LalmohanNews24.Com | logo

৮ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ২৪শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

শীতে বাংলার রূপ বৈচিত্র্য

শীতে বাংলার রূপ বৈচিত্র্য

ছয় ঋতুর রূপসী বাংলাদেশে আনন্দ-কষ্ট মিশ্রিত এক বৈচিত্র্যময় ঋতু শীতকাল। শীতের হিমেল হাওয়া আর নান্দনিক দৃশ্য আমাদের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে। কনকনে শীতের মিষ্টি মিষ্টি আমেজে মন ভরে ওঠে। হাড়কাঁপানো শীতের দাপটে কেঁপে ওঠে বাংলার প্রতিটি জনপদ। তীব্র শীতে কোঁ কোঁ করে কাঁপে মানুষ আর পশুপাখি। কুয়াশার চাদরে ঢেকে যায় বাংলার মুখ। শীতের সকালে সোনালী রোদের আভায় দুর্বা ঘাসের ওপর শিশির বিন্দুর অমলিন সোনালী হাসিতে যেন মুক্তা ঝরে। তখন রূপসী বাংলার এক অনাবিল অপরূপ অপূর্ব সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। বাংলার এই অপরূপ যেন হৃদয় ছুঁয়ে যায়, কবিতা হয়ে ছন্দে বিলায়, সুর হয়ে গান গায়।
কথায় আছেঃ পৌষের শীত মোষের গায়। মাঘের শীত বাগের গায়। শুধু মোষ আর বাগ নয়। প্রচন্ড শীতে মানুষ কাবু হয়ে যায়। বিশেষ করে পথশিশু, ভাসমান মানুষ ও গরীব মানুষদের জন্য শীত খুব ভয়ানক। শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে শীতের প্রকোপ বেশি হয়। কারণ গ্রামের অধিকাংশ মানুষ গরীব। তাদের অনেকের ভাঙা ঘর। শীত নিবারণ করার মতো উপযুক্ত শীতবস্ত্র তাদের নেই। ভাঙা ঘরে হিমেল হাওয়া আর কুয়াশা অনায়াসে ঢুকে পড়ে। ছেঁড়া কাঁথা ভিজিয়ে দেয়। ফলে শীতে কাঁপতে কাঁপতে অনেকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। শীতে ভাসমান মানুষ ও পথশিশুদের অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায়। এদের অনেককে খোলা আকাশের নীচে থাকতে দেখা যায়। বুকে হাত বেঁধে শীতে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে। আগুন জ্বেলে শীত নিবারণ করতে দেখা যায়। প্রচন্ড শীতে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। শহরজুড়ে শীত উপলক্ষে কত উৎসব! কত আনন্দ আয়োজন! কফিশপে কত ভিড়! অথচ এরই মধ্যে শীতে জবুথবু পথশিশু ও ভাসমান মানুষ একটি কম্বলের স্বপ্ন দেখে। শীতবস্ত্র নিয়ে এসব অসহায় শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সামাজিক, মানবিক ও নৈতিক কর্তব্য।
বাঙালির জীবনে শীতকালের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। কেননা বাংলার রূপ বৈচিত্র্যে শীতের প্রভাব বেশি। অন্যসব ঋতু থেকে শীতের বৈশিষ্ট্য ব্যতিক্রম। প্রাপ্তির অপার আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে হলুদ পাতার ঝরা খামে শীতের চিঠি আসে। উত্তরের পথ ধরে ঘন কুয়াশার উত্তরীয় গায়ে হিম শীতল বাতাসে প্রকৃতিতে শীতের বার্তা দিয়ে যায়। পৌষ-মাঘ এ দুই মাস শীতকাল হলেও মূলত অগ্রহায়ণ মাস থেকে শীতের আবহ শুরু হয়ে ফাগুন মাস পর্যন্ত থাকে। শীত উৎসবে জেগে ওঠে বাংলার প্রতিটি জনপদ। পিঠা পুলি আর খেজুর রসের মিষ্টি মধুর ঘ্রাণে বাংলার ঘরে ঘরে বরণ হয় শীত। বয়ে যায় শীতের আবহ।
ইটভাটার করালগ্রাস, গাছ রোপণ, সংরক্ষণ ও পরিচর্যার অভাব ইত্যাদি কারণে এখন গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের খেজুর গাছ বিলুপ্তির পথে। যার কারণে খেজুর রস, রসের রসদ সিন্নি, পাটালী গুড়, চিট মিঠাই দুর্লভ হয়ে ওঠেছে। শীতে গ্রামগঞ্জে মোয়া, জিলাপি, মুড়ি, ভাপা পিঠা, নকুলদানা, বাতাসা ইত্যাদি খাওয়ার ধুম পড়ে।
এদেশের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যেন শীতকাল একাকার হয়ে মিশে আছে। শীতকালে গ্রামাঞ্চলে যাত্রা, সার্কাস, পুতুল নাচ ও জারীগানের আসর বসে। রাতভর যাত্রাপালা দেখে গ্রামের মানুষ খুব আনন্দ পেত। একসময় গ্রামবাংলায় এসব ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানের খুব প্রচলন থাকলেও  আজকাল তেমন দেখা যায় না। তবে শীতকালে এখনও বিভিন্ন গ্রামীণ জনপদে বিয়েশাদীর অনুষ্ঠানেের ধুম লাগে। সঙ্গী-সাথী ও বন্ধু-বান্ধব নিয়ে শীতের সঙ্গীত উৎসব উপভোগ করা কিংবা সিনেমা দেখার আনন্দের কথা পৃথিবীর কারও অজানা নয়। কেননা পৃথিবীর সব দেশেই শীত আসে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে অতিথি পাখি এসে আমাদের দেশে শীতকালকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলে।
পৃথিবীর অনেক দেশে শীতকালে বরফ জমে। যার কারণে মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা ও জীবনযাত্রা খুব বেদনাদায়ক ও অসহনীয় হয়ে ওঠে। আমাদের দেশে শীতকালে বরফ জমে না। পথঘাট শুকনা থাকে। চলাফেরা করতে সুবিধা হয়। গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়া কুয়াশার ছন্দময় শব্দ মানুষের মন কেড়ে নেয়। চুপিসারে বিবর্ণ হলুদ পাতা পথের ধুলায় খসে পড়ে।
শীতকালে টাটকা শাকসবজি ও তরকারি পাওয়া যায়। মুলা, গাঁজর, লাউ, কুমড়া, রসুন, পেঁয়াজ, কলাই, সরিষা,শালগম, আলু, পালংশাক, বেগুন, শিম, বরবটি, মটরশুঁটি, ফুলকপি, বাঁধাকপি প্রভৃতি শীতকালীন সবজি ও ফসলের দৃশ্য গ্রামবাংলার ক্ষেতে ক্ষেতে দেখলে মন ভরে ওঠে। শীতকালে গোলাপ, অশোক, ক্যামেলিয়া, বাগানবিলাস ও কুরচি প্রভৃতি ফুল ফোটে। শিং, জাগুর, শৈল ও বোয়ালসহ বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু জিয়ল মাছ শীত মৌসুমে দেদার মিলে। এসব মাছের স্বাদ যেন আরও বাড়ে। বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে ধান কাটার ব্যস্ততা আর সোনালী ধানের আভায় কৃষাণের হাসি আগামীর স্বপ্ন পুরনের মহোৎসব। শীতকালে পাড়াগাঁয়ে গিরস্তের ঘরে ঢেঁকির ঢুকুর ঢুকুর মনমাতানো শব্দ শুনতে বেশ ভাল লাগে। কিন্তু যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে ঐতিহ্যের সেই ঢেঁকি বিলুপ্তির পথে।
শীতকালে নিউমোনিয়া ও অন্যান্য ঠান্ডাজনিত রোগব্যাধিতে শিশুরা আক্রান্ত হয়ে থাকে। গ্রামের কত বৃদ্ধ মানুষ শীত নিবারণ করতে গিয়ে আগুনের আউত্তা সাথে নিয়ে ঘুমানোর সময় কত কাঁথা পুড়ে ফেলেছে! সেই সঙ্গে নিজেরাও ছ্যাঁকা খেয়েছে ঢের। অথচ সেই সব মানুষকে জিজ্ঞেস করলে বলে, শীতকালই ভাল।
বাংলা সাহিত্যে শীত নিয়ে অনেক কবিতা ও রচনা রয়েছে। অনেক প্রবাদ-প্রবচন রয়েছে। বিশ্বজুড়ে কবি সাহিত্যিকরা শীতকাল নিয়ে লিখেছেন। এতে সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে। অনেক আনন্দ-বেদনার মিশেল নিয়ে আমাদের জীবনে শীত আসে। শীতে প্রেম আর প্রকৃতি যেন একাকার হয়ে আমাদের কাছে আসে। তাই বলা যায়, শীতে স্বপ্ন আছে, প্রসন্নতা ও বিষন্নতার আবহ আছে। শীতকালকে আমাদের ক্লান্তি, অসহায়ত্ব এবং বিপন্নতা মোচনের কাল বলা চলে। আমরা যদি সাহায্য, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে গরীব অসহায় মানুষদেরকে শীতবস্ত্র দিয়ে সবাইকে শীতের কষ্ট কাটিয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারি তাহলে শীতকালীন প্রকৃতির নান্দনিক উপহার সবাই মিলে উপভোগ করতে পারি।

লেখক : নুরুল আমিন, সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি, নাট্যকার  ও প্রাবন্ধিক, লালমোহন, ভোলা। nurulamin911@gmail.com, 01759649626.

Facebook Comments


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি