LalmohanNews24.Com | logo

২৪শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ৯ই আগস্ট, ২০২০ ইং

যে খুনের রহস্য আজো অজানা

যে খুনের রহস্য আজো অজানা

১৯৭৩ সালে নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের পার্লামেন্টে উপস্থিত হয়েছেন। যার যার এলাকার সমস্যা নিয়ে কথা বলতে সুযোগ দেওয়া হয়েছে এমপিদের। পার্লামেন্টে বসে আছেন রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। পাশে রয়েছেন বঙ্গবন্ধুর কাছের মানুষ তোফায়েল আহমেদসহ মন্ত্রী পরিষদের সদস্যগণ। মাউথ স্ট্যান্ডে আসলেন লালমোহন ও চরফ্যাশনের একাংশ নিয়ে গঠিত তৎকালিন বাকেরগঞ্জ-৩ আসনের এমপি মোঃ মোতাহার উদ্দিন। তার কণ্ঠ থেকে শুরু হলো এলাকার সমস্যা সম্ভাবনা নিয়ে ঝাঁঝালো বক্তব্য। সকল এমপিরা স্বতঃস্ফুর্তভাবে এ এমপির বক্তব্যকে অভিনন্দন জানায়। দীর্ঘ ৪৫ মিনিটের ইংরেজি ভাষায় এ বক্তব্য শুনে বঙ্গবন্ধু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন ত্যাজোদীপ্ত এ তারুণ্যের দিকে। দৃষ্টি ফেরেনা তাঁর। পাশে বসা তোফায়েল আহমেদকে জিজ্ঞেস করলেন কে এই প্রতিভাবান? তোফায়েল আহমেদ পরিচয় করিয়ে দিলেন এমপি মোঃ মোতাহার উদ্দিন মাস্টারকে। সেদিনই কাছে টেনে নিয়ে বঙ্গবন্ধু মোতাহার উদ্দিন মাস্টারকে ভোলার আরেক রত্ন বলে উপাধী দেন। সেই মরহুম মোঃ মোতাহার উদ্দিন মাস্টারের আজ (১০ জানুয়ারী) ৪৬ তম শাহাদাৎ বার্ষিকী।

একজন স্কুল মাস্টার থেকে যে কিনা ধাপে ধাপে সংসদ সদস্য হয়ে জনগণের জন্য কথা বলতে পেরেছেন, সেই হচ্ছেন মোঃ মোতাহার উদ্দিন মাস্টার। যার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম কোন সংসদ সদস্য আততায়ীর হাতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলো। যে রহস্য আজো রয়েছে অজানা। কার হাতে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয়েছিল এই জনপ্রিয় ব্যক্তির? কারা তার প্রকৃত খুনি? এ প্রশ্ন যেমনি এখনো অজানা রয়ে গেছে, তেমনি প্রশ্ন আসে কেন এই মৃত্যুর রহস্য আজো উদ্ঘাটন হল না? কেন একটি মামলা বা জিডিও হলো না থানায়? কেন অভাব দুঃখ কষ্ট আর অবহেলা নিয়ে তার বড় ছেলেকে আত্মহত্যার পথ বেঁছে নিতে হয়েছিল? দেশের প্রথম একজন এমপি আততায়ীর গুলিতে নির্মমভাবে খুন হলো, অথচ সমবেদনা ছাড়া তখন আর কিছুই করা হয়নি। হয়নি এ হত্যাকান্ডের তদন্ত। কারা ছিল সেই খুনি? এ প্রশ্ন আজো মোতাহার উদ্দিন মাস্টারের শুভাকাঙ্খিদের।
মোতাহার উদ্দিন মাস্টারের বাড়ি লালমোহন গজারিয়া বাজারের উত্তর পাশে এক কিলোমিটার দুরত্বে। লালমোহন উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার। হাওলাদার বাড়ি হিসেবে পরিচিত এই বাড়ির মোতাহার উদ্দিন মাস্টারের পিতা মৌলভী সুলতান আহমেদ মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। মাতা আছিয়া খাতুন ছিলেন ধার্মিক গৃহিণী। ৬ বোন এক ভাইয়ের মধ্যে মোতাহার উদ্দিন মাস্টার ছিলেন সবার বড়। ১৯৩৫ সালের ২৪ আগস্ট এ বংশে জন্ম নিয়ে যে কিনা ক্ষণিকের জন্য আলোকিত করে গেলেন তার গ্রাম। সে আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে আছে আজো। তবে আলোর প্রদীপটি নেই। শিক্ষা জীবনের প্রথম স্টেজটি এলাকা থেকে সেরে তজুমদ্দিন চাঁদপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অস্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েন। পরে ভোলা সরকারী স্কুল থেকে ১৯৫০ সালে প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর বরিশাল বিএম কলেজ থেকে ১৯৫২ সালে প্রথম বিভাগে এইচএসসি ও ঢাকা থেকে বি.এ. এবং বি.এড. করেন। ইংরেজীতে অসাধারণ দক্ষতা থাকায় তার নিজ এলাকা গজারিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়ীত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি ১৯৬২ সালে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার নির্বাচিত হন এবং ওই বছরই ইউপি সদস্য থেকে মৌলিক গণতন্ত্রের প্রয়োগে ৯জন মেম্বারের প্রত্যক্ষ ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পর পর দুইবার চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তানী পার্লামেন্টের এমপি নির্বাচিত হন তিনি। কিন্তু পাকিস্তানী সরকার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমতা না দিয়ে তালবাহানা করায় দেশ স্বাধীনের ডাক পড়ে। সে ডাকে সারা দেন মোতাহার উদ্দিন মাস্টারও। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনে তিনি গজারিয়া থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের দিক পরামর্শ দিয়ে সংগঠিত করে তোলেন। এতে ক্ষিপ্ত হয় পাকবাহিনী। তারা মোতাহার মাস্টারের বাড়িতে হানা দিয়ে তাকে হত্যার জন্য খুঁজতে থাকেন। পরে না পেয়ে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে উল্লাস করে পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা। যুদ্ধকালীন সেই নৃশংসতার পোড়া চিহ্ন এখনো মুছে যায়নি মোতাহার উদ্দিন মাস্টারের বাড়ি থেকে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি ঘুইংগারহাট, বাংলাবাজার যুদ্ধ, চরফ্যাশন থানা দখল, ওসমানগঞ্জের যুদ্ধ ও লালমোহন থানা দখল ইত্যাকার সময়ে তিনি স্বশরীরে উপস্থিত ছিলেন এবং সম্মুখ যোদ্ধাদের পরামর্শ দিয়ে ধন্য করেছেন। আবার যখন পাকবাহিনী সাঁড়াশী অভিযান চালায় তখন তিনি গভীর রাতে বিভিন্ন এলাকায় ছদ্মবেশে গিয়ে আত্মগোপন করেন। এর মধ্যে তিনি ইলিশা কান্দি আব্দুল জব্বার মাতাব্বর বাড়ি, পাঙ্গাসিয়া মাতাব্বর বাড়ি, পাঙ্গাসিয়া মুসলিম উদ্দীন হাওলাদার বাড়ি, লতিফ চেয়ারম্যান বাড়ি, পশ্চিম চরউমেদ পেশকার বাড়িতে গিয়ে আত্মগোপন করেছিলেন। লালমোহন শান্তি কমিটির সভাপতি ফয়জুল্যাহ তথা মোহাদ্দেস হুজুরের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কখন পাকবাহিনী আসছে, কখন কি করতে হবে এসব বিষয়ে মোহাদ্দেস সাহেব তাকে সতর্ক করে দিতেন। এ সময় তার সঙ্গে থাকতেন শশী মাষ্টার, মাহে আলম কুট্টি, হাসান মাষ্টার, ছালেম হাওলাদারসহ ঘনিষ্ঠজনরা।
এরপর স্বাধীন হয় দেশ। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয় মানুষ। আসে ৭৩ সালের নির্বাচন। তৎকালিন ১১৪ নং বাকেরগঞ্জ-৩ নামক লালমোহন ও চরফ্যাশনের একাংশ নিয়ে গঠিত এ আসন থেকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবারো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মোতাহার উদ্দিন মাস্টার। তখন ভোলাকে ৪টি আসনে রূপান্তর করা হয়। জাতীয় সংসদের ১১২ নং বাকেরগঞ্জ-১ আসন থেকে তোফায়েল আহমেদ, ১১৩ নং বাকেরগঞ্জ-২ আসন থেকে নজরুল ইসলাম, ১১৪ নং বাকেরগঞ্জ-৩ আসন থেকে মোঃ মোতাহার উদ্দিন এবং ১১৫ নং বাকেরগঞ্জ-৪ আসন থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমপি নির্বাচিত হন। এদের মধ্যে শুধুমাত্র নজরুল ইসলামের প্রতিদ্বন্দ্বি ছিল মৌলভী আবু মোহাম্মদ নুরুল্যাহ নামে একজন। তিনি ন্যাপ (ভাসানী) দল থেকে ৩ হাজার ৫৯০ ভোট পেয়েছিলেন। আর নজরুল ইসলাম আওয়ামী লীগ থেকে ৫৮ হাজার ৬৬৬ ভোট পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন। বাকী ৩ আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হয়। মোঃ মোতাহার উদ্দিন মাস্টার এমপি হয়ে এলাকার মানুষের কাছের মানুষ থেকে তিনি হয়ে যান পুরো ভোলার জনপ্রিয় ব্যক্তিদের একজন। যে কোন সমস্যা নিয়ে তার কাছে মানুষ আসলে সহজ সমাধান পেত, পেত ন্যায় বিচার। কারো সাথে আপোষ ছিলনা তার নীতিতে। গজারিয়া বাজারে ইউনিয়ন পরিষদে তিনি অত্যান্ত দক্ষতার সাথে বিচার কার্য পরিচালনা করতেন। ইউনিয়ন পরিষদই ছিল তার কার্যালয়। এমপি হওয়ায় চেয়ারম্যান পদ শুন্য হলে সেই পদে উপ-নির্বাচনে সেকান্তর আলী মাতাব্বর নির্বাচিত হন।
মোতাহার উদ্দিন মাস্টার ছিলেন কাঁদা মাটির মানুষ। কাঁদা মাটির মধ্যে আবির্ভাব হয়েও তিনি মেধার জোড়ে খ্যাতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। তার মত বিরল প্রতিভার অধিকারী মানুষ খুব কমই ছিলো। এমপি হয়েও কোন সম্পদ করেননি তিনি। ব্যবসা বলতে তার ছিল গজারিয়া বাজারে সমিতির ‘জনতা রাইস মিল’। এছাড়া গজারিয়া বালক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পেশা থেকে যা পেতেন তা দিয়ে সংসার চালাতেন। শিক্ষার প্রতি তার ছিল বেশি আকর্ষন। এজন্য তিনি লালমোহন সদরে মোতাহার উদ্দিন মেমোরিয়াল বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। যেটি আজ ব্যক্তি নামের আইন বা অজুহাতে প্রতিষ্ঠাতার নাম কর্তন করে শুধু লালমোহন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় হয়েছে। নিজের বাড়ির দরজায়ও তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে বিদ্যালয়টি আজো বিদ্যমান থাকলেও বাদ পড়ে যায় মোতাহার উদ্দিন মাস্টারের নাম। ইংরেজীতে অসাধারণ দক্ষতা নিয়ে তিনি পার্লামেন্টের দীর্ঘ বক্তব্য ছাড়াও চট্টগ্রাম লালদিঘীর মাঠে বক্তব্য দিয়ে স্বর্ণপদক লাভ করেন।
সাংসারিক জীবনে তিনি স্ত্রী মাহমুদা বেগমকে নিয়ে সুখী ছিলেন। সন্তানদের মধ্যে ২ ছেলে ২ মেয়ে নিয়ে সুখী এই সংসারটির সুখ বেশি দিন আর রইল না। ১৯৭৪ সালের ১০ জানুয়ারী বৃহস্পতিবার প্রতিদিনের মত এমপি মোতাহার মাস্টার গজারিয়া বাজারের ইউনিয়ন পরিষদেই বসেছিলেন। মাত্র ১৩ মাসের ছোট ছেলে মনজুর রশিদ তাপসকে শেষ আদর করে স্ত্রী মাহমুদা বেগমের কোলে রেখে আসেন তিনি। দিনের সতেজ সূর্যটি ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পশ্চিম আকাশে ডুবে যায়। কে জানে সেদিনের সেই ডুবে যাওয়া সূর্যের সাথে সাথে একটি উজ্জ্বল দিনের আলোও চিরদিনের মত হারিয়ে যাবে। যে আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছিল ভোলার মাটি আকাশ বাতাস সব। ঘাতকেরা ইউনিয়ন পরিষদে বসা অবস্থায় একের পর এক গুলি ছুড়ে সেই আলোটি অংকুরেই নিভিয়ে দিয়ে গেল। পরিষদের টেবিল বিদ্ধ করে বুলেট ছুটে যায় এমপি মোতাহার উদ্দিনের বুকে। লুটিয়ে পড়ে সন্ধ্যা বেলার অস্তমিত সূর্য। এরপর পিনপতন নিস্তব্ধতা। ঘাতকেরা অস্ত্র উছিয়ে শ্লোগান দিতে দিতে বাজারের পশ্চিম দিকে চলে যায়। আর পরিষদে অসাড় দেহখানি পড়ে থাকে। এ হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রথম কোন সংসদ সদস্য ঘাতকের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিল। যে হত্যাকান্ডের রহস্য আজো থেকে যায় অজানা। কারা তার প্রকৃত খুনি? এ প্রশ্নের সঠিক জবাব মিলেনি আজো।
মোতাহার মাস্টারকে যেদিন হত্যা করা হয় সেদিন তার সাথে ছিলেন জব্বার মাতাব্বর। তিনি মোতাহার মাস্টারের সামনে পশ্চিম পাশে বসা ছিলেন। গুলি জব্বার মাতাব্বরের বাম কানের পাশ দিয়ে গিয়ে মোতাহার মাস্টারের গায়ে লাগে। গুলি লাগার সাথে সাথে টেবিলের উপর থাকা হ্যারিকেন নিভে যায়। যখন গুলি ছোঁড়া হয় তখন সেখানে জব্বার মাতাব্বর ছাড়াও তার ছেলে আঃ রব মেকানিক্স, মাওঃ আলি হোসেন ও পাঙ্গাসিয়ার এক লোক ছিলেন। এ ঘটনার কিছুক্ষণ পূর্বে এক চোরকে মেরে পানিতে নামিয়ে শাস্তি দেন মোতাহার মাস্টার। তারপর পানি থেকে তুলে আর অপরাধ না করার শর্তে গায়ের চাঁদর খুলে দিয়ে চোরকে ছেড়ে দেন তিনি। পরিষদে গুলিবিদ্ধ নিথর দেহ নিজ হাতে তুলেছিলেন ওই এলাকার প্রবীণ নেতা ছালেম হাওলাদার। কাকতলীয়ভাবে মোতাহার উদ্দিন মাস্টারের সঙ্গী জব্বার মাতাব্বরও গত বছরের এই ১০ জানুয়ারী ১০৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
মোতাহার উদ্দিন মাস্টারের এ হত্যাকান্ডের ঘটনা রক্ষীবাহিনী ঘটিয়েছে বলে ধারণা করে অনেকে। তখন রক্ষী বাহিনীর ক্যাম্প ছিল গজারিয়ায়। তবে মোতাহার মাস্টারের পরিবার থেকে এ হত্যাকান্ড এলাকার লোকের ধারা সর্বহারা সদস্যরা করেছে বলে দাবী করা হয়। এ প্রসঙ্গে যুক্তি আসে সর্বহারার এক সদস্যকে অপরাধ করার কারণে মোতাহার মাস্টার শাস্তি দেন। যে কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে সে চট্টগ্রাম আনোয়ারা থানা থেকে ভাড়া করে সর্বহারা সদস্য আনে। হত্যাকান্ডের ঠিক এক সপ্তাহ পূর্বে পেশাধার এ কিলার গ্রুফ গজারিয়ায় এসে অবস্থান নেয়। তারা মোতাহার মাস্টারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে ওই দিন সুযোগ বুঝে কাজ করে। এ সর্বহারা বাহিনীর প্রধান ছিলেন সিরাজ সিকদার নামের এক ব্যক্তি। সিরাজ সিকদার তার সদস্যকে শাস্তি দেওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে মোতাহার মাস্টারকে হত্যার নির্দেশ দেয়। তবে হত্যাকান্ড সংগঠিত হওয়ার একদিন পূর্বে সিরাজ সিকদার মোতাহার মাস্টার সম্বন্ধে বিস্তারিত জেনে তার ভুল বুঝতে পারেন। তিনি মোতাহার মাস্টারকে হত্যা থেকে বিরত রাখার জন্য এলাকায় তার বাহিনীর কাছে সংবাদ পাঠান। সে সংবাদ হাতে এসে পৌছার পূর্বেই কিলার বাহিনী হত্যাকান্ড সংঘটিত করে ‘সিরাজ সিকদার জিন্দাবাদ’ বলে শ্লোগান দিতে দিতে চলে যায়। সর্বহারা এ বাহিনীরা তাদের অপারেশনের দু’দিন পূর্বে মোতাহার মাস্টারের কাছে চিঠি পাঠান। চিঠিতে অপারেশনের কথা উল্লেখ করে যা খাওয়ার খেয়ে প্রস্তুত থাকার জন্য বলা হয়। যা যা ইচ্ছা সব পূরণ করে নিতে বলা হয়। মোতাহার মাস্টার চিঠিটি পেয়ে হেসেছিলেন। তার কোন শত্রু নেই এ বিশ্বাস ছিল তার মনে প্রাণে। যে কারণে সরকারীভাবে নিরাপত্তার জন্য নিরাপত্তাকর্মী দিতে চাইলেও তিনি তাতে রাজী হননি। কিন্তু তার বিশ্বাস আর টেকেনি। শত্রু যে কখন জন্ম নিয়ে রয়েছিল তা তিনি বুঝতে পারেননি। হয়তো তার নীতি আদর্শ আর মেধাই শত্রু জন্ম দিয়েছিল। মৃত্যুর পরদিন শুক্রবার দেশের একজন সম্ভাবনাময় ব্যক্তির নামাজে জানাযায় হাজারো সমর্থক, শুভাকাঙ্খির ভীড় জমে গজারিয়ায়। ঢাকা থেকে জানাযায় অংশ নিতে আসেন বঙ্গবন্ধুর পুত্র শেখ কামাল, ভগ্নিপতি হোসেন শহীদ সেরেনিয়াবাত ও কয়েকজন মন্ত্রী। নিজ বাড়ির দরজায় সমাহিত করে সবাই চলে যায় যার যার কর্মস্থলে। আর আড়ালে থেকে যায় এ হত্যার মূল রহস্য। খুঁজে বের করা হয়নি মোতাহার উদ্দিন মাস্টারের প্রকৃত খুনি কে? এরপর কেটে যায় অনেক সময়, অনেক বছর। মরহুম মোতাহার উদ্দিন মাস্টারের পরিবারে থাকে স্ত্রী মাহমুদা বেগমসহ দুই ছেলে, দুই মেয়ে। মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে নুরজাহান রেখা মারা যায় ২৮ মার্চ ১৯৭৯ সালে। ছোট মেয়ে শিরিন আক্তার সংসারী হয়। স্ত্রী মাহমুদা বেগম মারা যায় ১৯৯৮ সালে। ছেলেদের মধ্যে বড় হিসেবে সংসারের দায়ীত্ব পরে মামুনুর রশিদের উপর। মামুন বরিশাল বিএম কলেজ থেকে মাস্টার্স শেষ করেন। ছোট ছেলে মনজুর রশিদ তাপস বেশি দূর পড়তে পারেননি। বাবার আদর্শ আর সততা নিয়ে বড় হয়ে সন্তানরাও বাবার মতই হয়েছে। আর সে আদর্শের কারণে এ সংসারে নেমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয়। দুঃখ কস্ট আর অসহায়ত্ব ফুটে উঠে পরিবারে। কেউ খোঁজও নেয়নি পরিবারের সদস্যরা কেমন আছে। কিভাবে দিন কাটায় তারা। অনেক সরকার আসে, অনেক সরকার যায়। কিন্তু মোতাহার মাস্টারের বাড়িতে পা পড়ে না কারো। আর পড়বেই বা কি করে, যারা মোতাহার মাস্টারের পরিবারের খোঁজ নিতেন তাদেরও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কেড়ে নেওয়া হয়। ১৯৯৩ সালে বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় একবারের জন্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চরফ্যাশনে এসে এ বাড়িতে যান। তিনি খোঁজ খবর নিয়ে অনেক আশ্বাস দেন। সে আশ্বাসের প্রতিফলন পাওয়ার সুযোগ পায়নি বড় ছেলে মামুন। তিনি ধারে ধারে ঘুরেও কারো কাছে সহায়তা পাননি। বাধ্য হয়ে অনেক দুঃখ কস্ট নিয়ে তাকে আত্মহত্যার পথ বেঁছে নিতে হয়। ২২ ফেব্রুয়ারী ১৯৯৯ সাল। নিভে যায় এ বংশের আরেকটি জ্বলন্ত প্রদীপ। আত্মহত্যার পূর্বে তার লেখা ডায়েরীতে সে কস্টের কথা স্পষ্ট লিখে রেখে যায় মামুন। যে কথা একজন নীতিবান এমপির পরিবারের প্রতি আমাদের দায়ীত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ সমাজের প্রতি চরম ক্ষোভ নিয়ে পিতা-মাতার পাশেই শুয়ে পড়েন অভিমানী এ তরুন। পাশাপাশি ৩টি কবর। যেখান থেকে আজো ডাক দেয়া হয় আদর্শের, সততার, ন্যায় বিচারের, এক আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার।
মোতাহার উদ্দিন মাস্টারের মৃত্যুর ৩৪ বছর পর তারই এলাকা থেকে তারই পরিবারের একজন নিকটাত্বীয় আবার জাতীয় সংসদে যাওয়ার সুযোগ পায়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে গজারিয়ারই সন্তান মেজর (অবঃ) জসিম উদ্দিন মোতাহার উদ্দিন মাস্টারের আদর্শ নিয়ে এমপি নির্বাচিত হন। এ জয়ের জন্য তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ ৩৪ বছর। বর্তমানে মেজর (অবঃ) জসিম উদ্দিন এমপি না থাকলেও জয় আওয়ামী লীগের ঘরেই রয়েছে। আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন মোতাহার উদ্দিন মাস্টারের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর নামে গজারিয়ায় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয়েছে।

(সতর্কতা ‍ঃ মোতাহার মাস্টারের জীবন কাহিনী সংগ্রহ করতে আমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। তাই লেখাটি কপি করে কেউ নিজের নামে কোথাও প্রকাশ না করার জন্য বিনিতভাবে অনুরোধ রইল।)

Facebook Comments


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি