LalmohanNews24.Com | logo

৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

যেখানে শুধু অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর হাতছানি!

বিজ্ঞাপন

যেখানে শুধু অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর হাতছানি!

বৃহৎ নদী আর সাগর বেষ্টিত দ্বীপ জনপদ ভোলার মেঘনা,তেতুলিয়া ও সাগর মোহনায় জেগে উঠা চরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। ভাঙা-গড়ার মধ্যে চলতে থাকা এসব মানুষের সমুদ্রে মাছ ধরার টাকা দিয়েই কষ্টেসিষ্টে চলে ওদের সংসার। না, চলে না, চালিয়ে নেয় ওরা। সন্তানদের মাছ খাওয়ার আবদার থাকলেও ভাতের খিদে মেটাতে মাছ বিক্রি করে দেয় ওরা। উপকূলের এই অবহেলিত মানুষ অধিকাংশই নদীভাঙনের শিকার ও ঘূর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি হারিয়ে তাদের বসবাস। এদের ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাওয়ার বদলে বাবার হাত ধরে নদীতে মাছ ধরতে যায়।

সমুদ্র পাড়ের এসব ভাগ্যাহত মানুষেরা গণতন্ত্র বোঝে না। কিন্তু ভোট দেয়। না দিয়ে উপায় নেই। এলাকা যতই চরাঞ্চলে হোক নির্বাচনের আগে ওখানে জনপ্রতিনিধিরা যায়। সাত-পাঁচ আশা দেখিয়ে ভোট নেয়। সহজ-সরল মানুষেরা সুন্দর মোড়কে আবৃত এসব জনপ্রতিনিধিদের বিশ্বাস করে স্বপ্ন দেখে। নির্বাচনেরর পরেই সব মোহ ভেঙে যায়। স্বপ্ন ভাঙার কষ্ট নিয়ে তারা আবার যুদ্ধে নামে। চলে তাদের প্রাত্যহিক জীবন। ভাঙা-গড়ার মধ্যে চলতে থাকা এসব মানুষেরা অবলম্বন করবে কাকে? এ প্রশ্নের উত্তর যারা জানতে চান তারা শহর ছেড়ে চলুন ভোলার মেঘনা,তেতুলিয়া ও সাগর মোহনায় জেগে উঠা চরাঞ্চলে। জীবন যেখানে অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর আরেক নাম। আমাদের বঙ্গোপসাগরটি অত্যান্ত ক্রূর স্বভাবের।

সব সময়ই উত্তাল থাকে এটি। বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ ইলিশের যেমন পছন্দ, তেমনি তাদের প্রজননের জন্যেও ওই সাগরের প্রভাব খুব কার্যকর। ফলে বঙ্গোপসাগর ইলিশের বাসভূমি। সে হিসাবে তার কদরও কম নয় বৈশাখ মাসের শেষ থেকে আশ্বিন মাসের প্রথম বছরের ঋণশোধ, মেয়ে বিয়ে, সব কাজের জন্যে আদের মূল প্রস্তুতি শুরু হয় এ সময়েই। ভোলার মনপুরা উপজেলার জংলার খাল এলাকা, মেঘনা আর বঙ্গোপসাগর মিলেছে এখানে। বেড়ি বাঁধের ওপর একটু কাত হয়ে তাকালে দু’রঙা জলের সীমারেখা দেখা সম্ভব। আর কাছে গেলে উত্তাল তুফানের ভেতরেও সাগর ও নদীর মিলন মোহনা বোঝা যায়। মেঘনার জল ঘোলাটে। একটা ক্রোধ জলের শরীরে থাকলেও হানাদারি স্বভাবের ছাপ নেই।

কিন্তু বঙ্গোপসাগরের স্বচ্ছ জলরাশির ভেতরে কি নির্মম নিষ্ঠুরতা তা না দেখলে বোঝা বড়ো দায়। একদিকে টওয়ারের সদৃশ তুফানের ক্ষিপ্রতা, অন্যদিকে কূল-কিনারশূন্য গতিহীন এক জীবনের দ্রোহ- যার সবটাই বেঁচে থাকার জন্যে। এ বড়ো কঠিন বাস্তবতা। এক-একটু পর পর হাঙরের নিষ্ঠুরতা নিয়ে তেড়ে আসে কাঁচের টাওয়ারের মতো এক-একটা ঢেউ। আঁছড়ে পড়ে ইলিশধরা ট্রলারের পাশে। জলে ভরে যায় পাটাতন। আর ট্রলারটা ছেঁড়া কাগজের মতো দুলতে থাকে। জীবন এখানে যেকোন মুহূর্তে মৃত্যুতে পরিণত হতে পারে, অথচ এই ভয়াবহ জীবনদোলার ভেতরেও ইউনুছ অার সালাম মাছ ধরতে সমুদ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ট্রলার ছাড়ার আগে তারা তাদের স্ত্রীদের বিভিন্ন উপদেশ দিয়ে ট্রলারে ওঠে।

সালামের বউয়ের বয়স কম, এর মধ্যে বিয়ে হয়ে গেছে। বাল্য বিয়ে এখানে ঠেকানোর কেউ নেই। ২০ বছর হতে না হতেই ৩ সন্তানের মা। বিদায়ের ওই মুহূর্তে কোলে একজন সাথে একজন বা দু’জন নিয়ে কাঁদতে থাকে ইউনুছের বউ। কারণ সে দেখে এসেছে তা মা, মাসি, পিসিদের। কত অল্প বয়সে তারা বিধবা হয়ে গেছে। বউ পরিজন কাঁদতে দেখে ইউনুছ অার সালাম খুব মন খারাপ করে- বউদের ঘরে যেতে বলে। কারো সঙ্গে ঝগড়া করতে নিষেধ করে। পাড়ার লোকজন কোলাকুলি করে। হয়তো আর কোনদিন দেখা না হতে পারে এমন ঘটনাই বেশি থাকে। ইউনুছ আর সালাম বিড়ি বিনিময় করে। বউয়ের কথা নিযে রসিকতা করে। এই রসিকতার কোনো ব্যাকরণ নেই। তবু জীবনযুদ্ধেরর এক স্বরলিপি বলে মনে হয় একে। নৌকা চলতে থাকে অথচ তারাও জানে একটু বেসামাল হলেই ট্রলার উল্টে নিখোঁজ হবে। তাদের প্লাস্টিকের টায়ার আর বাঁশের ভেলা কোনো নিরাপত্তা দিতে পারবে না।

তবুও সাগরের ভয়ের চেয়ে পেটের ক্ষুধার তেজ এতো বেশি যে, ক্ষুধা ভয়কে জয় করতে বাধ্য হয়। রসিকতা জীবনসংগ্রামের একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। ইউনুছ, সালাম , সবার হাতেই কমপক্ষে গণ্ডাখানেক তাবিজ কবচ ঝুলছে। কেন ঝুলছে? প্রশ্ন করলে হাসে। এগুলো থাকলে বালা-মসিবত থাকে না। কিন্তু বালা-মসিবত এতে কি কেটেছে? এ প্রশ্নের উত্তর তারা জানে না। কতক্ষণ চুপ করে থেকে বলে- মুরব্বিরা দিছে তাই, ক্ষ্যাতি তো কারো হবে না, কি কন? ইউনুছ, সালাম মেঘের ভাষা বোঝে, ঢেউয়ের ভাষা বোঝে, সময়ের ভাষা বোঝে। যাদের চার পুরুষ জলের ভেতরে জীবন কাঠিয়েছে তারা জানবে না? তারা ‘ট্যান্ডেস্টার’ রেডিওকে (জেলেরা এটাই বলে) বিশ্বাস করে না। সে সবের বিপদ সংকেতে বিপদ সংকেতে বিপদ থাকে না। সব উল্টাপাল্টা সংবাদ আসে। যেদিন তারা যা বলবে তার উল্টোটা ঘটবেই, সব জেলেদেরই এই বিশ্বাস। কিন্তু সবকিছুর পরেও জেলেদের সুখ নেই।

ভোলার মনপুরা উপজেলার জংলার খাল এলাকায় দেড় থেকে দুই হাজার জেলে ইলিশ ধরে, কিন্তু সবাই হতাশ। ১৫০টা ইলিশও যদি রাত-দিনে ধরা পড়ে তাহলেও লাভ নেই। ফলে জেলেদের ভরা মৌসুমে আগাম কষ্টের সাইরেন বেজে উঠেছে। কি করবে তারা? এ কাজই তাদের সম্বল। ঘটনার শেষ এখানেই নয়। জলদস্যুও সমুদ্রের বড়ো একটা সঙ্কট। তারা রাতে ট্রলার চেপে বন্দুক-রাইফেল নিয়ে বের হয়। জোর করে ছিনিয়ে নেয় জেলেদের জাল, টাকা, ট্রলারের মটর ইত্যাদি। আবার কখনও জেলেদের জলে ফেলে দিয়ে ট্রলার নিয়ে উধাও হয়ে যায় নিমেষে। এছাড়াও সমুদ্র উত্তাল থাকলে নৌ দুর্ঘটনা তো আছেই। সবই আছে। আছে এনজিওর কিস্তির টাকার খবরদারি, আছে ক্ষুধা- ভাতের টান। শুধু ইলিশ নেই। তবু ইলিশের জন্য তাকে নামতে হয় সাগরে, সাগর দোলায়, ভাসায়, ভাসে সন্তান-প্রিয়তম মানুষের মুখ। কিন্তু এসব জানা, সব দেখা সত্ত্বেও নামতে হয় ক্ষুধার সাগরে। জেলেরা ফেরে না কেন? সমুদ্রে ডাকাত হানা দেয়। জাল কেড়ে নেয়, মাছ ট্রলার কেড়ে নেয়। জেলেদের জিম্মি করে টাকা নেয়। টাকা না পেলে জেলেদের সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। অবধারিত মৃত্যু থেকে কেউ ফেরে কেউ ফেরে না।

সমুদ্রে মাছ শিকার করতে করতে জেলেরা গভীর সমুদ্রে চলে যায়। তারপর ঝড় দেখা দিলে সংকেত শুনলেও কোন ট্রলার ফেরে, কোন ট্রলার ফিরতে পারে না। যারা ফিরতে পারে না তাদের খবর কোন কোন ট্রলার দিতে পারলেও স্বজনেরা বিশ্বাস করতে চায় না। এরপরও মাসের পর মাস স্ত্রী, স্বজনরা তাকিয়ে থাকে রঙীন পতাকাওয়ালা ট্রলারের দিকে। যদি মাতুলের দেখা মেলে। তারপরও সমুদ্রচর জেলেদের একমাত্র অবলম্বন বঙ্গোপসাগর। যেখানে ঢেউয়ের তালে জীবন দোলে। জেলে ও আড়ৎদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপকূলের দ্বীপ মনপুরা উপজেলার চারটি ইউনিয়নের জনতা বাজার, কালকীনি, দক্ষিণ সাকুচিয়া, হাজিরহাট, রামনেওয়াজ, চর ফৈয়েজউদ্দিন, কোড়ালিয়া, কলাতলীর চর, ঢালচরসহ ১৫টি মৎস্য ঘাটে অন্তত শতাধিক মৎস্য আড়ৎ রয়েছে। এসব আড়তে মাছ সরবরাহ করে অন্তত ১০ হাজার জেলে জীবিকা নির্বাহ করেন।

মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এসব আড়ৎ। ইলিশের ভরা মৌসুমে নদীতে জাল, নৌকা, ট্রলার ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে নদীতে নেমে পড়েন জেলেরা। চলতি মৌসুমেও জেলেদের জালে ধরা পড়তে শুরু করেছে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ। কিন্তু নদীতে ইলিশ ধরাকে কেন্দ্র করে হঠাৎ করেই বেড়েছে দস্যুদের উপদ্রব। জেলেরা আরও জানান, নিরাপদে মাছ শিকারের জন্য টাকা দিয়ে জলদস্যুদের কাছ থেকে টোকেন কার্ড সংগ্রহ করতে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। কার্ড সংগ্রহ না করলেই জেলেদের ওপর চাড়াও হয় ডাকাতরা। হাতিয়া ও নোয়াখালীর দুর্ধর্ষ কয়েকটি বাহিনী জলদস্যুতার সাথে জড়িত। এদের কাছে উপজেলার ১০ হাজার জেলে জিম্মি হয়ে পড়েছেন।

এ ব্যাপারে ভোলা কোস্টগার্ড দক্ষিণ জোনের অপারেশন অফিসার লে. কমান্ডার সৈয়দ সাজ্জাদুর রহমান জানান, জলদস্যুতা দমনে প্রতিদিন কোস্টগার্ডের চারটি পেট্রোল টিম টহলে রয়েছে। আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। যখনি ডাকাতির খবর পেয়ে থাকি তখনি কোস্টগার্ড অভিযানে নামে। এছাড়াও দস্যুদের নির্মূলে খুব শিগগিরই একটি যৌথ অভিযান পরিচালনার করা হবে।

হাসান পিন্টু

Facebook Comments Box


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি