LalmohanNews24.Com | logo

১২ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

স্বৈরতন্ত্রের রাহুগ্রাস

স্বৈরতন্ত্রের রাহুগ্রাস

বিশ্বব্যাপী পুনরায় শুরু হল স্বৈরতন্ত্রের দোর্দণ্ড প্রতাপ ও অরাজকতা। শাসনের নামে দুঃশাসন, গণতন্ত্রের নামে একনায়কতন্ত্র, নির্বাচনের নামে প্রহসন এবং মানবতার নামে চরম অমানবিকতা ও উন্নয়নের নামে লুন্ঠন।

একটা সময় ছিল রাজার একচ্ছত্র কর্তৃত্বকে মানুষ স্বাভাবিকভাবে নিতো, জমিদারের জুলুমকেও মুখবুঁজে সহ্য করতো। পাইক-পেয়াদার অত্যাচারকে নিজের ত্রুটি, ঈশ্বরের অভিশাপ বলে জ্ঞান করতো। অবশ্য তখনও ভাল লোকের কদর ছিল। প্রতিবাদকারীর মর্যাদা ছিল। কিন্তু শাসক বা রাজার কাছ থেকে তারা কদাচিৎই ভাল ব্যবহার পেয়েছে। তারজন্য মানুষ রাজতন্ত্র বা রাজার দীর্ঘমেয়াদী শাসন ও রাজত্বের উত্তরাধিকার ব্যবস্থাকে ভাল চোখে দেখেনি।

শাসকদের অত্যাচার-অবিচার থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন দেশে নবী-রাসূল এসেছেন, ধর্ম গুরু বা মহামনীষীগণ এসেছেন, দার্শনিক-জ্ঞানীগণ এসেছেন। তারা মানুষকে তাদের বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করার জন্য সদুপদেশ দিয়েছেন, সঠিক পথের পথনির্দেশন দিয়েছেন। কেউবা বিপথগামীদের প্রতিরোধ গড়েছেন, শক্তি দিয়ে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছেন। জালেম শাসকের বিরুদ্ধে কেউ কেউ যুদ্ধ করেছেন। সে চেষ্টায় কেউ সফল হয়েছেন। কেউবা ব্যর্থ হয়ে ঐ জনপদ ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তারজন্য অনেক রক্ত ঝরাতে হয়েছে, যুদ্ধ করতে হয়েছে, অনেক অঘটন ঘটেছে, অনেক সমৃদ্ধ সভ্যতা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, অনেক স্থানে নতুন চর জেগেছে, নতুন দেশ বা সমাজ সৃষ্টি হয়েছে।

বিংশ শতকে পৃথিবীতে বড় বড় দুটো ঘটনা ঘটল। সে দুটো ঘটনা হল দুটো বিশ্বযুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সৃষ্টি হল লীগ অব নেশনস, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সৃষ্টি হল ইউনাইটেড নেশনস বা জাতিসংঘ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তুলনায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির পরিমান অনেক বেশি। এর প্রেক্ষিতে মিত্রশক্তি অনেক চিন্তা-ভাবনা করে সর্বদেশের জন্য গ্রহণযোগ্য করে এমন একটা সংস্থার জন্ম দিলেন, লোকে ভাবলো, একে ডিঙ্গিয়ে পৃথিবীতে যুদ্ধ করার দুঃসাহস কেউ দেখাবে না। অপর দেশ কেউ দখল করতে যাবে না বা দেশের অভ্যন্তরেও কেউ দু:শাসন কায়েম করবে না। আর যুদ্ধ লাগার সম্ভাবনাও থাকবে না। অন্তত মানবতা বিধ্বংসী আর কোন অঘটন ঘটবে না। ঘটাতে গেলেই ঐ বিশ্বসংস্থাটি তার রাশ টেনে ধরবে।

এবার আসা যাক অন্য প্রসঙ্গে। ২য় বিশ্বযুদ্ধের আগে সামন্তবাদী সমাজে বাংলার সামাজিক অবস্থা কিরূপ ছিল শরৎবাবুর ‘মহেশ’ ও ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্প দুটি পড়লেই সেটা আঁচ করা যায়।
মহেশ গল্পটি শুরু হয় এভাবে ‘গ্রামের নাম কাশীপুর। গ্রাম ছোট জমিদার আরও ছোট, তবু দাপটে তাঁর প্রজারা টুঁশব্দটি করিতে পারে না। এমনই প্রতাপ। … গল্পের শেষে দেখা যায় সেই ছোট জমিদারের অত্যাচারে দরিদ্র প্রজা গফুর পৈত্রিক ভিটামাটিতে আর থাকতে পারে না। সে যে গরুটাকে আপন ছেলে বলে জ্ঞান করতো, ঘাস খাওয়াতে ব্যর্থ হয়ে ক্ষোভে-দুঃখে সে তাকে লাঙ্গলের ফলা দিয়ে মেরে ফেলে। শেষে সে গ্রামের সবকিছু ফেলে ফুলবেড়ের চটকলে কাজ নেয়। যাবার সময় ওপরওয়ালার কাছে অভিশাপ দেয়, যারা তার মুখের গ্রাস এবং মহেশের ঘাস কেড়ে নিয়েছে, খাবার পানিটুকু কেড়ে নিয়েছে, ওপরওয়ালা যেন তাকে ক্ষমা না করেন। সেদিনের অত্যাচারী জমিদারের অত্যাচারের প্রতিবাদ করার ভাষা ছিল না, কোথাও নালিশ জানানোর জায়গা ছিল না, বিচার পাবার নিশ্চয়তা ছিল না। ফলে মুখবুঁজে অত্যাচারীর অত্যাচার সহ্য করতে হতো, অথবা সহ্য করতে না পারলে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হতো।
এবার শরৎবাবুর আরেকটি গল্প ‘অভাগীর স্বগর্’ থেকে কিছু অংশ তুলে ধরছি। গল্পটি প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালে। ‘কুটির প্রাঙ্গণে একটি বেলগাছ, একটা কুড়ুল চাহিয়া আনিয়া রসিক তাহাতে ঘা দিয়াছে কি দেয় নাই, জমিদারের দারোয়ান কোথা হইতে ছুটিয়া আসিয়া তাহার গালে সশব্দে একটা চড় কসাইয়া দিল, কুড়ুল কাড়িয়া লইয়া কহিল, একি তোর বাপের গাছ আছে যে কাটতে লেগেছিস।’ রসিক গালে হাত বুলাইতে লাগিল, কাঙালি (রসিকের ছেলে) কাঁদ কাঁদ হইয়া বলিল, বা এ যে আমার মায়ের হাতে পোঁতা গাছ, দারোয়ানজী ! বাবাকে তুমি খামোকা মারলে কেন ?’
এখানেই প্রতিবাদ শেষ, প্রতিরোধ শেষ, ন্যায় বিচার পাবার আশা শেষ। মানবাধিকারের বালাই পর্যন্ত নেই। সামন্ত যুগেএমনি ছিল মানুষের ব্যবহার। এরকমই ছিল জমিদারের প্রতাপ। সমাজের মানুষ এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে কি। বরং মারামারির ঘটনা দেখতে এসে যে ভিড় জমে উঠেছিল এবং যে কয়জন লোক হাজির হল, তারা বলাবলি করতে লাগল, বিনা অনুমতিতে রসিকের গাছ কাটতে যাওয়া ঠিক হয় নাই। যে নারী তার ঘরের সামনে নিজ হাতে গাছ রোপন করল, মরণের পর সে গাছ দিয়ে সৎকার হবে, সেও জমিদার হতে দেয় না। বরং গাছ কাটাই অপরাধ, এমনই ছিল সমাজের অবস্থা।
সে দিনে অপরাধীর বিচার হতো না, কোথাও গিয়ে ন্যায়বিচার পাবারও আশা ছিল না। নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষ সে আশাও করতো না। কারণ ইংরেজ রাজত্ব মানে জোর-জুলুমের রাজত্ব। শাসক জালেম হওয়ায় মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা আরও বেশি জুলুম করার সুযোগ পেয়ে যায়। পাইক পেয়াদা, দারোয়ান, বরকন্দাজ, আর্দালী, কোতয়াল, তহশিলদার এদের সীমাহীন অত্যাচারও মানুষ মুখবুঁজে সহ্য করতো। যাদের পক্ষে আর সহ্য করা সম্ভব ছিল না তারা চুপচাপএলাকা ছেড়ে চলে যেতো।

কর্তৃত্ববাদী শাসকের কবল থেকে মুক্তি পাবার জন্য মানুষ একসময় ঘুরে দাঁড়ায়। ২য় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ছিল বৃটিশদের। জার্মানরাও সমসাময়িক কালে প্রচুর শক্তির অধিকারী হয় এবং তারা তাদের উৎপাদিত শিল্পপণ্য বাজারজাত করতে চায়। কিন্তু বৃটেনের মত তাদের উপনিবেশ বা বিজিত রাজ্য না থাকায় তারা তাদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে বিপাকে পড়ে। ইংল্যান্ডের বাধার কারণে জার্মানরা তাদের পণ্য নিয়ে বিশ্ববাজারে ঢুকতে পারছিল না। ঠিক এ কারণেই সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, হিটলার-মুসোলিনী অন্যের বাজার কব্জ করতে গিয়ে নিজেরাই ইংরেজের চেয়ে অত্যধিক বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হয়। বৃটিশদের অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিরোধ করতে গিয়ে নিজেরাই অধিক অন্যায়কারী হয়ে ওঠে। তার শেষ পরিণাম কী হয়, সেটা বিশ্বেও তাবৎ শিক্ষিত লোকদের জানা।

২য় বিশ্বযুদ্ধের পর এ কারণেই বৃটিশরা ভারতবর্ষসহ অনেক উপনিবেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। বিশ্বব্যাপী মানুষের মানবিক অধিকার, ন্যায় বিচার পাবার অধিকার, ভোট প্রয়োগের সমান অধিকার নিশ্চিত হয়। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর মানুষ মনে করেছিল বিশ্বে আর কখনো যুদ্ধ হবে না বা কোন রাষ্ট্র বা সরকার তার দেশের নাগরিকদের উপর নিপীড়ন চালানোর সাহস পাবে না। এ কারণে ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সেবার মনোভাব প্রাধান্য পায়। পরিবর্তন আসে কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে। যারা সামন্তবাদী মানসিকতা দিয়ে দেশ চালাতো তাদের বদলে দেশ চলে আসে সাধারণ মানুষের হাতে। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব সামাজিক কর্তৃত্বের এ পরিবর্তনকে সাধারণ মানুষ স্বাগত জানায়। কারণ এসব ছিল সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলনের ফসল। যদিও ফ্রান্স, আমেরিকা, জাপান, ব্রিটেনসহ অনেক দেশে মানুষের মানবিক-গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে অনেক আগে কিন্তু উপনিশিক দেশের নাগরিকদের সে অধিকার পেতে ২য় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত অপেক্ষা করা লাগে।

মুশকিল হল ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর ছয়-সাত দশক পার হতে না হতেই পুনরায় নানা দেশে ফিরে আসে ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসন, একনায়কদের দোর্দন্ড প্রতাপ, শাসনের নামে দু:শাসন, উন্নয়নের নামে অনাচার-অরাজকতা। দিনে দিনে পৃথিবী পরিচালনার দায়িত্ব চলে যায় দুস্কৃতিকারীদের হাতে। স্বচ্ছ-সুন্দর ও উদার-উন্নত নেতাদের বদলে নেতৃত্ব চলে যাচ্ছে অসৎ ও অসভ্য পিশাচ লোকদের কব্জায়। উদাহরণ হিসেবে আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর কথা বলা যায়। সে কেমন মানুষ? সে কি রাজনীতিবিদ নাকি ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ী হলেও সে কিসের ব্যবসা করেছে? আমেরিকার মত একটা উন্নত ও সভ্য দেশের নেতৃত্ব চলে যায় একটা জুয়াচোর ক্যাসিনো ব্যবসায়ীর হাতে। একইভাবে বলা চলে ভারতের নরেন্দ্র মোদী, ইজরাইলের নেতানেয়াহু ও মিয়ানমারের অংসান সুচি সম্পর্কে। তারা গণতান্ত্রিক কায়দায় নির্বাচিত হলেও তাদের কার্যক্রম কত ভয়ংকর সেটা বলারই অপেক্ষা রাখে না।

এ অমানবিক লোকদের ক্ষমতায় আসায় সেসব দেশের সাধারণ নাগরিকদের পাশাপাশি অধিক সমস্যা হয়েছে সংখ্যালঘু মুসলমানদের। আমেরিকার পাশাপাশি পশ্চিমের প্রায় সব দেশেই একই কারণে তাদের বিপদে পড়তে হয়। অত্যধিক বিপদ হয় মিয়ানমার, চীন, ভারত, সিরিয়া, ফিলিস্তিনে। মিয়ানমার তো রোহিঙ্গা মুসলমানদের দেশ থেকেই তাড়িয়ে দেয়। কি পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে তাদের দেশছাড়া করেছে, পৃথিবীর মানুষ সেটা সজ্ঞানে প্রত্যক্ষ করেছে। ফিলিস্তিনের চারপাশ দখলদার ইসরাইলের দখলে। নুন থেকে চুন খসলেই তারা নিরীহ ফিলিস্তিনীদের উপর মিসাইল হামলা চালায়, বুলডোজার দিয়ে তাদের বাড়িঘর গুড়িয়ে দেয়। তারা বাইতুল মাকদাসে নামাজ পড়তে যাবে, তাতেও কত বাধা, কত রকম বিপত্তি। নামাজ পড়ার জন্যও তাদের রীতিমত যুদ্ধ করতে হয়।

সর্বশেষে দেখলাম কসাই নরেন্দ্র মোদী শাসিত ভারতে কিভাবে সংখ্যা লঘু মুসলমানেরা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছে। তাদের নিপীড়ন থেকে শিশু-মহিলারাও রক্ষা পায়নি। মুসলমানদের বাড়িঘর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং মসজিদ-মাদরাসা ও ঘরবাড়িতের আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। সকলে দেখেছেন সে হামলায় শুধু বিজেপি বা আরএসএস এর গুণ্ডারাই যুক্ত নয়, যুক্ত ছিল খোদ পুলিশও। চীনে আমরা কী দেখছি, ধর্ম ত্যাগের জন্য লাখ লাখ উইঘুর মুসলিমকে বন্দি করে রেখেছে এবং নারী পুরুষ নির্বিশেষে তাদের ওপর সমানভাবে নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে দেখা যায় রাজতন্ত্রের নামে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। বিশেষ করে ইসলামের মূল তীর্থভূমি সৌদি আরবের পার্শ্ববর্তী দেশ সিরিয়ায় যুদ্ধের নামে একযুগ ধরে চলছে লাখ লাখ মানুষের করুণ মৃত্যু। সৌদি আরব কোন রকম উস্কানি ছাড়াই ইয়েমেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। সে যুদ্ধে ইয়েমেনের মুসলমানদের কী ভয়ানক দূরাবস্থা, সেটা সকলের জানেন। পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতার এক লীলাভূমি সিরিয়া। বার বছর ধরে যুদ্ধ চলায় সে দেশের সাধারণ মানুষ ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি ও মৃত্যুর শিকার। সিরিয়া যুদ্ধের সাথে পরাশক্তি যুক্ত। একপক্ষ চাচ্ছে রাজতন্ত্র টিকে থাক, কুখ্যাত বাশার আলআসাদ ক্ষমতায় থাকুক। আরেক পক্ষ চাচ্ছে তার উৎখাত । মাঝখান দিয়ে মার খাচ্ছে মুসলমানরা। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মুসলমানের দেশ সিরিয়া। স্বৈরশাসক বাশার আলআসাদ তার ক্ষমতাকে ধরে রাখার জন্য বলতে গেলে দেশটাকেই রণাঙ্গণে পরিণত করেছে। তার টিকে থাকার জন্য সে এক পরাশক্তিকে ডেকে এনেছে। প্রতিপক্ষ কি বসে থেকেছে ? না, তারাও নিজেদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে আরেক পরাশক্তিকে ডেকে এনেছে। দুই পরাশক্তি দীর্ঘ একযুগ ধরে যুদ্ধ করছে। যুদ্ধে সহস্র বছরের প্রাচীন সভ্যতা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। সেখানকার অধিবাসী, যারা আগেই দেশের সীমানা পেরিয়ে রিফুজি হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে বা ইউরোপে চলে গেছে, তারা তো পার পেয়ে গেছে। যারা বোকার মত মাটি কামড়ে ছিল তারাই বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে। অথচ একযুগ ব্যাপী সে যুদ্ধে আগাগোড়া ক্ষতি হয়েছে মুসলমানদের, ক্ষতি হয়েছে একটি শক্তিধর মুসলিম দেশের।

ফেরাউনি শাসনের একটা বড় নজীর হল, দেশের জনগণকে ভাগ করা এবং শাসন করা। দেশের মানুষকে যদি বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ বা গোষ্ঠিগত পরিচয়ে বিভক্ত করে ফেলা যায় এবং বিভিন্ন দল-উপদলকে ভাগ করে পরিচয় সংকটে বা অর্থসংকটে ফেলে দেয়া যায় তাহলে তাদের শক্তি কমে যায়। তখন তারা ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি ও সাহস হারিয়ে ফেলে। আমাদের দেশে যেমন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ও বিপক্ষের শক্তি বলে দেশের মানুষকে দু ভাগ করে ফেলা হয়েছে। একই পদ্ধতিতে আমেরিকায় ট্রাম্প দেশের নাগরিকদের ভূমিপুত্র ()ও অভিবাসী এ দু শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। মনে রাখতে হবে, মানুষের ঐক্যশক্তির চেয়ে বড় শক্তি আর নেই। স্বৈরাচারী কায়দায় নিয়ন্ত্রণ করার প্রথম ও প্রধান অস্ত্র হল দেশের মানুষকে তাদের ধর্মে-ধর্মে, বর্ণে-বর্ণে ও জাতপাতে ভাগ করে ফেলা। তাহলে তাদের মধ্যকার ঐক্যশক্তি ভেঙে যায় এবং অনেকদিন শোষণ করা যায়। যেমন ইংরেজরা ধর্ম-বর্ণ ও জাতপাতের দোহাই দিয়ে ভারতবাসীকে অসংখ্য ভাগে ভাগ করে ফেলেছিল। ফলে তাদের দীর্ঘদিন শাসন করা সম্ভব হয়েছিল।

২০০৯ সালে লীগসভানেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার আগেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। এই বিভক্তির বিভ্রান্তিকর বক্তব্য তার মুখে দেশের মানুষ প্রথম শুনলো। এর আগেও মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে রাজনীতি হয়েছে। রাজনীতিতে মুক্তিযোদ্ধারা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল, অমুক্তিযোদ্ধারা কোনঠাসা ছিল। চাকরি-বাকরি থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাধান্য ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে কেউ দেশের মানুষকে দ্বিধাবিভক্ত করেনি। করার প্রয়োজনও ছিল না। খোদ স্বৈরাচারী এরশাদও তেমন কোন পলিসির কথা বলেনি। জাতিকে ভাগ করার প্রথম ঘোষণা এলো খোদ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার কাছ থেকে। তখনই দূরদষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিকরা বুঝেছিলেন এর মধ্যে দুর্ভিসন্ধি আছে। শেখ হাসিনা হয়ত ইন্ডিয়ান এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছেন।

২০০৯ সালে তার ক্ষমতারোহনের শুরুতে একটা দু:খজনক ঘটনা ঘটল। ফেনির দিকে একটা বাস এক্সিডেন্ট করল। এক্সিডেন্ট এরকম অহরহ ঘটে। কিন্তু ব্যতিক্রমী বিষয় ছিল বাসটিতে আগুন ধরে যায় এবং তাতে প্রায় সব যাত্রী আগুনে পুড়ে মারা যায়। তখনই আমাদের চেনাজানা একজন মওলানা সাহেব বললেন সামনে দেশে অনেক অঘটন ঘটবে। দেশের মানুষের কপালে অনেক দুর্গতি আছে। ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই বিডিআর-এর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয় এবং আমাদের সেনা সদস্যদের ৫৭ জন চৌকস অফিসারসহ অনেক বিডিআর সদস্য মারা গেল। সেই যে হত্যাকান্ডের যাত্রা শুরু। তারপর বিচারের নামে কত অবিচার, শাসন-দমনের নামে কত খুন, গুম, লুটপাট এবং আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনা ঘটল, তার কি কোন ইয়াত্তা আছে।

২য় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশে দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের সুবাতাস বইতে শুরু করেছিল। এখন সে বাতাস সম্পূর্ণ উল্টোদিক থেকে বইছে। এখন কোথায় গণতন্ত্র, কোথায় জবাবদিহিতা, কোথায় মানবিকতা। চীন ও রাশিয়া দুই মহাশক্তিধর দেশের শাসকরা গণমানুষের মতামত নিবে কি, তারা আইন করে নির্বাচন প্রকৃয়াই তুলে দিয়েছে। দুই দেশের দুই প্রেসিডেন্ট যতদিন ইচ্ছা ক্ষমতায় থাকবেন। তাদের কাছ থেকে কি গণতান্ত্রিক আচরণ আশা করা যায়?

অতিসম্প্রতি দু’দেশের দু’জন প্রধানমন্ত্রী তাদের সেবামূলক কর্মের জন্য বিশ্বব্যাপী উচ্চ প্রশংসা পেয়েছেন। একজন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন। ২য়জন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। তার সাথে যোগ করা যায় পশ্চিমবঙ্গেও সেবাপরায়ণ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর নাম। ২০১৯ সালের ১৫ মার্চ ক্রাইস্ট চার্চ মসজিদে একজন বন্দুকধারীর হামলায় ৫১ জন মুসল্লি মৃত্যু বরণ করে। এ মর্মান্তিক ঘটনার পর জেসিন্ডা ভিন্নধর্মাবলম্বী প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও দ্রুত ব্যবস্থা নেন। তিনি শোকের পোশাক পরে মাথায় কাপড় দিয়ে এসে মুসলিম নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। শান্তচিত্তে তাদের সকল বক্তব্য শোনেন। কথা শোনার সময় তাকে হতবিহ্বল দেখাচ্ছিল এবং তার চোখছিল অশ্রুসজল। মজার ব্যাপার হল, কথা বলার সময় তার সাথে ছিলেন কয়েকজন কেবিনেট মন্ত্রী ও এমপি। তার সমবেদনা প্রকাশের ধরনই পৃথিবীর মানুষকে অভিভূত করে এবং তিনি তার জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসা লাভ করেন।

একই অবস্থা দেখি আমরা জাস্টিন ট্রুডোর ক্ষেত্রেও। ২০১৭ সালে যখন আমেরিকায় ৭টি মুসলিম দেশের অধিবাসী বা শরণার্থীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তখন জাস্টিন ট্রুডো তার দেশে সেই সাত দেশের শরণার্থীদের স্বাগত জানান। দেশ সাতটি হলÑ সিরিয়া, ইরান, ইরাক, লিবিয়া, সোমালিয়া, ইয়েমেন ও সুদান। তিনি বলেন সকলের জন্য আমার দেশের দরজা খোলা। এ বক্তব্য দিয়ে তিনি প্রথম বিশ্ববাসীর নজর কাড়েন। সর্বশেষ চলতি বছর (২০২০) করোনা ভাইরাসে যখন সারা পৃথিবী কাঁপছে এবং নিজ দেশের লোকরা আক্রান্ত হচ্ছে তিনি দেশের নাগরিকদের জন্য একটা কমন সুবিধার কথা ঘোষণা করলেন। তিনি এক মাসের ছুটি ঘোষণা করেছেন এবং দেশের নাগরিকদের যার যার ঘরে থাকতে বলেছেন। এও বলেছেন আপনারা ঘরে থাকুন, এক মাসের বেতন ও খাবার ও ভাড়িভাড়া পৌঁছে দেয়া আমার দায়িত্ব। করোনা ভাইরাসের এ দুর্দিনে যখন এ রোগ আরো পৃথিবীকে কাঁপিয়ে তুলছে, বিশ্বনেতৃত্বকে অস্থির করে তুলছে, সে সময়ে ট্রুডোর এ সাহসী পদক্ষেপ সারা পৃথিবীর মানুষের মধ্যে আশার আলো জাগিয়ে তুলেছ্

কিন্তু দুর্ভাগ্য হল, কানাডা আর নিউজিল্যাণ্ড তো আমেরিকা, চীন, রাশিয়ার মত প্রভাবশালী দেশ না। এছাড়া চীন ও রাশিয়ায় স্বৈরতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্র বিদ্যমান। পৃথিবীর গণতন্ত্রকামী মানুষ কি তাদের কাছ থেকে গণতান্ত্রিক আচরণ বা মানবিক অধিকার আশা করতে পারে ? পারেনা। পারার চিন্তা করাও ঠিক না। অন্যায়কারীরা চায় অপরাপর সমাজেও অন্যায় ছড়িয়ে পড়ুক, একনায়করা চায় দেশে দেশে একনায়কত্ব-স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক। তাহলে অন্যায়-অত্যাচারের জন্য মানুষ একা তাদের দায়ী করবে না। দায়ী করা হবে অনেককে।

করোনা মহামারির মত স্বৈরাচারিদের স্বৈরতšও আজ¿ দেশে দেশে অমানবিকতার জাল বিস্তার করে ফেলেছে। সহসা পরিবর্তনের কোন আশা দেখছি না। আশার আলো হচ্ছে করোনা ভাইরাস, আশার আলো হচ্ছে সম্ভাব্য আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ। না হয় খুব সহসা স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের অনাচার থেকে পৃথিবীর মানুষ মুক্তি পাবে, আমার মনে হয় না।

Facebook Comments


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি