LalmohanNews24.Com | logo

৩রা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৬ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

বাংলাদেশের মানুষ চিকিৎসার জন্য কেন ভেলর দৌড়ায়!

বাংলাদেশের মানুষ চিকিৎসার জন্য কেন ভেলর দৌড়ায়!

মোঃ জসিম জনি, ভেলর থেকে।। চিকিৎসায় বাংলাদেশকে ছোট করা নয়, বরং বাংলাদেশের চেয়ে আরো উন্নত মানের চিকিৎসার জন্য হাজার হাজার মাইল দূর থেকে মানুষ কেন ভারতে আসে তা জানতে এ লেখা। প্রথমে জানিয়ে দিতে চাই বাংলাদেশ থেকে কেন বিপুল সংখ্যাক মানুষ ভারতের তামিলনাডু ভেলর আসে। এর পরের স্ট্যাটাসে জানাবো কিভাবে সহজে ভেলর আসা যায় এবং এখানকার চিকিৎসা পেতে হলে কি করতে হবে।

সিএমসির সামনে থেকে তোলা।

তো বলছিলাম, বাংলাদেশ থেকে বছরের সব সময়ই রোগীদের ভিড় লেগে থাকে ভেলরে কেন তা নিয়ে। এছাড়া এ রাজ্যের চেন্নাই এবং ব্যাঙ্গালুরুতেও বাঙ্গালীরা আসে। তবে তামিলনাডুর ভেলর সিএমসি হাসপাতেলেই সর্বাধিক রোগী আসে। এখানে কম খরচ এবং নির্ভুলভাবে রোগ নির্ণয়ের কারণে হাসপাতালটি বেশ জনপ্রিয়। আর তাই বাংলাদেশই নয়, চীন, শ্রীলংকা, নেপাল থেকেও হাজার হাজার রোগী ভেড়ে সিএমসিতে। শুধু বিদেশিরাই নয়, ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকেও রোগীরা এখানে আসে। স্বাস্থ্য সেবার জন্যে তারা ছুটছেন এই প্রদেশ থেকে ওই প্রদেশে। আমরা বঙ্গোপসাগরের এপাড় থেকে ওপাড়ে। আগে বাংলাদেশ থেকে আসা রোগীরা এটাকে মাদ্রাজ বলতো। মাদ্রাজ নাম এখন আর খুঁজে পাওয়া যায়না।
তামিলনাডু রাজ্যের প্রধান রাজধানী হচ্ছে চেন্নাই। এই চেন্নাইয়ের পূর্ব নাম ছিল মাদ্রাজ। মাদ্রাজ নামটি পরিবর্তিত হয়ে এখন চেন্নাই নাম ধারণ করেছে। চেন্নাই থেকে ভেলরের দূরত্ব প্রায় ১৪৫ কিলেমিটার।
বাংলাদেশিদের কাছে ভেলোরের নান্দনিক গুরুত্বের চেয়ে স্বাস্থের জন্যে বেশি পরিচিত। এখানকার ব্যবসা, বাণিজ্য সব এ হাসপাতালকে কেন্দ্র করেই। বাঙ্গালীরা এতো পরিমাণ এখানে আসে যার কারণে প্রতিটি দোকানেই বাংলা লেখা নির্দেশাবলী রয়েছে। ব্যবসায়ীরা স্থানীয় হলেও তারাও এখন বাংলা বুজে অনেকটা।


সিএমসির পুরো নাম ( Christian Medical College ) খ্রিষ্টান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সিএমসি হলো খ্রিস্টান মিশনারী পরিচালিত একটি অলাভজনক হাসপাতাল। এটি ভেলর শহরেই অবস্থিত। ভেলোর (Vellore) দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রদেশ তামিল নাডুর (Tamil Nadu ) একটি জেলা শহর।
প্রথমে বলে দিচ্ছি চিকিৎসা কোথায় করাবেন তার আগে কিছু ব্যাপার ভাবতে হবে। যদি আপনার প্রচুর ধৈর্য আর পর্যাপ্ত সময় না থাকে সিএমসিতে না দেখানোই ভাল। এখানে রোগীর এত চাপ আপনাকে সবকিছুর জন্যে লাইনে দাঁড়াতে হবে। সেটা লিফট থেকে শুরু করে টাকা দেয়া, ডাক্তার দেখানো, মেডিসিন কেনা, টেস্ট করানো সবকিছুতেই। অন্যদিকে আপনার যদি টাকার সমস্যা না থাকে চলে যান চেন্নাই এ্যাপোলোতে। আর যাদের একেবারেই সমস্যা আছে তারা যেতে পারেন শ্রি রামচন্দ্র বা নারায়নী হাসপাতালে। চোখের যে কোন চিকিৎসার জন্য চেন্নাই এর শংকর নেত্রালয় ভাল। আর অর্থোপেডিক চিকিৎসা হলে সিএমসি বা অ্যাপোলো তে করাতে পারেন।

তবে আমি সিএমসি নিয়েই বলছি । দেশে যে ডাক্তারী হয়রানীরর শিকার হতে হতে অতিষ্ঠ তার কোন আশংকাই নেই এখানে । আর খরচ আমাদের প্রাইভেট মেডিকেলের চেয়েও কম। বাড়তি ওষুধের যে ধকল সইতে সইতে আপনি আরো অসুস্থ হয়ে গেছেন সেই সমস্যা এখানে আর হবে না। আর বাংলাদেশীদের যে অভিযোগ থাকে ডাক্তার ২০ সেকেন্ড কথা বলেই প্রেসক্রিপশন লেখায় মন দেন এখানে সেটা তো করতেই পারবেন না। উল্টো বিরক্ত হবেন আপনার আগেরজনকে কেন এত সময় ধরে দেখছে ডাক্তার। আর তাদের ভাল ব্যবহারের জন্যে পরের বার থেকে ছোট খাটো সমস্যা হলেও আপনার ভেলোর আসতে ইচ্ছে করবে। রোগ নির্ণয়ের জন্য যা কিছু সম্ভব সর্বোচ্চ চেস্টা থাকে। অত্যান্ত ধৈর্য ধরে প্রয়োজনীয় টেস্টগুলো এখানে করা হয়। তারপর দেওয়া হয় চিকিৎসা।
ইন্টারনেট গেঁটে সিএমসি প্রতিষ্ঠা নিয়ে পাওয়া গেলো এক চমকপ্রদ কাহিনী এবং একজন মহিলার উদারতা আর পরিশ্রমের গল্প। কিংবদন্তী সেই নারীর নাম Dr. Ida Sophia Scudder ইডা সোফিয়া স্কাডার।
১৮৯০ সাল। আমেরিকার অধিবাসী ইডা সোফিয়া স্কাডার একজন স্কুল ছাত্রী। দক্ষিণ ভারতে বসবারত তাঁর মিশনারী বাবা মা’কে দেখতে ও তাঁদের সাথে কিছুদিন কাটানোর জন্য তিনি দক্ষিণ ভারতের ভেলোরে এলেন। ভেলোর তখন অখ্যাত একটি ছোট্ট কৃষি প্রধান শহর। এক রাতে প্রসবজনিত বেদনায় কষ্ট পাচ্ছেন এমন তিনজন গর্ভবতী মহিলাকে নিয়ে তিনটি পরিবার ইডার কাছে এলো সাহায্যের জন্য। ইডার নিকট তিনটি পরিবার থেকে আকুল আহ্বান জানানো হলো। ইডার এই ব্যাপারে কোন প্রশিক্ষণ বা অভিজ্ঞতা নেই বলে তিনি ওই মুহূর্তে কিছুই করতে পারলেন না। এসময় তিনি উপায়ন্তর না পেয়ে তার মিশনারী পিতার সাহায্য কামনা করলেন। ইডার পিতা নিজেই একজন চিকিৎসক ছিলেন। কিন্তু ইডা খুব অবাক হলেন যখন ওই পরিবারগুলোর পুরুষরা কিছুতেই একজন পুরুষ চিকিৎসককে প্রসবজনিত কষ্টে মরণাপন্ন মহিলাদের নিকট যেতো দিলো না। বরং পুরুষগুলো কটুক্তি করে ইডার বাবা চিকিৎসককে স্থান ত্যাগে বাধ্য করলো এবং বললো, “আমাদের নারীদের একজন পরপুরুষ ডাক্তার দেখার চেয়ে তারা মরে যাওয়া অনেক ভালো।” সামাজিক প্রথা ও কুসংস্কার একজন পুরুষ চিকিৎসককে প্রসবজনিত সমস্যায় ও কষ্টে চিৎকাররত এই নারীদের নিকট যেতো দিলো না। সকালে ইডা জানতে পারলেন এই তিন নারী প্রসবজনিত কষ্টে মারা গেছেন।

ইডা সোফিয়া স্কাডার’ যার হাতে প্রতিষ্ঠা পায় সিএমসি।

এই ঘটনা ইডাকে এমনভাবে স্পর্শ করলো, তিনি অন্তরে অনুভব করলেন এটা ঈশ্বর তাঁকে দেখিয়েছেন, যাতে ইডা এই অসহায় বঞ্চিত নারী ও শিশুদের জন্য কিছু একটা করেন। ইডা আমেরিকায় ফিরে এলেন। চিকিৎসা প্রশিক্ষণে ভর্তি হলেন। ১৮৯৯ সালে তিনি করনেল বিশ্ববিদ্যালয়াধীন চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় হতে চিকিৎসা বিজ্ঞানে গ্রাজুয়েট ডিগ্রি নিলেন এবং এটা ছিলো ওই কলেজে প্রথম মহিলা চিকিৎসকদল।
১৯০০ সালে ইডা আবার ভারতে ফিরে এলেন। প্রথমে ভেলোরে এক বেডের একটি ক্লিনিক-এর সূচনা করলেন তিনি। ১৯০২ সালে এই ক্লিনিক উন্নত হলো ৪০ বেডে বিশেষ করে অসহায় নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য সেবার উদ্দেশ্যে। ১৯০৯ সালে এই ক্লিনিকের সাথে উদ্বোধন করা হলো নারী সেবিকা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ১৯১৮ সাল থেকে এটি একটি মেডিক্যাল কলেজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলো। ইডা শুরুতে নারীদের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবায় অন্তুর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে তাদের প্রশিক্ষণ ও শিক্ষাদানে উদ্যোগী হলেন। এই সূত্রে ক্রিশ্চান মেডিক্যাল কলেজ সংক্ষেপে সিএমসি নামে ১৯১৮ সাল থেকে নারী চিকিৎসার শিক্ষা প্রদান শুরু করলো এবং পরবর্তীতে এমবিবিএস পড়া ও ডিগ্রি প্রদানের প্রাতিষ্ঠানিক অবয়বে গড়ে উঠলো। কলেজ ও চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে করতে ১৯৪৬ সালে এটি ভারতের অন্যতম একটি মেডিক্যাল কলেজ ও সেবিকা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে ও খ্যাত হয়ে উঠে। বর্তমানে সিএমসি সারা ভারত জুড়ে ও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল হতে আগত হাজার হাজার নারী ও পুরুষদের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা বিষয়ে ৯১ ধরনের প্রশিক্ষণ প্রদানে একটি অনন্য শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সারা বিশ্বে স্বীকৃত ও সমাদৃত।

সিএমসিতে কপি কিনে খেতেও এরকম লাইনে দাঁড়াতে হয়।

কৃষিজীবীদের অখ্যাত শহর ভেলোর এখন সারা বিশ্বে পরিচিত সিএমসি হাসপাতালের নামে। গোটা শহরটাই গড়ে উঠেছে এই হাসপাতালকে কেন্দ্র করে। ব্যাংক, হোটেল, ব্যবসা-বাণিজ্য, যানবাহন সবকিছুই মনে হয় এই হাসপাতালকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে।
অসংখ্য বেডের এই হাসপাতালের বাইরে আউটডোরেই শুধু প্রতিদিন প্রায় চার হাজার রোগীকে সেবা দেওয়া হয়। ১২টি অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা বিভাগসমূহ ও গবেষণাকেন্দ্র ছাড়াও মোট ৩৫টি চিকিৎসা সেবা বিভাগ রয়েছে এই সিএমসির। শত শত চিকিৎসক, ছাত্র-ছাত্রী, সেবক-সেবিকা এখানে কর্মরত ও শিক্ষা গ্রহণে নিয়োজিত। এখানে কর্মরত সকল চিকিৎসক, সেবক-সেবিকা ও কর্মীরা এক অনন্য নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে অসুস্থ মানুষদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। যা ভারত ও বাংলাদেশের আর কোন হাসপাতালে এই নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা আছে বলে মনে হয় না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, কর্মরত অবস্থায় চিকিৎসক ও সেবক-সেবিকা কেউ হাসপাতাল ক্যাম্পাস ও চৌহদ্দীর মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না। হাসপাতালের বাইরে চিকিৎসকদের প্রাইভেট কোন চেম্বার বা প্রাইভেট কোন প্রাকটিস নেই। হাসপাতালের বাইরে কোন প্রাইভেট প্যাথলজী বা ডায়গনস্টিক সেন্টার নেই। গবেষণার মাধ্যমে এই সিএমসি নতুন নতুন চিকিৎসা-সেবা আবিষ্কার করছে। এখানকার ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত বেচাকেনা হয় না। এখানে রক্ত সরবরাহ হয় “রক্তের বদলে রক্ত দান” এই নীতিতে। যতো ব্যাগ রক্ত লাগবে রোগীর, সেই পরিমান রক্ত দান করতে হবে ব্লাড ব্যাংকে রোগীর পক্ষ হতে। রোগীর পক্ষ হতে রক্ত বিনিময় করার মতো ব্যক্তি না থাকলে বা পাওয়া না গেলে, স্থানীয়ভাবে কিছু রক্তদানকারী সুস্থ ও স্বাবলম্বী নারী-পুরুষকে পাওয়া যায়, যাঁদের সাথে যোগাযোগ করলে তাঁরা ব্লাড ব্যাংকে এসে রক্ত দান করে যান। বিনিময়ে তাঁরা কোন অর্থ গ্রহণ করেন না কখনো।
একটা মিশনারী মতাদর্শ নিয়ে এই সিএমসি গড়ে উঠলেও মানব-সেবা হচ্ছে তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য ও নীতি।
প্রসব যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে চিকিৎসা সেবা হতে বঞ্চিত হয়ে তিনজন অসহায় নারীর প্রাণ বলির বিনিময়ে জগৎ- খ্যাত আজকের এই সিএমসি হাসপাতাল।

(আগামী পর্বে লিখবো কিভাবে ভেলর আসা যায় ও এখানকার চিকিৎসা পেতে হলে কি করণীয়।)

এ সংক্রান্ত পরের সংবাদের লিংক: 

http://lalmohannews24.com/ভারতের-ভেলর-সিএমসিতে-চিক/

Facebook Comments Box


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি