LalmohanNews24.Com | logo

৪ঠা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৭ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মেজর হাফিজের সৈনিক জীবন বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া

মেজর হাফিজের সৈনিক জীবন বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া

আহসান কামরুল।।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর খুনিচক্র দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার ফলে এ বিষয় তো পাঠ্যবইয়ে ছিলই না, বরং সেখানে খুনিদের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টাকে ‘মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক’ পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। খন্দকার মোশতাক থেকে শুরু করে জেনারেল ওসমানীর ভূমিকা, সেই হত্যা মামলায় সাক্ষীদের সাক্ষ্যে ভয়াবহ ঘটনার বিশদ বিবরণ প্রথম তুলে ধরেছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা কাভার করা সাংবাদিক জাহিদ নেওয়াজ খান। ‌‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার প্রামাণ্য দলিল’ বইয়ে তিনি সুনিপুণভাবে ব্যর্থতার চিত্রসহ সেই কলঙ্কজনক অধ্যায়ের পুরো বিষয়টি তুলে ধরেছেন। সেখানে ব্যর্থ সেনাপ্রধান শফিউল্লাহর সাক্ষ্যের এক লাইনে ছিল মেজর হাফিজের নাম। ‘শফিউল্লাহ জানান, সেখানে (৪৬ ব্রিগেড) মেজর রশিদ ও মেজর হাফিজ তাকে রেডিও সেন্টারে যাবার জন্য চাপ দিতে থাকে।’

সেই মেজর হাফিজ এবার, অর্থাৎ ২০২০ সালে যখন ‘সৈনিক জীবন: গৌরবের একাত্তর রক্তাক্ত পঁচাত্তর’ বই লিখলেন তা পড়ার লোভ স্বাভাবিকভাবেই সামলানো যায়নি। করোনাকালের আগে বইটি হাতে পেলেও পড়া শুরু হয় করোনাক্রান্তিতে গৃহবন্দি জীবন শুরু হওয়ার কয়েকদিন পর।

বিএনপি-জামায়াত জোটের আমলে সংখ্যালঘু নির্যাতনের মহানায়ক হিসেবে যার বিরুদ্ধে ছিল বিস্তর অভিযোগ, তিনি সবটুকু সত্য লিখবেন এমন আশা করে পড়া শুরু করিনি। তবে তিনি যেহেতু বীর বিক্রম সেই ভরসায় পড়া শুরু করে চার বছর আগে Zahid Newaz Khan ভাইয়ের লেখা ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার প্রামাণ্য দলিল’ বইটি কয়েকবার পড়া থাকায় বুঝা গেল মেজর হাফিজ অন্তত ৯৫ ভাগেরও বেশি সত্য লিখেছেন তার বইয়ে। বিএনপির সাবেক এই মন্ত্রী রাজনীতির মাঠে জেনারেল জিয়াকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ মানলেও বইয়ে তিনি বলেছেন বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সেই ঘোষণা পাঠের কথা। এছাড়াও তার বইয়ে বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে স্বাধীনতা পরবর্তী দেশ গঠন, রাজনীতির গতি-প্রকৃতি এবং পঁচাত্তরের সেই ভয়াল অধ্যায়ের কথা।

বঙ্গবন্ধুর খুনিরা কীভাবে সংগঠিত হয়েছিল, তাদের ষড়যন্ত্রের জাল, হত্যাকাণ্ড, বঙ্গভবনে বসে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া কয়েকজন জুনিয়র অফিসার কীভাবে চোতা দিয়ে আর্মি ও দেশ পরিচালনা করছিলেন, এরপর নভেম্বরে মুক্তিযুদ্ধপন্থী অফিসারদের পাল্টা অভিযান, জেলহত্যা, খুনিদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়া এবং পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধপন্থী সশস্ত্রবাহিনীর অফিসারদের খুন হওয়ার ঘটনাসহ নানা বিষয় ৩ নভেম্বরের অভিযানে অংশ নেওয়া মেজর হাফিজের বর্ণনায় উঠে এসেছে। সেই অভিযানে অংশ নেওয়ায় জেনারেল জিয়ার একসময়কার পিএস হয়েও কারাবন্দী এবং পরে অবসর নেওয়ার ঘটনাও বর্ণনা করেছেন তিনি। তার লেখা বই পড়ে অনেক বিষয় জানা গেল। মনে হলো: এ বইটির শেষার্ধ সবারই একবার পড়া উচিৎ।

তবে আরও অবাক করার বিষয় হলো: মেজর হাফিজের লেখা বইটি পড়ার পর সংগত কারণে আবারও ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার প্রামাণ্য দলিল’ বইটি পড়তে গিয়ে আবিষ্কার হলো যে, এই বইটির আবেদন এখনও বিন্দুমাত্র শেষ হয়ে যায়নি। প্রকাশের চার বছর পরও যে বই গভীর রাত পর্যন্ত একবারেই পড়ে শেষ করা যায়, তাতে নিশ্চয়ই কোনো জাদু আছে। এজন্য লেখকের এই মন্তব্যটি যথাযথ: ‘মূল বিচারটি চলার সময় যাদের জন্ম হয়েছিল, তাদের এখন বিষয়টি বোঝার মতো বয়স হয়েছে। তাই ছয় বছর আগে আপিল বিভাগে পূর্ণাঙ্গ রায় হয়ে যাওয়ার পরও অপেক্ষা করেছি যাতে ওই সময়ের শিশুরা এমন বয়সে আসে যখন তারা একটি বিশ্লেষণ পড়ে নিজেরাও বিশ্লেষণ করতে পারে।’ লেখক জাহিদ নেওয়াজ খানের এ অপেক্ষা সার্থক বলেই আমি মনে করি।

বাই দ্য ওয়ে, মেজর হাফিজ সত্তরের বন্যায় স্বজন হারানোর পরও সেনা কর্মকর্তা হিসেবে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলে তৎকালীন শাসকরা এদেশের মানুষের পাশে না দাঁড়ানোয় যেসব স্বাভাবিক বিরুপ মন্তব্য করেছেন, করোনাভাইরাস এর এই দুর্যোগে তিনিও কি সেই শাসকদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন? নিজের এলাকা থেকে ছয়বারের এমপি নির্বাচিত হওয়ায় তিনি যে গর্ববোধ করেন, করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে তিনি কি সেই আসনের মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছেন? এখনও পর্যন্ত এলাকার মানুষ তাকে তাদের পাশে পায়নি। এক্ষেত্রে তার নিজ বইয়ে লেখা মন্তব্যকে স্ববিরোধী বলেই মনে হয়েছে। তারপরও মুক্তিযুদ্ধ এবং পঁচাত্তরের ঘটনাবলীর জন্য তার বইটি পড়া যেতে পারে।

Facebook Comments Box


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি