LalmohanNews24.Com | logo

৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৪ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

আলহাজ্ব ইউনুছ মিয়া লালমোহনের শিক্ষা বিস্তারে নিবেদিত প্রাণ

আলহাজ্ব ইউনুছ মিয়া লালমোহনের শিক্ষা বিস্তারে নিবেদিত প্রাণ

লালমোহনের বিশিস্ট শিক্ষাবিদ সর্বজন সুপরিচিত আলহাজ্ব ইউনুছ মিয়া স্যারের ২৪তম মৃত্যু বার্ষিকী ছিল ২৭ জানুয়ারী। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৪৪ বছর ঐতিহ্যবাহী লালমোহন বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন তিনি। লালমোহনের এই গুণিব্যক্তি ১৯৯৭ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকায় তার মেয়ের বাসায় মৃত্যুবরণ করেন।

১৯৭০ সালে পাকিস্তান আমলে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন ইউনুছ মিয়া স্যার। প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ডাক্তার আজাহার উদ্দিন। চরফ্যাশন তখন লালমোহনের সাথে ছিল। বিশাল বড় এড়িয়া। কিন্তু ৭০ এর বন্যার কারণে নির্বাচন বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আবার নির্বাচন হলে ইউনুছ মিয়া স্যার ব্যক্তি ইমেজে ব্যাপক জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও নির্বাচন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। তিনি হয়ত নিজেকে কোন দলীয়ভুক্ত করতে চাননি। হয়ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত উক্তি ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক’ এই কথার সাথে নিজেকে মিলিয়ে নিয়েছেন তিনি।

ইউনুছ মিয়া স্যারের অসুস্থ্য হওয়ার সময় তোলা সর্বশেষ ছবি। শয্যা পাশ ছেলে রুবায়েত হাফিজ রুবু।

ছেলে রুবাইয়াত হাফিজ রুবু আমেরিকা থেকে নিজের পিতা আলহাজ্ব ইউনুছ মিয়া স্যার সম্পর্কে অনেক স্মৃতিমূলক তথ্য উপস্থাপন করেছেন। সেখান থেকে জানা যায়, যখন ব্রিটিশ সরকারের উচ্চ পদে চাকরি করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এবং ঢাকা শহরের সবচেয়ে মূল্যবান জায়গা আজিমপুরে এক কানি জমি দশ হাজার টাকায় চুড়ান্ত করার পরও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আব্দুর রশীদ মাষ্টার ও খান সাহেবের আমন্ত্রণে লালমোহন হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদ অলংকৃত করেন আলহাজ্ব ইউনুছ মিয়া। তখন লালমোহন হাই স্কুলের শিক্ষকদের অবস্থান ছিল খুবই উচ্চ পর্যায়ের। যেমন সহকারি হেড মাষ্টার এসকিউএম রশীদ আহমেদকে সম্মানসূচক জয়েন্ট হেড মাষ্টার করা হয়। কারণ তিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটির গোল্ড মেডেল পাওয়া ছাত্র ছিল। তাই তাকে এই সম্মানটুকু দেওয়া হয়। এছাড়া প্রথমে ছাত্র এবং পরবর্তিতে সহকর্মী প্রফেসর হানিফ স্যার, এডভোকেট মোজাম্মেল হক, হাজী নূরুল ইসলাম চৌধুরী, মোহাম্মদ হোসেন চৌধুরী, আব্দুল হান্নান স্যার, অধ্যক্ষ একেএম নজরুল ইসলাম স্যার, আব্দুর রাজ্জাক স্যার, ফজলুল হক স্যার, মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন স্যার, সামাদ স্যার, তোফাজ্জল স্যার, সেন্টু স্যারসহ আরও অনেক সন্মানিত শিক্ষকবৃন্দ ছিলেন তখন। আলহাজ্ব ইউনুছ মিয়া স্যার তখন বয়সে অনেকটা তরুন ছিলেন। কিন্তু অত্যান্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, নীতিবান ও ধার্মিক ছিলেন। দেখতে খুবই সুদর্শন ও প্রতিদিন ক্লিন শেভ করে কমপ্লিট স্যুট পরে প্রতিদিন লালমোহন হাই স্কুলে আসতেন। তখন লালমোহন এবং আশপাশের থানা থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা এসেও লালমোহন হাই স্কুলে পরত।

১৯৯০ সালে ইউনুছ স্যারকে নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। প্রধান শিক্ষক পদের লোভে একজন এ ষড়যন্ত্রের উস্কানি দিয়েছিল বলে জানা যায়। তবুও সচেতনভাবে তিনি সেই ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেছেন। এ প্রসঙ্গে ইউনুছ মিয়া স্যারের ছেলে রুবাইয়াত হাফিজ রুবু লেখেন, “আব্বাকে তখন শিক্ষা মন্ত্রীকে দিয়ে বাধ্যতামূলক অবসর দিতে চেয়েছিল। তাকে প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসতে দেওয়া হবে না। কিন্তু যশোর বোর্ড ও হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। সেদিন লালমোহন বাজারে ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ অবস্থান নেয়। আব্বা যখন ছাত্র ও অভিভাবকদের নিয়ে লালমোহন হাই স্কুলের দিকে রওয়ানা হল, তখন ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ হাইকোর্টের নির্দেশনা দেখার সাথে সাথে তারা সেখান থেকে সরে গেল। সেদিন ছাত্র নামের কিছু নামধারী লাঠিয়াল বাহিনী ও বহিরাগতরা অতর্কিতভাবে সাধারণ ছাত্রদের উপর হামলা চালায়। তারপর আমাদের বাড়ির উঠানে ছাত্র ও অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে আব্বা বলেন, আমার সাথে যা করেছে তাতে আমার দুঃখ নাই। কিন্তু তোমাদের গায়ে যে আঘাত করল এটা আমার মনে অনেক কষ্ট দিয়েছে। পরে ছাত্র-অভিভাবকদের ক্ষোভের কারণে হামলাকারীরা আমার বড় দুলাভাই বিশিষ্ট আইনজীবী এডভোকেট আমিনুল একরাম সাহেবের কাছে যান। দুলাভাই তাদেরকে বলেন, আব্বা যদি ক্ষমা করেন তাহলে ক্ষমা। তা না হলে কোন ক্ষমা নাই। তারপর তারা আব্বার কাছে ক্ষমা চান। আব্বা তাদেরকে ক্ষমা করে দেন।”

ইউনুছ স্যারের বাড়িটা ছিল বিশাল বড়। লালমোহন বাজারের পূর্ব মাথায় ইউনুছ মিয়া স্যারের বাড়ি। যদিও এ বাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেননি। লালমোহন ধলীগৌরনগরে এক বনেদী পরিবারে জন্মগ্রহন করেন তিনি। পিতা ছিলেন আলহাজ্ব তমিজউদ্দিন মিয়া। পরে এখানে আসেন তারা।  এ বাড়িটিও ছিল বনেদী। প্রায় দিন চোর নারিকেল সুপারি এসব চুরি করতে আসত। চোর ধরা পড়লে চোরকে তিনি বলতেন, ”সাবধানে নাম। পরে গেলে ব্যাথা পাবি। চাইলেই তো পাওয়া যায়, চুরি করা লাগে নাকি।” এজন্য তিনি চোরের কাছেও সম্মানিত ছিলেন।

শিক্ষাজীবনে লালমোহন হাই স্কুল থেকে ১৯৪৩ সালে মেট্টিকুলেশন (এসএসসি) পাস করেন ইউনুছ মিয়া স্যার। ১৯৪৫ সালে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও ১৯৪৭ সালে বিএ পাস করেন। পরে কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু সেখানে শেষ পর্যন্ত না পড়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে মাষ্টার্স করেন।
তিনি ইংরেজিতে ছিলেন খুবই দক্ষ। কারণ তার পরাশুনাকালীন সময়টা ছিল পুরোটাই ব্রিটিশ আমল। ক্লাস থ্রি থেকে প্রতিটা বই ছিল ইংরেজিতে এবং কোন সিলেবাস ছিলনা। তাই বইয়ের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মুখস্ত করা লাগত। তিনি প্রতিদিন ১৪ ঘন্টা পরাশুনা করতেন। প্রতিদিন ডায়রি লিখতেন ইংলিশেই এবং দৈনিক একটি ইংরেজি পত্রিকা তার জন্য আসত।

ইউনুছ মিয়া স্যারের প্রথম সন্তান ছিল মেয়ে। তারপর ছেলে। হঠাৎ একদিন চাঁদের মত সুন্দর পুত্র সন্তানটি পানিতে পরে মারা যায়। প্রথম পুত্র শোক তাকে অনেক কষ্ট দেয়। এরপর তিনি দাঁড়ি কাটেননি।
১৯৯৭ সনের ২৭ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন স্যার। তার জানাজায় দলমত নির্বিশেষে সকলে অংশ নেন এবং সারাদিন বাজার বন্ধ রাখেন। মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সংগঠন মিলাদের আয়োজন করে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে স্মরণসভা করে।

ইউনুছ মিয়া স্যারের প্রথম মেয়ে দিল আফরোজ লিলুও ২০১০ সনের ১৪ মার্চ মারা যায়। বর্তমানে ৫ মেয়ে ও ৪ ছেলে আছে। ৪ ছেলে ও ১ মেয়ে বর্তমানে পরিবার নিয়ে আমেরিকা বসবাস করেন। দুই মেয়ে সংসার নিয়ে আছে কানাডা। ২ মেয়ে ঢাকা থাকে।

ইউনুছ মিয়া স্যার অত্যন্ত আল্লাহভীরু মানুষ ছিলেন। তিনি কখনও কোন রেস্টুরেন্টে ঢুকতেন না। রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় সকলে সম্মান জানিয়ে অন্য পাশ দিয়ে হাঁটত। এমনকি রিক্সা সাইকেলের অনেক যাত্রীরা ওভারটেক করে যেতেন না। হাত দিয়ে ইশারা দিলে তারপর যেতেন। তার নৈতিকতা, আদর্শ ছিল পাহাড়সম। ব্যাক্তিত্ব ও দায়িত্বশীলতার জন্য লালমোহনের মানুষ আজও স্যারকে শ্রদ্ধার সাথে স্বরণ করে।

Facebook Comments Box


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি