LalmohanNews24.Com | logo

১৬ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ৩১শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

ভোলা বনাম সিঙ্গাপুর

বিজ্ঞাপন

ভোলা বনাম সিঙ্গাপুর

কালাম ফয়েজী।।
সম্প্রতি প্রায়ই শুনি ভোলাকে সিঙ্গাপুরের সাথে তুলনা করতে। আমাদের দ্বীপজেলা ভোলা নাকি শীঘ্রই সিঙ্গাপুর হতে চলেছে। বিশেষ করে ভোলায় গ্যাসকূপ খননের পর থেকে এ উদারহরণটা হরহামেশা দেয়া হয়। কিছুদিন আগে ভোলার কৃতি ব্যক্তিত্ব শক্তিমান রাজনীতিবিদ সাবেক মন্ত্রী জননেতা তোফায়েল আহমদ ভোলার ভবিষ্যত সংযোগ সেতু নির্মাণ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এ তুলনাটি আবার দিয়েছেন। ভোলার সন্তান হিসাবে ভোলার যে কোন উন্নতির কথা শুনলেই ভাল লাগে। তার উপর যখন শুনি ভোলা সিঙ্গাপুর হতে চলেছে, তখন তো আনন্দে উচ্ছাসে রীতিমত নাচতে ইচ্ছে করে।
গরীব-দুঃখী মানুষ আমরা। জনম জনম দুঃখের সঙ্গেই আমাদের দোস্তি। দেশটা এমন যে, এখানে নিয়তই আমাদের কষ্টের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে চায়। যে কাজেই হাত দেই তাতে উৎসাহ পাওয়া দূরে থাক, পদে পদে বাধা। প্রতি পদক্ষেপে সমস্যা আর বিড়ম্বনা। অন্ন নেই বস্ত্র নেই অসুখে চিকিৎসা নেই পড়ালেখার পর্যাপ্ত উপকরণ নেই। দেশে যত লোক তার তুলনায় সুযোগ-সুবিধা এত কম যে, তাতে উপরতলার লোকদের চাহিদাই পূরণ হয় না। আমরা যারা অতি সাধারণ মানুষ তারা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাব চিন্তাই করা যায় না। চারটা ডালভাত খেয়ে ইজ্জতের সাথে বেঁচে থাকব দেশ বা সমাজ তার অভাগা সন্তানকে সে গ্যারান্টিই দিতে পারে না। তার মধ্যে যদি শুনি আমাদের বিচ্ছিন্ন জনপদটি সিঙ্গাপুরের মত সমৃদ্ধ জনপদে পরিণত হতে চলেছে তখন তো যারপরনাই ভাল লাগারই কথা।

দেশ যখন পরাধীন ছিল, তখনো লোকজন বলতো আমাদের অর্জন, সকল সম্পদ ব্রিটিশদের মত পাকিস্তানীরা নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সব খাবার, সব মূল্যবান জিনিস সবই তাদের করতলগত। আমরা কেবল পাই ছোবড়াটা। দেশ স্বাধীন হলে সকল সম্পদের মালিক হব আমরা। সব থাকবে আমাদের । আমরা খেয়ে পরে বেজায় ভাল থাকব। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও যখন আমাদের মিনিমাম চাহিদা পূরণ হয় না তখন কোন আশাই আমাদের আর আলোড়িত করে না। বিশেষ করে যখন দেখি ভোট ও ভাতের অধিকারের জন্য লড়াইকারীরা ক্ষমতা টিকে থাকার জন্য দেশের মানুষের ভোটের অধিকার হরণ করছে, অন্যের পাতের ভাত অন্যায়ভাবে কেড়ে নিয়ে খাচ্ছে তখন উজ্জীবিত হওয়ার বদলে, আতঙ্কিত হই এই ভেবে যে, আবার না জানি দুষ্ট লোকরা বাপের দিনের জানটা কেড়ে নিয়ে যায় কিনা।

তবে একথা নি:সন্দেহে বলতে পারি, ভোলা একটি অসম্ভব উর্বর জনপদ এবং অতিশয় সমৃদ্ধ জেলা। আয়তনের দিক থেকে ভোলা সিঙ্গাপুরের পাঁচ গুণের কাছাকাছি হলেও লোকসংখ্যা তিনভাগের একভাগ। এখানকার মূল ভূমির একতৃতীয়াংশ ভাঙনের কবলে পড়ে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভোলার আয়তন ৩৪০৩ বর্গকিলোমিটার আর সিঙ্গাপুরের আয়তন ৭৯৯ বর্গকিলোমিটার। লোকসংখ্যা ভোলার ১৮ লাখ আর সিঙ্গাপুরের ৫৩ লাখ। সিঙ্গাপুরের ৭৯৯ বর্গকিলোমিটার এলাকায় দ্বীপের সংখ্যা ৬৩। সবগুলো দ্বীপ বা চর এখন শহর। সেখানে রাস্তার পাশের কিছু গাছপালা ছাড়া ফসল ফলানো মত কোন জমি নেই। দুই সমুদ্রের মধ্যকার ছোট্ট একটি দ্বীপদেশ সিঙ্গাপুর। ওখানকার পানি সুপেয় নয় বলে সকল কৃষিপণ্যের মত পানিও মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করে খেতে হয়। ভোলার উত্তরে ইলিশা নদী, পশ্চিমে তেঁতুলিয়া, পূর্বদিকে করালগ্রাসী মেঘনা এবং দক্ষিণে প্রমত্তা বঙ্গপোসাগর। ভোলার চারদিকেই অসংখ্য দ্বীপ বা চর। সে চরের সংখ্যা দুইশ’ ছাড়িয়ে যাবে। এখানকার পানি সুপেয় এবং কৃষিপণ্য উৎপাদনের দিক থেকে ভোলার স্থান অনেক জেলার উপরে।

মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া সংলগ্ন পশ্চিম সুমাত্রা ও মালাক্কা প্রণালীর মাঝামাঝি একটি ক্ষুদ্র দ্বীপদেশ সিঙ্গাপুর । এর কাছের দুটি বৃহৎ দ্বীপ মালাক্কা এবং বোর্নিও। ৭৯৯ বর্গ কিলোমিটারের এই দেশটি পৃথিবীর বড় বড় দেশের সঙ্গে তুলনীয়। প্রতিহংসা বা দলাদলির কোন স্থান নেই সিঙ্গাপুরে। পার্শ্ববর্তী দুটি দেশ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া কখনো সিঙ্গাপুরের উপর ছড়ি ঘুরায় না। বরং দু’দেশের সাথে যাতায়াত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক খুবই উন্নত। সিঙ্গাপুরের আয়ের প্রধান উৎস পোর্ট ও টুরিজ্যম। সিঙ্গাপুর মূলত একটি ব্যস্ততম কনটেইনার ট্রান্সশিপমেন্ট হাব। মালয় উপদ্বীপের সন্নিকটবর্তী এর বন্দরের দৈর্ঘ্য ৩০ কিলোমিটার। পৃথিবীর ১২৩টি দেশের ৬০০ শতাধিক বন্দরের সাথে এর যোগাযোগ। বছরে অন্তত ১ লাখ ৩০ হাজার কন্টেইনার জাহাজ ভিড়ে সিঙ্গাপুরের জেটিগুলোতে। এখানে ছয়-সাতটি ঘাট। ব্রানি, কেপেল, টানজংবাগার, পাসির পানজং, যুরং এবং টুয়া। এসব বন্দর দিয়ে মালামাল উঠানো-নামানো খুব সহজ। যদি প্রশ্ন করেন, আমাদের ভোলায় কয়টি পোর্ট আছে? দেশী-বিদেশী কয়টা শীপ এখানে যাতায়াত করে ? বলা চলে ঢাকাগামী যাত্রীবাহী কয়টি লঞ্চ ছাড়া এখানে কোন জাহাজ ভিড়ে না। নেই কোন শিল্পকারখানা। মহামূল্যবান গ্যাস আছে ঠিক, কিন্তু একে ব্যবহার করা বা কাজে লাগানোর মত অভ্যন্তরীণ কোন খাতও নেই। ফলে গ্যাসকে বিদ্যুতে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সাপ্লাই দিতে হয়।

সিঙ্গাপুরকে পর্যটকদের স্বর্গ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের চেষ্টার অন্ত নাই। সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে বড় বড় হোটেল। ৭৭-তলা হোটেল র‌্যাফলস সিটি এখানেই অবস্থিত। উন্নত এবং বড় আকারের হোটেলও ষাটের অধিক। এ তো গেল থাকার জায়গার কথা। বেড়ানোর জন্য আছে ২০ হেকটর জমি নিয়ে জুরং পাখির পার্ক। সেখানে আছে সারা পৃথিবী থেকে বাছাই করা ৩০০০ প্রজাতির পাখি। ৯০ হেকটর জায়গা নিয়ে বিশাল চিড়িয়াখানা। সেখানে আছে ১৬০০ জন্তু জানোয়ার। কুমির মিউজিয়ামে আছে নানা দেশের নানান সাইজের ১৫০০ কুমির। আছে সামুদ্রিক মিউজিয়াম, সাঁতার কাটার পুকুর, দৃষ্টিনন্দন বোটানিকাল গার্ডেন, পুলাও সেন্টোসা প্রমোদ উদ্যান, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, পোর্টক্যানিং পার্ক, মানডাই অর্কিড গার্ডেন, কোরাল একুইরিয়াম, ম্যাকরিচি পার্ক। দ্বীপগুলোতে বেড়ানোর জন্য আছে অসংখ্য নিরাপদ সুন্দর সৈকতও সুলভমূল্যে থাকার ব্যবস্থা।

সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর বাজার। চারদিকে প্রচুর দোকান ও বড় বড় শপিংমল। জিনিসপত্রের দামও বেশ সস্তা। কারণ এখানে কোন জিসিসের ওপর বিক্রয়কর নেই। ফলে আমাদের দেশের তুলনায় অর্ধেক বা এক তৃতীয়াংশ দামে সোনা-হীরা থেকে শুরু করে গাড়ি-কারসহ সবকিছু কেনা যায়। এখানে চীন, জাপান, আমেরিকা, বৃটেন, জার্মানীসহ পৃথিবীর সব দেশের বড় বড় কোম্পানির উৎপাদিত পণ্যের বিশাল বিশাল শোরুম। এখানে কৃষিজমি নেই ঠিক আছে, তবে প্রচুর গাছপালায় সারা শহর ছেয়ে আছে। এমনকি ওভারব্রিজের উপরও সারি সারি ফুলের টব। শহর এত পরিচ্ছন্ন যে, কোথাও একটুকরা আবর্জনাও চোখে পড়ে না।

বন্দরের পাশেই রয়েছে এক বিশাল তেলশোধনাগার। এটি নাকি পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম শোধনাগার। আছে জাহাজ মেরামতের মস্ত ব্যবস্থ্া ও ২৪ ঘন্টার সহজ ব্যাংকিং ব্যবস্থা। বিমানবন্দরেও নেই কোনরকম জটিলতা। পৃথিবীর প্রায় সব এয়ারলাইনসের বিমান চেঙ্গি বিমানবন্দর দিয়ে ওঠানামা করে। প্রতি মিনিটে একটি করে বিমান উঠেনামে এবং আসা যাওয়া করে এক কোটিরও বেশি যাত্রী। সে তুলনায় আমাদের ভোলায় কী আছে?
সিঙ্গাপুর একসময় ছিল মালয়েশিয়ার অংশ। ১৯৬৫ সালে চুক্তির ভিত্তিতে স্বাধীনতা লাভ করে। যেমন ভারত-পাকিস্তান ব্রিটিশ থেকে চুক্তির মাধ্যমে স্বাধীনতার পায়। আমাদের মত সিঙ্গাপুরের লোকদের স্বাধীনতার জন্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অংশ নিতে হয়নি। দেশের একমাত্র রাজনৈতিক দল পিপলস এ্যাকশন পার্টি। যেটি গঠন করেছিলেন সেদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি-কুয়ান-উ। তিনি দীর্ঘদিন প্রধানমন্ত্রীত্বের দায়িত্ব পালন করেন এবং ক্ষুদ্র দ্বীপদেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যান। দেশের স্বাধীনতার স্থপতিও তিনি। তবে ভোলার সাথে অনেকগুলো দিকে সিঙ্গাপুরের মিল আছে। সিঙ্গাপুর একটি দ্বীপদেশ আর ভোলা একটি দ্বীপজেলা। শত শত বছর ধরে সিঙ্গাপুর ছিল একটি অনুর্বর জেলেপল্লী। ভোলাও জেলেদের মাধ্যমেই মানববসতি গড়ে ওঠে। একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকেও একথা জোর দিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের সমুদ্রের মাছ আহরণের শ্রেষ্ঠতম স্থান ভোলা। ভোলার তিন পাশে নদী এবং এক পাশে সমুদ্র।

ভোলার চারপাশ মাছের অভয়ারণ্য। বিশেষ করে সুস্বাদু ইলিশের জন্য বিখ্যাত স্থান ভোলা। তের’শ শতকে যখন সমুদ্রে চর জেগে ওঠে তখন চাঁদপুরের জেলেরা সেখানে যাতায়াত শুরু করে। মাছ ধরার সুবিধার জন্য তারা মাসের পর মাস সেখানে অবস্থান করতো। চাঁদপুরের জেলেদের সাথে যুক্ত হয় বিক্রমপুর, ফরিদপুর, নোয়াখালী ও বরিশাল বা বাকলার লোকজন। এসব অঞ্চল নদী ভাঙনের করালগ্রাসে পতিত হলে লোকজন দলে দলে ভোলায় যায় এবং বসবাস গড়ে তোলে। চৌদ্দশত শতকে এভাবেই ভোলায় মানুষের স্থায়ী বসবাস শুরু হয়।

সে সময় সমুদ্রপাড়ের মানুষে চলাফেরার একমাত্র বাহন ছিল নৌকা। জীবিকা নির্বাহের উপায় ছিল ফসল উৎপাদন ও মৎস্য শিকার। ভোলার পললগঠিত মাটি যেমন ছিল বেজায় উর্বর তেমনি নদী-খালে-পুকুরে মাছ ছিল ভরপুর। সহজলভ্য জীবন উপকরণ প্রাপ্তির জন্য দ্রুত এখানে লোকবসতি বেড়ে ওঠে। অবশ্য প্রতিকূলতাও ছিল, জীবনের ঝুঁকিও কম ছিল না। কারণ অত্র অঞ্চল ঝড়-জলোচ্ছ্বাস কবলিত অঞ্চল। ক’বছর পর পর এখানে প্রলয়ংকারী ঘুর্ণিঝড় হয়। সিডর-সাইক্লোন বা ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে। আর সে আঘাতে বাড়িÑঘর, ভিটে-মাটি, ছেলে-মেয়ে নাস্তানাবুদ হয়। বারংবারের সে আঘাতের পরও যারা বেঁচে গেছে তাদের বংশধররাই এখন ভোলার অধিবাসী। ভোলার সামাজিক কালচার মিশ্র কালচার। রক্ত ও বর্ণের মিশ্রতার জন্য এখানকার লোকজন অসম্ভব মেধাবী এবং সংগ্রামী।

সিঙ্গাপুরের কালচারও মিশ্র কালচার। সেখানকার মালয়ী, চাইনিজ, ইন্ডিয়ান, কোরিয়ান, ইউরোপিয়ান এবং বাঙালিদের নিয়ে যে সমাজব্যবস্থা সেটা বিচ্ছিন্ন ধারা নয় বরং একই ধারায় প্রবাহিত। প্রতিনিয়ত সেখানে নতুন লোকের সমাগম হয়। তাতে তাদের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতিতে কোন পরিবর্তন আসে না।। ভোলার উৎপাদন, জীবনব্যবস্থা, কথোপকথন ও ভাষাগত আলাদা নিজস্ব একটা রূপ আছে। যা দেশের অন্য অঞ্চলের সাথে মিলে না। আলাদা বৈচিত্র এবং বৈশিষ্ট্যের জন্যই ভোলার মানুষ হিসেবে আমরা গর্বিত।

এবার সিঙ্গাপুর নিয়ে আরও কিছু কথা বলি। কেউ কি সঠিকভাবে বলতে পারেন সিঙ্গাপুর কি একটি শহর, দ্বীপ নাকি দেশ। উত্তরে হয়ত বলবেন এটি দেশ হোক বা দ্বীপ তাতে কিছু যায় আসে না। যেহেতু এখানকার নাগরিকরা ধনী, শিক্ষিত এবং সমৃদ্ধ। সিঙ্গাপুরে প্রতি ছয়জন নাগরিকের মধ্যে কমপক্ষে একজন নাগরিকের মিলিয়ন ডলার ব্যাংক ডিপোজিট আছে। তাছাড়া শিক্ষা, টেকনোলজী, স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবনযাত্রা ও জননিরাপত্তার দিক থেকে তারা হাইর‌্যাংকিংএ আছে। দুর্নীতি অপরাধ অঘটন নেই বললেই চলে। সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় পরিচয় দেশটা চাপাবাজি-চামচামির দেশ নয়। দেশ ছোট কিন্তু বিশ্বমানের ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। আছে মাউন্ট এলিজাবেথ মেডিকেল হসপিটালের মত অসংখ্য বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র। মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক লেবেলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অগণিত। সম্প্রতি আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের অর্থনীতি সিঙ্গাপুরের চেয়েও নাকি শক্তিশালী। কথাটা যে শুনবে সে-ই বলবে, এরচেয়ে হাস্যকর কোন উক্তি হতে পারে না। কারণ সিঙ্গাপুরের একটি ব্যাংকে যে পরিমান টাকা আছে আমাদের স্টেটব্যাংকেও তা আছে কিনা সন্দেহ।

যে দেশের মানুষের কাজ নেই, যুবকদের কর্মসংস্থান নেই, খাবার কিনে খাবার সামর্থ নেই, কাজের সন্ধানে বের হয়ে তারা মরে থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ার জঙ্গলে, ডুবে মরে বঙ্গপোসাগর আর ভূমধ্য সাগরের অথৈ জলে, লাখ লাখ মানুষ অবৈধভাবে থাকে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে, সে দেশকে সিঙ্গাপুরের চেয়ে শক্তিশালী বলা কতটা যুক্তিসংগত, আমার ঠিক বুঝে আসে না। আর ভোলাকে সিঙ্গাপুরের সাথে তুলনা করা তো আরও হাস্যকর। ভোলায় কি একটাও বিশ্ববিদ্যালয় আছে? আছে কি সিঙ্গাপুরের মত একটা আকাশছোঁয়া ইমারত ? আছে কি বহির্বিশে^র সাথে যোগাযোগের বা মালামাল আমদানি-রপ্তানির কোন ব্যবস্থা ?

ভোলার যারা বড়মিয়া বলে পরিচিত, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, উকিল, কবি, সাংবাদিক তাদের কেউ কি ভোলায় বাস করে? মোটেই না। ভোলায় তাদের জমিদারী। তারা প্রয়োজনের তাগিদে ভোলায় আসেন। প্রয়োজন ফুরানো মাত্র ঢাকায় চলে যান। সবচেয়ে বড় কথা সিঙ্গাপুরের প্রতিটি নাগরিক তাদের উন্নয়নের ব্যাপারে কমিটেড। আমাদের লোকরা কমিটেড না। ভোলার কোন কন্ট্রাক্টর যদি নদীভাঙন রোধে ব্লক ফেলার কাজও পান, কাজটা নিজের অস্তিত্বের অংশ ভেবে সততার সাথে করেন না। ভোলাকে নিয়ে ভোলার বড়মিয়াদের কোন পরিকল্পনা নেই। মাথাব্যাথাও নেই। ভোলার মাটি বেজায় উর্বর ঠিক আছে, ভোলার লোকেরা কাজপাগল এবং পরিশ্রমী তাও ঠিক কিন্তু একে কাজে লাগানোর মত কার্যকর ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি। ফলে অনুন্নত ও পশ্চাৎপদ এ জেলাকে এশিয়ার সবচেয়ে উন্নত একটি দ্বীপদেশের সঙ্গে তুলনা করা কতটা যৌক্তিক কে জানে?
সব থাক, শুধু যদি ভোলার বড়মিয়ারা ঠিক হতেন এবং দেশকে নিয়ে না ভাবুন, শুধু নিজেদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটির কথা, এর অস্তিত্ব রক্ষা ও এগিয়ে নেওয়ার কথা ভাবতেন তবে ভোলাকে সিঙ্গাপুরের কাছাকাছি নিয়ে যেতে খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হতো না।

ভোলাকে উন্নত করার জন্য আমার কিছু প্রস্তাব ঃ
১. ভোলার নদীভাঙন স্থায়ীভাবে প্রতিরোধ করুন।
২. ভোলায় যেহেতু গ্যাস বা সস্তা জ্বালানি আছে একে কাজে লাগান এবং শিল্পকারখানা স্থাপন করুন।
৩. ভোলায় উৎপাদিত পণ্য পানিপথে সহজ উপায়ে দেশের অভ্যন্তরে এবং ভোলা থেকে সরাসরি দেশের বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।
৪. ভোলার বেকার যুবক ও যুব মহিলাদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনুন এবং তাদের বোঝা না বানিয়ে সম্পদে পরিণত করুন। মানবশক্তির চেয়ে বড় শক্তি সংসারে নেই। মানুষকে যদি কাজে লাগাতে পারেন তারা আপনার এ ছোট্ট দ্বীপকে স্বপ্নের উন্নত দেশে পরিণত করতে পারে।
৫. ভোলার উর্বর ভূমিকে কাজে লাগান। প্রয়োজনে কিছু জমিকে উঁচু করে নিন। উঁচু করার জন্য যে জলাধার বা পুকুর তৈরি হবে তাতে মাছ চাষ হবে আর উঁচু জমিতে সারা বছর রবি ফলন বা তরকারির চাষ করা যাবে।
৬. ভোলায় একাধিক পোর্ট বা বন্দর তৈরি করুন। বিশেষ করে দৌলতখাঁর চৌকিঘাট, যেখানে আগে থেকে একটি বন্দরের ব্যবহার ছিল এখানে একটি পরীক্ষমূলক বন্দর স্থাপনের ব্যবস্থা নিন। যাতে ভোলায় উৎপাদিত পণ্য খুব সহজে স্থানান্তরে নেয়া যায়।
৭. ভোলায় পর্যাপ্ত মাছ ও সবজি হয়। কিন্তু অতিরিক্তি ফসল সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই। বিশেষ করে মহিষের দুধ ও দধি এবং তা থেকে উন্নত জাতের মিষ্টিতৈরি এবং তা বাজারজাত করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। চর বা দ্বীপগুলোকে বাণিজ্যের আওতায় আনা গেলে সেখানে গরু-মহিষ ও ছাগলের উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে। দেশের অন্যান্য স্থানে গরু ছাগল ও মহিষ উৎপাদনের পেছনে যে খরচ, ভোলায় তার চারভাগের এক ভাগেরও প্রয়োজন হয় না। প্রাকৃতিকভাবে এখানে উৎপাদিত হয় পর্যাপ্ত ঘাস। যদি পরিকল্পনা মাফিক এখানে গরু ছাগল ও মহিষ পালন করা যায় এবং বড়মিয়ারা এদিকে নজর দেন তাহলে আপনার জন্মভূমি ভোলা সিঙ্গাপুর না হোক সম্মানজনক পরিচয় দেয়ার মত একটা জায়গায় পৌছাবে।

আমি পুনরায় প্রস্তাব করছি ভোলায় পরীক্ষামূলক বন্দর স্থাপন করা যেতে পারে। শত মাইল জলপথ অতিক্রম করে পায়রাবন্দরে জাহাজ ঢোকে। পায়রাবন্দরে যে নদী দিয়ে জাহাজ ঢোকে সে নদীর নাব্যতা রক্ষার জন্য প্রতিবছর ড্রেজার লাগিয়ে নদী খনন করতে হয়, অথচ ভোলায় কখনো তার প্রয়োজন হবে না। তা সত্ত্বেও ভোলায় বন্দর স্থাপনের উদ্যোগ নেই। ঢাকা বা গাজীপুরে উৎপাদিত গার্মেন্টসপণ্য রেলযোগে চট্টগ্রাম নিতে হয়। সেখান থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের ঝৈ-ঝামেলা সারিয়ে কন্টেইনারগুলি বহি:নোঙ্গর নিতে হয়। সেখান থেকে বড় বড় শীপের মাধ্যমে দেশের বাইরে পাঠাতে হয়। অথচ ভোলায় যদি সেসব পণ্য উৎপাদন করা যায় তাহলে পরিবহনে এত ঝামেল মোকাবেলা করতে হয় না। চট্টগ্রাম বন্দরে গিয়েও পণ্যমালিকদের দিনের পর দিন বন্দরকর্তৃপক্ষের দয়ার আশায় দিনগুনতে হয় না। ভোলা বন্দর থেকে ছোট্ট ছোট্ট ইনার ভেসেলে কনটেইনার তুলে দিলে সরসারি বহি:নোঙ্গর পৌছে যেতে পারে। তাতে খরচ ও ঝামেলা এত কম হবে যা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু প্রয়োজন সূদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ। কেবল ভোলার সাহসী ও শক্তিমান নেতা ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের এগিয়ে এলেই হয়।

পলল গঠিত বলে ভোলার মাটি অসম্ভব উর্বর। অথচ কৃষিব্যবস্থায় ভোলার মানুষ মান্ধাতা আমলেই রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের প্রকৃতির উপর ভসরা করেই চলতে হয়। ভোলায় প্রচুর তরমুজ ফলে। ভোলার তরমুজ সাইজে বড় এবং সবচেয়ে সুস্বাদু। অথচ যদি হঠাৎ কোন কারণে বৃষ্টি হয় তাহলে তরমুজ নষ্ট হয়ে যায়। ভোলার চাষীরা তখন অসম্ভব ক্ষতির শিকার হয়। তারা জানে না তাৎক্ষণিক অধিক পানির কবল থেকে তরমুজ, পটল, ঢেড়স, ঝিঙ্গাসহ অন্যান্য ফসল কিভাবে রক্ষা করা যায়। আমার ধারণা প্রতিটি বড় জমির পাশে জলাধার খনন করে তার মাটি দিয়ে ক্ষেতগুলো উঁচু করে ফেলা, সে উঁচু জমিতে বছর ধরে সবজি উৎপন্ন হলে, পাশাপাশি জলাধারে মাছ চাষ হলে ফসলও রক্ষা হবে। অতিরিক্ত মাছ বিক্রি করেও বাড়তি আয় করা যাবে।

আমি আগেই বলেছি, ভোলা ও তার নিকটবর্তী এলাকাটা মাছের অভয়ারণ্য। ভোলার মাছ অসম্ভব সুস্বাদু। চট্টগ্রামের ইলিশ আর ভোলার ইলিশ অনেক ব্যবধান। যারা নিজেরা বাজারে গিয়ে মাছ খরিদ করেন, তারা জানেন ভোলা বা পদ্মার ইলিশকে জেলেরা কত মর্যাদার সাথে ডালায় ওঠায়। অনেক সময় ভোলার ইলিশকে পদ্মার ইলিশ বলেও চালিয়ে দেয়া হয়। শুধু ইলিশ কেন, এখানে যে পোয়া, তপসে, চেউয়া, টেংরা পাওয়া যায় সে কি কম স্বাদ? এছাড়া ভোলার পুকুর-ডোবা দীঘিতে উৎপাদিত কৈ, মাগুর, শোল-বোয়াল, রুই, কাতল, মৃগেল মাছের গুরুত্ব কি কম ? ভোলার নদীতে মাছ ডাঙায় পশু। এখানকার গরু-মহিষ-ছাগলের বাথান এবং তা থেকে উৎপন্ন দুধ- দৈ ও মাংসেরও বেজায় চাহিদা। এসবকে যদি আপনি সম্পদে পরিণত করতে পারেন, এসবের উছিলায় হাজার হাজার পরিবার চলে যেতে পারে। এখন কেবল প্রয়োজন কারিগরি জ্ঞান, যে জ্ঞানের মাধ্যমে শিক্ষিত বেকার তৈরি হবে না, হবে যোগ্য কর্মউপযোগী ব্যক্তি। যারা চাকরির ধান্দায় ঘোরার বদলে নিজ মাতৃভূমি ভোলাকে ধাক্কা দিয়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আগে দক্ষ লোক তৈরি হওয়া দরকার। যেমন মালেশিয়ায় লোক তৈরি হওয়ার পর তারাই মালেশিয়াকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়।

আমাদের পশ্চাৎপদ ভোলা একদিন সিঙ্গাপুর হোক, এখানকার প্রতিটি লোক কর্মজীবী হোক, তারা জ্ঞান-বিজ্ঞান, বিত্ত বৈভবে সমৃদ্ধ হোক, আমি সেটা মনেপ্রাণে চাই। কিন্তু তার জন্য কিছু পূর্বশর্ত পূরণ করতে হবে। তার জন্য সবার আগে প্রয়োজন বড় মিয়াদের বড় মানসিকতার। যদি তাই হয় তবে কয়দিন লাগবে আমাদের সিঙ্গাপুর পৌঁছাতে।

কৃষকের ছেলে ম্যাজিষ্ট্রেট হোক বা জেলের মেয়ে বিচারক, পন্ডিতের নাতি মন্ত্রী হোক বা শিক্ষকের ছেলে শিল্পপতি সেটা নিয়ে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু তার কাছাকাছি পৌঁছার জন্য যে অধ্যয়ন ও অধ্যবসায় দরকার, শক্ত পূর্বপ্রস্তুতি প্রয়োজন সেটা না হলে সিঙ্গাপুর বহু দূরেই থেকে যাবে।

Facebook Comments Box


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি