু জ্ঞানের প্রতি কৌতূহল, বইয়ের প্রতি ভালোবাসা এবং পাঠকের কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব বদলায় না।

সেবা প্রকাশনীর কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার সংবাদ তাই শুধু একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; এটি আমাদের পাঠসংস্কৃতির জন্যও একটি সতর্কবার্তা। বইয়ের বাজার, পাঠকের অভ্যাস, প্রকাশনার অর্থনীতি, কপিরাইট, ডিজিটাল পরিবর্তন, তরুণদের মনোযোগ, সবকিছু নতুনভাবে ভাবতে হবে। কিন্তু সেবা প্রকাশনীর ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বই যদি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, পাঠক তৈরি হয়।

সেবা প্রকাশনীর বই হাতে পাওয়া সেই তরুণ হয়তো তখন জানতেন না, এই পাঠাভ্যাস তাঁর ভবিষ্যৎ চিন্তা, ভাষা ও জনসম্পৃক্ততার ভিত গড়ে দিচ্ছে। কিন্তু আজ ফিরে তাকালে বোঝা যায়, অনেক বড় যাত্রার শুরু হয় খুব ছোট একটি বই থেকে। কখনো তা আসে ডাকযোগে, ভিপিপিতে, ভোলার লালমোহনের কোনো ঠিকানায়। আর সেই বই খুলে যায় এক জীবনের দরজা।