LalmohanNews24.Com | logo

১৬ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ৩১শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মুক্তিযুদ্ধ এক বাণিজ্যিক পণ্য

বিজ্ঞাপন

মুক্তিযুদ্ধ এক বাণিজ্যিক পণ্য

বাণিজ্যের সেরা পণ্য এখন মুক্তিযুদ্ধ। বাজারে এর চড়া দাম। তিন শ’টাকা কেজি পেঁয়ারের চেয়ে কম না। আপনি এ নিয়ে বাজারে যাবেন, আগ্রহী ক্রেতার কাড়াকাড়ি দেখতে পাবেন। ধান-চালের মত কুইন্টাল বা মণে বিক্রি হয় না, কেজি বা সের দরেও এখন কেউ কেনার সাহস করে না। এ পণ্য বিক্রি হয় মহামূল্য সোনা-হীরার মত তোলায়-রত্তিতে। কেউ যদি কিনতেও না পারেন, তার শরীরে মুক্তিযুদ্ধের ছোঁয়া বা ঘ্রাণ লাগলেও চলে। তাহলে সে দিব্যি মুক্তিযোদ্ধা সেজে যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা বাগাতে পারে। কারো যদি বেকায়দা দুর্নাম থাকে অর্থাৎ যুদ্ধের সময় সরাসরি যুদ্ধের বিরোধিতা করার মত দুর্নাম, তবে সে নিজেকে সরাসরি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি না করে পক্ষের শক্তি হিসেবে দাবি করতে পারে। তাতেও বাজারে তার বেজায় মূল্য। দলীয় পরিচয় ধারণ করে একবার যদি কেউ হেঁড়ে গলায় দাবি করে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, তিনি তার দাবির পক্ষে অসংখ্য অনুরাগী-গুণগ্রাহী পেয়ে যাবেন।

মুক্তিযুদ্ধ এখন যেনতেন পণ্য না। রাজনৈতিক পণ্য। ক্ষমতায় যাওয়ার উৎকৃষ্ট পণ্য। এ পণ্য ব্যবহার করে শুধু অর্থবিত্তই কামানো যায় না। এটি ব্যবহার করে ক্ষমতার পাদপীঠে পৌঁছা যায়। এমপি-মন্ত্রীর মত মর্যাদাপূর্ণ আসন পর্যন্ত বাগিয়ে নেয়া যায়। অনেক সময় দেখা যায় বাড়ির মালিকের চেয়ে ভাড়াটিয়ার দাপট বেশি থাকে। বাড়ির মালিক ভাড়া তুলে খাওয়া ছাড়া তার বাড়ির যথার্থ ব্যবহারই করতে পারেন না । কিন্তু চতুর ভাড়াটিয়া সেটা ব্যবহার করে ব্যাংকলোন নিয়ে বড়সড় ব্যবসাও ফেঁদে বসতে পারেন। ধুরন্ধর ভাড়াটিয়ার মত অনেক চালবাজ লোক আছে, যারা যুদ্ধের সময় যুদ্ধে যায়নি, বরং কেউ কেউ বিরোধিতা করেছে। অথচ সময়ের ব্যবধানে তাদের বোল পাল্টাতে সময় লাগেনি। যুদ্ধ চলাকালীন বাটি চালান দিয়েও যুদ্ধের ময়দানে তাদেও নাম নিশানা খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু যুদ্ধেল পর তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি সেজে এমন আচরণ করেছে যা কোন মুক্তিযোদ্ধাও করার সাহস দেখায়নি। তারা এমন কথা বলেছে বা এমন বিবৃতি দিয়েছে যা শুনে মানুষ চমকে উঠেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এমন ভারপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, বানোয়াট মুক্তিযোদ্ধা, রাজাকার মুক্তিযোদ্ধা, ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাদেরই আজ জয়জয়কার। তাদের দোর্দণ্ড প্রতাপ আর আস্ফালনে, ন্যাক্কারজনক কর্মকাণ্ডে দেশের সাধারণ মানুষ লজ্জা পেলেও তারা কিছু মনে করে না। বরং তাদের নির্লজ্জ হাঁকডাক হম্বিতম্বি দিনে দিনে বেড়েই চলে। তাদের দাবির পক্ষে গ্লামার লাগানোর দায়িত্ব নিয়েছে পাশের একটি দেশ। সুবিধা বুঝে এরাও নেমে পড়ে দাদাদের দালালিতে। অত:পর অচল পয়সার মত এ বানোয়াট মুক্তিযোদ্ধারা সচল হয়ে গেল রাতরাতি। তারপর তারা নিজেদের আরও বেশি সচল ও গতিশীল করার জন্য একটা নতুন করে ফন্দি আঁটে এবং সময়ে সময়ে সস্তা কৌশলের আশ্রয় নেয়। তার মধ্যে একটি হল বর্তমান ভোটহীন দখলদার সরকার ও পার্শ্ববর্তী দেশের পক্ষে নি:শর্ত নির্লজ্জ দালালি এবং তাদের সবরকম অন্যায়-অপকর্মে চোখবুঁজে স্বীকৃতি দেয়া।

পার্শ্ববর্তী দেশ যখন দেখলো যে, বাংলাদেশের অচল বুদ্ধিজীবীরা নিজ নিজ উদ্যোগে ব্যবহৃত হতে চায় এবং এদেরকে অতিশয় সস্তামূল্যে ক্রয়ও করা যায় তখন এদেরকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির দাবিদার একটি রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত করে দেয়া হয়। রাজনৈতিক দলটিকে ক্ষমতায় টিকিয়ে থাকার প্রয়োজনে এবং তাদের অন্যায়-অসৎ-গণবিরোধী যে কোন কর্মকাণ্ডে এদের সমর্থ ও সহযোগিতা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। যেন এরা মুহূর্তে সরকারের হত্যা-নির্যতন, খুন-গুমের মত জঘন্য কর্মকেও জায়েজ বলে ফতোয়া দিতে পারে। তার উপর কেউ যদি দেশপ্রেমমূলক কর্ম করতে যায়, লেখা লেখে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে চায়, তৎক্ষণাৎ যেন এরা উল্টো ফতোয়া দিয়ে তাকে দূর্গন্ধযুক্ত করে ফেলতে পারে। এসব করার জন্য এদের গায়ের প্রলেপটা মুক্তিযুদ্ধের প্রলেপ হলেই চলে। তাহলে এদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়াটা দুরূহ হবে। বরং যারা নিতে যাবে, বা সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করবে তাদের যেন উল্টো রাজাকার, স্বাধীনতা বিরোধী বা পাকিস্তানপন্থী বলে স্তব্ধ করে দেয়া যাবে।

২০১৯ সালের আগস্ট থেকে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর কয়েক মাসের জন্য লকডাউন বা অবরুদ্ধ ছিল। সেটাই বোধকরি পৃথিবীর প্রথম লকডাউন। সে লকডাউনে সেখানকার সাবেক তিন মুখ্যমন্ত্রীকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল অর্ধবছর ব্যাপী। তার উপর দমনের নামে কতরকম অত্যাচার, অবিচার চালানো হল কাশ্মীরের নিরীহ জনতার উপর। তার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রদেশে অবস্থানরত মুসলিম ছাত্র-ছাত্রী শ্রমিক, ব্যবসায়ী, চাকরীজীবীরা তখন কিভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন সেটা নিশ্চয়ই এত তাড়াতাড়ি কারো ভুলে যাবার কথা নয়। ২০২০ এর জানুয়ারিতে দিল্লী এবং উত্তর প্রদেশের মুসলমানরা কিভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে তাও পৃথিবীর মানুষ দেখেছে। তাদের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে, রাস্তায় পিটিয়ে মারা হয়েছে, তাদের মসজিদসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। সেসব পৈশাচিক নিপীড়নের দৃশ্যও পৃথিবীর মানুষ দেখেছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে তারা লক্ষাধিক মানুষকে গুলি করে মেরেছে। হাজার হাজার গুম, অগণিত নারী-শিশু পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এসব নৃশংস ঘটনার পেছনে শুধু আরএসএস ও বিজেপি’র জঙ্গীরা ভূমিকা রেখেছে তা নয়, স্বয়ং মোদির পুলিশও এসবের পেছনে মদদ জুগিয়েছে। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হল, এসব মানবতাবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সারা পৃথিবীব্যাপী ধিক্কার-নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও আমাদের এ বস্তাপচা বুদ্ধিজীবীরা টু শব্দটি পর্যন্ত করেনি। এরা বিবৃতি দিল তখন যখন আমাদের একজন জাতীয় ক্রিকেটার একখানা ব্যাট নিলামে বিক্রি করল। সেই ব্যাট পাকিস্তানের একজন ক্রিকেটার উচ্চমূল্যে ক্রয় করল। এজন্য তাদের দুঃখ ও আক্ষেপের শেষ নেই। আমি যদি প্রশ্ন করি সেই ব্যাট তাদের দাদাদের দেশের কেউ কিনলো না কেন, বুদ্ধিজীবীরা তার কী জবাব দিবেন? এরা তক্কে তক্কে থাকে আর আড়ালে আবডালে চলে। ভারতের বিএসএফ যদি বাংলাদেশের সীমান্তে দৈনিক গুলি করে দশটা মানুষ মারে কিংবা তারা বিজিবি সদস্যদের ধরেও নিয়ে যায় এরা কিছুই বলবে না। কিন্তু এর বিরুদ্ধে যখন দেশের মানুষ সোচ্চার হয় তখনই এদের মুখে খৈ ফোটা শুরু হয়। তখন অত্যাচারী ভারতের বিরুদ্ধে নয়, বরং দেশের প্রতিবাদকারী জনতার বিরুদ্ধে এরা কড়া ভাষায় বিবৃতি দেয়।

বর্তমান জনধীকৃত দালাল বুদ্ধিজীবীদের অনেকে মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে বহুলভাবে পরিচিত ও সমাদৃত। যেমন হুমায়ুন সাহেবদের তিন ভাইয়ের কথাই ধরুন। তারা তিন ভাই নিজ নিজ অবদানের জন্য ধন্য, সেজন্যে তাদের ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাদের তিন ভাইই যুদ্ধে যাবার উপযুক্ত ছিল। তিন ভাই হুমায়ুন আহমেদ, জাফর ইকবাল ও আহসান হাবিব সকলেই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। অথচ তাদের একজনও মুক্তিযুদ্ধে যায়নি। বরং তারা পালানোর জন্য গিয়েছিল পাকিস্তানপন্থী শর্ষিনার পীর আবু সালেহ সাহেবের কাছে। যদি প্রশ্ন করেন, কেন তারা পালাতে গেল ? কেন পূর্ণ বয়স থাকা সত্ত্বেও দেশমাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে গেল না? অথচ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এদের বোল পাল্টাতে সময় লাগেনি। এরা শুধু বোলই পাল্টায়নি, বাবার মৃত্যুর কারণে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য হিসেবে থাকার বাড়ি থেকে শুরু করে যতরকম সুযোগ সুবিধা হতে পারে ততই তারা গ্রহণ করেছে। তাদের তিন ভাইয়ের আক্ষেপ , ১৯৮০ সালে কেন সেই স্বাধীনতা বিরোধী পীর সাহেবকে স্বাধীনতা পদক দেয়া হল ? তাদের মত আমারও একই বিষয়ে একই প্রশ্ন, একই কথা। কিন্তু এও সত্য, সেই পীর সাহেবকে পদক দেয়া না হলে আমরা কিভাবে জানতাম, এরা তিন ভাই যুদ্ধে না গিয়ে পাকপন্থী একজন পীরের কাছে আশ্রয় চাইতে গিয়েছিল। এরা যুদ্ধে না গিয়েও আজ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সবচেয়ে বড় তল্পিবাহক।

সকালে দেখেছেন এবং অনেকের কাছে হাস্যকর মনে হবে ২০১৩ সালে জামাত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে আওয়ামী সরকারের অর্থায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতায় শাহবাগ কেন্দ্রিক দ্বিতীয় পর্বের মুক্তিযুদ্ধ(?) শুরু হলে সেই যুদ্ধে অমুক্তিযোদ্ধা জাফর ইকবালই সেনাপতির ভূমিকা পালন করেন। তার সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন আরেক অমুক্তিযোদ্ধা রাজাকার শাহরিয়ার কবির। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী এই মুক্তিযোদ্ধা ১৯৭১ সালে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাই করেননি বরং মুক্তিযুদ্ধকে দুই কুকুরের কামড়াকামড়ি বলে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছেন।

সকলে রাজপুত্রের বন্ধু হতে চায়। যুদ্ধে না গিয়েও কেউ কেউ বীর হতে চাইবে, একে আমি দোষের কিছু মনে করি না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের নামে অন্যায়-অসত্যে নিয়োজিত হওয়া ঘোরতর অন্যায়। কারণ রাজপুত্রের বন্ধুর কাছ থেকে মানুষ রাজকীয় আচরণই আশা করে, নোংরামি নয়। অথচ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ব্যক্তিগণ যখন নগণ্য স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি সেজে নোংরামিতে লিপ্ত হন এবং চেতনা ফেরি করে বেড়ান তখনই কেবল কষ্টটা বুকে ধরে রাখতে পারি না।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আমাদের গ্রেট কবি বুদ্ধিজীবী শামসুর রাহমান, সাহিত্যিক কবির চৌধুরী, লেখক সৈয়দ শামসুল হক, ইতিহাসবিদ মুন্তাসির মামুন কে কোথায় ছিলেন ? সকলেই পাক সরকারের প্রদত্ত বিভিন্ন চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন। যুদ্ধ চলাকালীন সময়েও তারা চাকরি ছাড়েননি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তাদের কোন ভূমিকাই ছিল না। তারা কোন যোদ্ধাকে একবেলা খাওয়ানোর মত কাজও করেনি। শেষের দিকে এসে সুবিধা বুঝে দু চারটা কবিতা লেখেছেন মাত্র। এদের সাথে যুক্ত করা যায় ১৪ ডিসেম্বর নিহত শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নামও। তারাও যুদ্ধে যাননি, বরং ঘরে বসে অতিশয় শান্তিতে দিন যাপন করেছেন। এ কি বিশ্বাস করা যায়, দেশে যুদ্ধ চলতে, তাও যেনতেন যুদ্ধ না, স্বাধীনতা যুদ্ধ। একটি জাতির মরণ বাঁচন যুদ্ধ, সেই যুদ্ধের সমর্থক হয়েও তারা ঘরে বসে থাকবেন, পালাবেন না, যোদ্ধাদের সাহায্য সহযোগিতা করবেন না- তা কি হয় ?
লেখক আহমদ ছফার এক নিবন্ধে দেখা লেখেছেন, এই বুদ্ধিজীবীরা একজন ছাত্রকে একবেলা খেতে দেয়নি, একরাত থাকতে দেয়নি, মুক্তিযুদ্ধের কথা শোনার পর ঘরের গেট পর্যন্ত খোলেনি। তারা চাকরি করেছে, বেতন নিয়েছে, আরামে জীবনযাপন করেছে, তারা স্বাধীনতার দু’দিন আগে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ায় রাতারাতি মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেল। তাদের বংশধররা শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে সবরকম সুবিধা ভোগ করল। অথচ যারা যুদ্ধ করেছে, শহীদ হয়েছে, গায়ের রক্ত ঝরিয়েছে, তারা বা তাদের বংশধররা কিছুই পায়নি। তবে হ্যাঁ, শহীদুল্লাহ কায়সার, জহির রায়হানসহ মুক্তিযুদ্ধে অনেকের বিরোচিত অনেক ভূমিকাও ছিল । মুশকিল হল, তাদের কেউ ১৪ ডিসেম্বর শহীদ হয়নি, তাদের মৃত্যু হয়েছে স্বাধীনতা লাভের পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির কুচক্রীদের হাতে। আবার কেউ কেউ শহীদ হয়েছেন ২৫ মার্চ কালরাতে বা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাক সেনাদের হাতে। তারা অবশ্যই সম্মানের পাত্র। তাদের জানাই শ্রদ্ধা ও সালাম।

এবার চেতনা নিয়ে দু’চার কথা বলি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এখন এমন এক মহৌষধ যা ব্যবহার করে ফকির ধনী হয়, ধনী মহাধনী হয়। এ মহৌষধ ব্যবহার করলে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, রাহাজানি সবাই হালাল হয়ে যায়। দেশের সম্পদ লুট, অন্যের বাড়ি-জমি-ব্যবসা দখল সবই জায়েজ হয়ে যায়। চেতনা বিশ্বাসীদেও পরিশ্রম করে কোন কাজ করা লাগে না। কষ্ট করে খেতে-খামারে ফসল ফলানো লাগে না, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা শিল্প কারখানা গড়া লাগে না। কেবল জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে অন্যের গড়া প্রতিষ্ঠান দখল করলেই চলে। আর আওয়ামি লিগ এমন একটি রাজনৈতিক দল, এ দলে ছারাছার রাজাকার, খুনীও যদি এসে যোগ দেয় সে মুহূর্তে মুক্তিযোদ্ধা বনে যায়। দেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত অসংখ্য অগণিত এমন লোক আছে, যারা যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের গালিগালাজ করেছে, লুটপাট করেছে, ধরিয়ে দিয়েছে বা শান্তি কমিটির দায়িত্বশীল পদে থেকে তাদের দৌড়ের উপর রেখেছে, অথচ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা দ্রুত খোলস বদল করেছে এবং আওয়ামি লিগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেছে। ফলে যত রকম রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা আছে সেসব বাগাতে তাদের মোটেই বেগ পেতে হয়নি।

যদি বলেন, সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুজিব পরিবারের মুক্তিযোদ্ধাদের একটা তালিকা দিন। গায়ের জোরে নয়, তালিকাটা দিতে হবে ইতিহাসকে সাক্ষী রেখে। সত্যাশ্রয়ী কোন গবেষক কী বলবেন? মাইক্রোস্কোপ দিয়ে খুঁজে নয় বরং সত্যকে উপস্থাপন করবেন? পারবেন কি তিনি পরম সেই সত্যকে খুঁজে বের করতে? শেখ মুজিব ২৫ মার্চ রাতেই গ্রেফতার হয়ে পাকিস্তান চলে যান। তার পরিবারের বাকি সদস্যরা তারপর থেকে পাকআর্মির ছত্রছায়ায় নিরাপদেই ছিলেন। তাদের নির্দিষ্টহারে মাসিক ভাতা দেয়া হতো এবং সময়মত পাক সরকারের ফান্ড থেকে টাকা নিয়ে বাজারঘাট করে দেয়ার ব্যবস্থাও ছিল যথাযথ। সে আশ্রয়স্থল থেকে শেখ সাহেবের দু ছেলে শেখ জাামল ও শেখ কামাল পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। কিন্তু কোন রণাঙ্গণে তারা যুদ্ধ করেন, আমরা সেটা কেউ জানতে পারি না। মক্তিযুদ্ধেও সর্বাধিনায়ক কর্নেল ওসমানীর টু আইসি হিসেবে শেখ কামালের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় পাকআর্মিও সারেন্ডারের দিন। এর আগে তাকে কোথাও দেখা যায়নি। দেশের কোন রণাঙ্গনের কোন যোদ্ধাদের তালিকায় তার নামও নেই। বাম রাজনৈতিক নেতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক হায়দার আকবর খান রোণো তার এক পুস্তকে লেখেন, শেখ পরিবারের কোন দূরতম সদস্যও মুক্তিযুদ্ধে যায়নি। গেলে দৃশ্যমান প্রমাণ থাকতো এবং ইতিহাসে তাদের ভূমিকার কথাও উল্লেখ থাকতো। তা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর সম্মানের দিকে চেয়ে কেউ তাদের দোষেনি। তার দুই পুত্রসহ সকল শহীদ বুদ্ধিজীবীরাও সর্বোচ্চ সম্মানে সম্মানিত।

সকলের জানা থাকার কথা, মাত্র কয়েক মাস আগে ঘটনাটি ঘটেছিল। ২০১৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর পত্রপত্রিকায় সরকারের তত্ত্বাবধানে রাজাকারদের এক তালিকা প্রকাশিত হয়। দেখা গেল প্রকাশিত দশ হাজার নামের মধ্যে আওয়ামি লিগের সংখ্যাই সর্বোচ্চ। অর্থাৎ দশ হাজার রাজাকারের ৮ হাজার ৬০ জন সরাসরি দল আওয়ামি লিগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বিএনপি করেন এমন নেতা আছেন ১০২৪ জন, জামাতের ৩৭ জন এবং অন্যান্য দলের রাজনীতি করে এমন লোকের সংখ্যা ৮৭৯ জন। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, যে আওয়ামি লিগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির দাবিদার এবং হরদম হারপদেক্ষেপে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কারবার করেন সে দলেই রাজাকারের সংখ্যাই সর্বাধিক। আর যে জামাত রাজাকারের দল হিসেবে পরিচিত এবং প্রতি মুহূর্তে অপমানের মুখোমুখি হয় সে দলে রাজাকার মাত্র ৩৭ জন। আর যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে সেই সাকা চৌধুরী, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, কামরুজ্জামান ও মীর কাশেম আলী তালিকার কোথাও তাদের নাম নেই।
এ তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর যখন সমালোচনার ঝড় ওঠে তখন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তালিকা প্রকাশ স্থগিত রাখা হয়। ততক্ষণে সে তালিকা দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে। খোদ শেখ পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম তালিকায় থাকায় জনগণ হতভম্ব হয়ে যায়। জনগণ বলতে থাকে আওয়ামি লিগের প্রকৃত পরিচয় কি আর কী নিয়ে রাজনীতি করে।

সব দেশের বুদ্ধিজীবীদের একটা দূরদর্শীতা থাকে। আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের বোধ করি সেটা ছিল না। কারণ তারা ১৯৭১ সালের মার্চের আগ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ বা দেশের স্বাধীনতা নিয়ে একটা ছড়া-কবিতা বা প্রবন্ধ-নিবন্ধ কিছুই লেখেনি। সাহস করে বিবৃতি বা বক্তব্য দেয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। তারা বিশ্বাসই করতো না, আমরা শীঘ্রই একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছি এবং তা অর্জিত হবে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে। বরং স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতেন কিছু রাজনৈতিক নেতা, সাধারণ সেনা সদস্য ও ছাত্রসামজ।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের একসময়কার তাত্ত্বিক নেতা জনাব সিরাজুল আলম খানের বুদ্ধিজীবী প্রসঙ্গে কয়টা লাইন উল্লেখ করছি- ‘১৯৬৫-৬৬ এর পর থেকে ১৯৭১ এর মার্চ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত কোন কবি সাহিত্যিক বাঙালির স্বাধীনতার পক্ষের কোন প্রবন্ধ, নাটক বা উপন্যাস লেখেননি। একটি ছড়া পর্যন্ত তারা লিখতে পারলেন না। ২৫ মার্চ ধ্বংসলীলার আগ পর্যন্ত এরা ছিলেন প্রায় নির্বাক। মনের নিভৃতে তাদের অনেকে হয়তো বা স্বাধীনতার গোপন বাসনা পুষে রেখেছিলেন। কিন্তু বাসনার ঐ শিখাটি আলো দিতে পারেনি আর একজন মানুষকেও। স্বাধীনতার পরবর্তীকালে এদের অনেকে আরোহন করেছেন খ্যাতির শীর্ষে, অভিষিক্ত হয়েছেন নানান সম্মান ও পুরস্কারে।’
‘তবে কারো জন্যই কোনকিছু অপেক্ষা করে থাকে না। বয়স্ক কবি সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা দালালি করেছেন। কিন্তু ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের তরুণ যুবারা তাদের শিল্প সাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে জাগরণের বাণী প্রচার করেছিলেন। ……..স্বাধীনতা যুদ্ধের অব্যাবহিত পূর্বে দু’একজন শিল্পী বাদে আর কাউকে আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে শামিল করাতে পারিনি। স্বাধীনতার পর তারা যে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সুবিধা ভোগ করেছিলেন এবং করছেন তা আমাদের শিল্প-সাহিত্য জগতকে বিভ্রান্ত এবং কালিমালিপ্ত করার জন্য দায়ী। একথা চলচ্চিত্র-সাহিত্য ও সংস্কৃতিসহ সবক্ষেত্রের বেলায় প্রযোজ্য।’ (আমি সিরাজুল ইসলাম খান, একটি রাজনৈতিক জীবনালেখ্য পৃষ্ঠা- ৬৬-৬৭)
সেই আমলের গা ঢাকা দেয়া বুদ্ধিজীবীরা আজও চেতনা ফেরি করে ফিরেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পসরা বহুমূল্যে বিক্রি করে বেড়ান। সুযোগ বুঝে তারা কারো কারো কাছ থেকে উচ্চ মূল্য আদায় করে ছাড়েন।

আজ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে কথিত আওয়ামি লিগ ক্ষমতার পাদপীঠে। আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের এখন চরম সুদিন। তাদের পাঁচ আঙ্গুলে ঘি। তাদের কথার অনেক মূল্য। কিন্তু করোনা মহামারির এ মহাদুর্যোগে তারা কোথায় ? তারা যে বেঁচে আছে সেটাও তো বোঝার উপায় নেই। জনগণের দুঃসময়ে তারা একেবারে মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন। শুধু আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের কথা বলছি কেন, শেখ পরিবারের লোকজন যারা মুক্তিযুদ্ধ না করেও যুদ্ধ অব্যবহিত পরে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করেছেন, অথচ যুদ্ধকালীন দুঃসময়ে তাদের টিকিটিও দেখা যায়নি। একইভাবে করোনা মহামারির মহাদুর্যোগে শেখ পরিবারসহ আওয়ামী নেতাদের খাবার-দাবার নিয়ে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু কি আশ্চর্য কোথাও তাদের নাম নিশানাও দেখা যায় না। যতদূর জানি ২০১৮ সালের নির্বাচনে শেখ পরিবারের ২২ জন সদস্য নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। সেই ২২ জনের মধ্যে কয়জনকে হতদরিদ্র মানুষের পাশে দেখা গেছে ? মুক্তিযুদ্ধের সময়ও দালাল বুদ্ধিজীবীদের মত তাদেরও কোন তৎপরতা ছিল না। ভয়ংকর অপতৎপরতায় লিপ্ত হয় দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। এ বিষয়ে ড. হুমায়ূন আজাদের কিছু কথা প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন- ‘মুক্তিযুদ্ধেও সময় আমরা সবাই ত্রিপুরা বা পশ্চিমবঙ্গে যাইনি, যেতে পারিনি, যাওয়া সম্ভব ছিল না, গেলে মুক্তিযুদ্ধ হতো না। কিন্তু গিয়েছিলেন অনেক শক্তিমান। ফিরে এসে তারা এমন আচরণ করতে থাকেন যে, দেশে যারা ছিল তারা সবাই রাজাকার। …..ফিরে এসে তারা এমন আকর্ষণীয় পদ ও সম্পদ অধিকার করতে থাকেন, যেনো দেশের সবকিছুই তাদের প্রাপ্য।…..১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত যারা ছিল অন্য কাজে, ১৬ ডিসেম্বরে দেখা গেল মুক্তিযোদ্ধারূপে, এরাই শুরু করে লুটতরাজ, পরিত্যাক্ত বাড়িঘর দখল, বিভিন্ন কারখানার প্রশাসক হয়ে বিক্রি করে দিতে থাকে সবকিছু। পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া ব্যবসা দখলে মেতে উঠেছিল অজস্র বাহিনী; সবচেয়ে বেশি দক্ষতা দেখিয়েছিল মুজিববাহিনী নামের একটি সংঘ।’ (আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, পৃ:৪২,৪৩,৪৭)
যারা ছিল প্রকৃত যোদ্ধা যুদ্ধের পর তাদের উপর খড়গ নেমে আসে। তারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। যারা পালিয়ে থাকতে পেরেছিল তাদের জীবন বেঁচে গেছে। যারা পালাতে পারেনি সেই তরুণ-সাহসী যোদ্ধারা নিঃশেষ হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শেষ সময়ে ভারত ফেরৎ মুজিব বাহিনী কেন রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের ওপর চড়াও হল? কেন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নি:শেষ করে দিতে চাইলো, এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একজন জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছেন- যারা বিদেশ ফেরৎ তারা প্রকৃত যোদ্ধা না, যুদ্ধ করার প্রয়োজনও হয়নি তাদের। যোদ্ধা হিসেবে তাদের দাবি ছিল মিথ্যা। সেই মিথ্যাকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তো প্রকৃত যোদ্ধাদের বাঁচিয়ে রেখে সম্ভব ছিল না। একারণে প্রকৃত যোদ্ধাদের চিরতরে নিস্তব্ধ করে ফেলাই ছিল তাদের আসল উদ্দেশ্য। আর এজন্যই আসল মুক্তিযোদ্ধরা স্বাধীনতার উষালগ্নেই নৃশংস হামলার শিকার হয়। যুদ্ধ না করেও তারা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাতারাতি মাঠ দখল করে। তারপর শুরু হয় দখলের রাজনীতি। যে ধারা আজও বহমান।

অন্যায় যারা করে তাদের কিছু দোসর থাকে। আওয়ামি লিগের তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধেও পক্ষের নেতারা অন্যায় করেছেন আর অচল বুদ্ধিজীবীরা তাদের পক্ষে ফয়োতায়াবাজি করেছেন। কাজ না করে শুধু ফতোয়া দিয়ে যদি মাল কামানো যায় তাহলে কোন বোকা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করতে যায়। এরা বোকা নয়, বরং মহাধুরন্ধর। অন্যের ঘাড়ে বসে অন্যেও ক্রেডিট নিয়ে মোয়াটা তারাই খেয়ে গেল। কিন্তু তারা কি জানে না, নিজেদের বিবেক জলাঞ্জলি দিয়ে তারা যে অসত্য অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে তা অতীব নিকৃষ্ট এবং অপমানকর? তারা হয়ত মনে মনে ভাবে, তারা হয়ত ভাল কর্ম করছে। কিন্তু গণমানুষের কাছে তাদের কর্ম ও চরিত্র আয়নার মত পরিষ্কার। এ কারণে তারা না জনসমক্ষে গিয়ে বুক ফুলিয়ে কথা বলতে পারে, না তারা মানুষের শ্রদ্ধা-ভালবাসা পাবার আশা করতে পারে। তারা সত্য গোপন করে এবং সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করে। এরা এক ধরনের অভিশপ্ত জীবনযাপন করে এবং এ অভিশপ্ত জীবন নিয়েই তাদের ইহজীবন ত্যাগ করতে হবে। চেতনাধারী এ অমুক্তিযোদ্ধারাই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দুর্বৃত্তি করেছে এবং জুলুমবাজ সরকারকে দুর্বৃত্তায়নের সুযোগ করে দিয়েছে। এ এক গুরুতর অপরাধ এবং জাতির জন্য এক ট্রাজেডি। আমি চাই এ অপরাধেরও একদিন বিচার হোক।

১৯৭১ সালে দেশমাতৃকার মুক্তির আহ্বানে সাড়া দিয়ে যারা যুদ্ধে গেছে এবং জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছে তাদের প্রায় সকলে অতি সাধারণ এবং সরলপ্রাণ মানুষ। তারা কখনোই বুদ্ধিজীবীদের মত কুটিল জটিল ধান্দাবাজ না। দেশ স্বাধীন করার পেছনে তাদের প্রাপ্তির একটা ক্ষীণ আশা আকাঙ্খা থাকলেও তারা সেটা পায়নি। বরং যুদ্ধে যাওয়াটাই কারো কারো জন্য কাল হয়ে গিয়েছিল। তারা দখলদার মুজিব বাহিনী, রক্ষিবাহিনী, লাল বাহিনীসহ নানারকম বাহিনীর আক্রমনের শিকার হয়। যুদ্ধের পর যারা দখলের রাজনীতি করেছে তাদের কেউ যুদ্ধ করেনি। এদের বেশির ভাগ এলাকায় হোমড়া গোমড়া এবং গলাবাজ, লাঠিয়াল গোছের লোকজন, যুদ্ধের সময় এরা গা ঢাকা দিয়েছিল। কেউবা যুদ্ধের সময় সীমান্ত পার হয়ে ওপারে গিয়ে আরাম-আয়েশে দিন যাপন করেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারাই খোলস বদল করে সমূর্তিতে আবির্ভূত হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
অবশ্য এভাবে রূপ বদল করাকে আমি অপরাধ মনে করি না। অপরাধ হল প্রকৃত যোদ্ধাদের মাঠ থেকে বিতাড়িত করে নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের সোল এজেন্ট সেজে বসা। যারা যুদ্ধ করেছে তাদের কেউ কেউ আজ নানারকম বদনামের শিকার। খেতাবপ্রাপ্ত অনেকে বীরযোদ্ধাকেও এরা রাজাকার তকমা দিতে দ্বিধা করেনি।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তথাকথিত এসব মুক্তিযোদ্ধাকে চিনতেন, তাদের খোলস বদলের কাহিনীও জানতেন। যেহেতু তিনি নিজে রণাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তিনি কি দেখেননি, কে যুদ্ধ করেছে, আর কে করেনি। সব জেনেও তিনি খোলামনে এগিয়ে এলেন এবং দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে সকলকে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। তিনি ফাটল রাখতে চাননি। চাই তারা রাজনীতিক হোক বা পেশাজীবী, উকিল হোক বা শিক্ষক, অভিনেতা হোক বা সঙ্গীতশিল্পী, তিনি দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সকলকে এক ছাতার নিচে সবাইকে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। তিনি চাইলেন, যে যার জায়গা থেকে প্রত্যেকে যেন দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। কাদা ছোঁড়াছুড়ি করতে দিলে অনৈক্যের সৃষ্টি হবে এবং জাতি হিসেবে আমরা দুর্বল হয়ে যাব। তিনি নিজেও বক্তৃতার মাধ্যমে কাউকে দুষতেন না, অন্যরাও দোষাদুষি করুক চাইতেন না। এজন্য তার সময়ে দুষ্ট লোকগুলি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠতে সাহস পায়নি। এদের প্রতাপ বৃদ্ধি পায় প্রেসিডন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাত লাভের পরে দাদাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঘাতক-দালাল-নির্মূল কমিটির ছদ্মাবরণে। সেই যে শুরু সে প্রক্রিয়া এখনো চলছে এবং অনেকদিন চলতে থাকবে।

মুক্তিযুদ্ধ আজ আর অহংকার নয়, বাণিজ্যিক পণ্য। একে যে যত রং লাগিয়ে চমৎকার করে উপস্থাপন করতে পারবে মার্কেটে তার ততই কদর। এর অহংকার প্রকৃত যোদ্ধাদের হাতছাড়া হয়ে এখন চেতনাধারীদের হাতে। তারাই এখন একে উচ্চমূল্যে বিক্রি করে। প্রকৃত যোদ্ধারা চাইলেও একে হস্তগত করতে পারছে না। একে হস্তগত করতে দাদাদের হস্তক্ষেপ লাগবে। তাদের নিয়োজিত এজেন্টরাই এখন এর হকদার। সেই এজেন্ট দালালরা যত দাম হাঁকাবে আপনি তত মূল্যেই একে খরিদ করতে বাধ্য থাকবেন। আর যদি অবহেলার চোখে দেখেন, আপনার রাজাকার বা স্বাধীনতা বিরোধী তকমা পেতে মোটেই বিলম্ব করার দরকার হবে না।

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেও আজ অনেকে বড় বড় মুক্তিযোদ্ধা। বড় বড় রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা তাদের করতলগত। যারা যুদ্ধ করেছে তারা স্বধীনতার উষালগ্নেই ভয় পেয়ে গেছে, সেই ভয় আর কাটেনি। কারণ তারা চোখের সামনে দেখেছে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করা বীররা কিভাবে বেঘোরে প্রাণ হারিয়েছে। সর্বোপরি পুরো জাতি ১৯৭৪ সালে ভয়বহ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েছিল। তখন মুক্তিযুদ্ধের নাম উচ্চারণ করাই দুষ্কর ছিল।

আমি অনেক সাহসী বীরযোদ্ধাকে দেখেছি, যারা সার্টিফিকেট নেননি বা গলা ফাটিয়ে বলতে চাননি, তারা যুদ্ধ করেছেন। তারা বলেছেন, দেশের প্রয়োজনে যুদ্ধ করেছি, সুযোগ সুবিধা নেয়ার জন্য নয়। তাছাড়া এমনসব উদ্ভটা লোকরা নিজেদের মুক্তিযাদ্ধা বলে দাবি করে সুযোগ নেয়, অন্যায়-অপকর্মে লিপ্ত হয়, তাদের লজ্জাজনক কর্মকাণ্ড দেখে নিজেকে যোদ্ধা দাবি করতে লজ্জা হয়। যুদ্ধকে যারা পণ্য বানিয়ে বিক্রি করতে চায় করুক, আমরা সেটা নিয়ে কথা বলতেও রাজি না।

এই ক্ষুব্ধ মুক্তিযোদ্ধারাই প্রকৃত বীর। আমরা তাদের স্যালুট করি, কিন্তু যারা যুদ্ধকে পণ্য বানিয়ে যারতার কাছে বিক্রি করে বেড়ায়, তারা একদিন আস্তাকুঁড়েই নিক্ষিপ্ত হবে এবং ইতিহাস অবশ্যই একদিন তার বিচার করবে।

Facebook Comments Box


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি