LalmohanNews24.Com | logo

৪ঠা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৭ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মহাদুর্ভিক্ষ- ১৯৭৪

মহাদুর্ভিক্ষ- ১৯৭৪

ভিক্ষার অভাবই দুর্ভিক্ষ। যখন মানুষ ভিক্ষা চেয়ে ভিক্ষা পায় পান, খাবার চেয়ে খাবার পায় না, খাদ্যের অভাবে চারদিকে চরম সংকট বিরাজ করে তখনকার সে অবস্থাটাই দুর্ভিক্ষাবস্থা। ৯০’র দশকে আমরা যখন মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক লেভেলে পড়াশোনা করি, তখন আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়া ও সোমালিয়ার দুর্ভিক্ষের কথা শুনেছি। কাগজপত্রে কংকালসার মানুষের ছবি দেখেছি। দেখতে দেখতে আমাদের মনে হয়েছিল ইথিওপিয়া, সোমালিয়া মানেই দুর্ভিক্ষের দেশ। যে দেশের খাদ্যের অভাব কখনো দূর হয় না। অথচ একসময় ইথিওপিয়া, সোমালিয়া ছিল এক সমৃদ্ধ জনপদ । সোমালিয়ানদের শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল। রাজ্য বৃদ্ধির জন্য সোমালিয়ার সম্রাটরা দেশে দেশে অভিযান চালাতো। এমনকি পশ্চিম আটলান্টিকের ওপারে কী আছে সেটা জানার জন্যও নৌবহন পাঠায়। বিশ্বইতিহাসে সর্বকালের সেরা ধনীদের যে তালিকা তার মধ্যে সোমালিয়ার আজুরান সম্রাট মার্সা মুসার নামও আছে। ৭ম শতক থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত উন্নত দেশ ছিল সোমালিয়া। এরপর সোমালিয়া যখন পর্তুগিজদের কলোনীতে পরিণত হয় তখন থেকে তাদের দুর্ভাগ্যের যাত্রা শুরু।
পৃথিবীর নানান দেশে নানা সময়ে দুর্ভিক্ষ ও মহামারী দেখা দেয়। এখানে আমি কেবল আমাদের দেশের দুর্ভিক্ষের কথাই বলব। বিশেষ করে স্বাধীনতা উত্তর ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ যে দুর্ভিক্ষের মহাকরালগ্রাসে পতিত হয়, সেটা কেন এবং কিভাবে, তার একটা যৌক্তিক আলোচনা এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করব।

বাঙালির দুর্ভাগ্য যেন তাদের পিছু ছাড়ে না। তাদের ভাগ্যাকাশ থেকে কালো মেঘের ঘনঘটাও একেবারে দূর হয় না। তারা যত এগুতে চায় পেছন থেকে অলক্ষণের দূর্বিপাক তাদের কলার টেনে ধরে এবং মনের অজান্তে রাহুগ্রাসে নিপতিত হয়। ১৯৭১ সালে জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে বাংলার দামাল ছেলেরা যুদ্ধে গেল এবং জীবনপণ লড়াই করে দেশ স্বাধীন করল। আশা করেছিল, মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার পাবে। শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞানে বিজ্ঞানে, অর্থবিত্তে, মানে-সম্মানে তারা অনেক জাতির তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে থাকবে। কিন্তু তাদের সে আশায় গুড়েবালি। দেশ স্বাধীন হওয়ার আড়াই-তিন বছর অতিক্রম করতে না করতেই তারা পড়ে গেল এক মহাদূর্ভিক্ষের কবলে। মাথা উঁচু করে অধিকার নিয়ে বাঁচবে কি, তাদের জীবনশংকা দেখা দিল ভয়াবহভাবে । প্রাণে বাঁচাই তাদের কাছে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ালো। সেই যে তাদের উদ্যম উদ্দিপনা ব্যাহত হল, আবেদ-উচ্ছ্বাস বাধাপ্রাপ্ত হল- সেটা কাটিয়ে উঠে সামনে এগুনো তাদের জন্য কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে গেল।

সত্য কথা কি জানেন, নিজেদের হেয় করার জন্য অবশ্য কথাটা বলছি না। বাঙালি জাতি হিসেবে একটা উন্নত ও বিপ্লবী জাতি, তারা প্রতিবাদ প্রতিরোধে যতটা দক্ষ, দেশশাসনে মোটেই ততটা দক্ষ নয়। অতীতেও তাদের সেরকম দক্ষতা দেখানোর সুযোগ আসেনি । এজন্য শাসকজাতি হিসেবে আমাদের খ্যাতি অর্জন করতে আরও অনেক ভাঙ্গাগড়ার প্রয়োজন হবে বৈ কি। যার প্রমাণ শেখ মুজিবের সাড়ে তিন বছরের শাসনব্যবস্থা। তিনি নেতা হিসেবে অনেক বড়, কিন্তু শাসক হিসেবে তাঁর কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ। শেখ মুজিবের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন। বলা চলে জীবনের শুরুতেই তার রাজনীতির হাতেখড়ি। স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তার তুলনা তিনি নিজেই। তিনি মুহূর্তে জাতিকে স্বাধিকারমন্ত্রে উজ্জীবিত করে তুলতে পারতেন। মানুষ ভাবতো তিনি তাদের বন্ধু এবং নিকটজন। তিনি দেশ পরিচালনার সুযোগ পেলে দেশে কারো আর দুঃখ থাকবে না। নানান অধিকার আদায়ের জন্য মাঠে ময়দানে আর চিৎকার করে বেড়াতে হবে না। উন্নত দেশের মত আন্দোলন-সংগ্রাম, হরতাল-ধর্মঘটের ন্যায় অপ্রয়োজনীয় কর্মগুলি করতে হবে না। এখানে যেমন গণতান্ত্রিক অধিকার থাকবে, তেমনি উঁচু-নিচু সকলের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। ফলে তিনি যখন ডাক দিলেন, তখন ছাত্র-শিক্ষক, কামার-কুমার, জেলে-তাঁতি, কৃষক-শ্রমিক, নারী-পুরুষ সকলে তার ডাকে সাড়া দিল। কিন্তু স্বাধিকার আদায়ের পর তারা কী দেখলো ? সে অনেক কথা। আমি সেদিকে যাব না। আমি কেবল ৭৪ এর দুর্ভিক্ষ নিয়ে কয়টা কথা বলব। বলার কারণ, যেসব কারণে ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের মত ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং ১৫ লাখ লোক অনাহারে-মহামারিতে মৃত্যুবরণ করে, আমার ধারণা করোনা ভাইরাসের মত একটা ভয়ংকর দুর্যোগের জন্য তেমনই একটা কুৎসিত সময় সমাগত। এখন থেকে সে দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ না করলে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে এবং ইথিওপিয়া বা সোমালিয়ার মত দুর্ভিক্ষের কবলে পড়লে জাতি হিসেবে বিশ্বব্যাপী আমাদের একটা দুর্নাম রটে যাবে।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর যুদ্ধবিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে, আগাম ভিত্তিতে পর্যাপ্ত খাবার মজুদ করতে না পারলে দেশ নিদারুণ খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হবে এবং অবশ্যম্ভাবী দুর্ভিক্ষের কবলে নিপতিত হবে। বিশেষ করে ১৯৭৩ সালে বন্যার কারণে প্রচুর ফসলহানি হলে বিশেষজ্ঞরা জোরালোভাবে সরকারকে সতর্কবার্তা দিচ্ছিলেন। দেশের তখনকার সচেতন রাজনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞরা আগে থেকে এ হুমকির ব্যাপারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন।
তৎকালীন ছাত্রনেতা ডাকসু ভিপি শেখ মুজিবের এককালের সবচেয়ে বিশ্বস্ত অনুগামী ১৭ সেপ্টেম্বর পল্টনে লক্ষাধিক লোকের এক সমাবেশে বলেছিলেনÑ ‘দেশের স্বাধীনতার পর একটা লোককেও না খেয়ে মরতে দেয়া হবে না বলে শেখ মুজিব আশা দিয়েছিলেন। আজ খেতে না পেরে প্রচুর লোক মৃত্যুবরণ করছে? রোষান্বিত জনতার আবেগে অনুপ্রাণিত হয়ে রব তাদের অভিযোগের প্রতিধ্বনি তুলছিলেন। ঐ অভিযোগমালার প্রধান প্রধান বিষয়বস্তু ছিল খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম জনগণের ধরা ছোঁয়ার বাইরে, চতুর্দিকে কেবল ঘাটতি, বাজার সুবিধাভোগীদের হাতে, স্বজনপ্রীতি, সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতি, বেকারত্বের পাহাড়, গুম-হত্যা, ধর-পাকড়, পুলিশের অত্যাচার, দায়িত্বহীন সরকার, সংবাদপত্রের মুখ বন্ধ ইত্যাদি। রব ঘোষণা করলেন, আওয়ামী লীগাররা পাকিস্তানীদের চাইতে অনেক বেশী জঘন্য আর দুর্নীতিবাজ। শেখ মুজিবের উদ্দেশ্যে রব বললেন, আপনি আমাদের ধর-পাকড় করছেন আর উৎপীড়ন এর সকল যন্ত্রপাতি আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছেন। আপনি আপনার বক্তৃতায় অস্ত্রের কথা বলছেন। আপনি কি কোনদিন কোন বন্দুক চালিয়ে দেখেছেন ? আমরা জানি সত্যিকার অস্ত্র কিভাবে চালাতে হয়। তারপর দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীপরিষদ আর সরকারী কর্মচারীদের বাতিল করে জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব করেন তিনি।’

এ বিষয়ে বিবিসির বিখ্যাত সাংবাদিক মাসকার্নহাস লেখেনÑ ‘বাস্তবতার চাকা যেন উল্টো দিকে ঘুরে গেলো। যে মুজিব আঠারো মাস আগে পাকিস্তান সরকারের শোষণ আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে অভিযোগের বাণ ছোড়েন, সে অভিযোগের বাণ আজ মুজিবের বিরুদ্ধে বুমেরাং এর মত ফিরে এলো। এবার জনতার হয়ে সেই সুর তুললো আবদুর রব। শেখ মুজিবের জন্য এ অবস্থা সত্যিই দুঃখজনক। ১৯৭২ সালের গ্রীষ্মকাল। শেখ মুজিবের সবকিছুই যেন উলটপালট হয়ে যাচ্ছি। চাল-ডালের দাম হঠাৎ করে দ্বিগুণ হয়ে গেলো। শেখ মুজিব যুদ্ধের ফলশ্রুতি বলে পরিস্থিতিকে ধামাচাপা দিতে চাইলেন। কিন্তু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে তেল, নুন, সাবান থেকে শুরু করে সকল নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্রের দাম বুভুক্ষ মানুষের নাগালের বাইওে চলে গেল। দেশটা দুভির্ক্ষের করাল গ্রাসে নিপতিত হলো। আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি জনমনে নিদারুণ বিভীষিকার ছায়াপাত করলো। সশস্ত্র সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী দলের হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড, হত্যা, লুটতরাজ ইত্যাদিতে চতুর্দিক থমথমে হয়ে উঠলো।’

‘কিন্তু মুজিবের মাঝে অনুশোচনার কোন লক্ষণ দেখা গেল না। নিজের উপর থেকে সকল দোষ তাঁর সহচরদের উপর ঠেলে দিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, আমি জনগণের সঙ্গে আছি। প্রথমবারের মত পার্টির লোকদের উপর তিনি চড়াও হলেন। চোরাইকারবারি, স্বজনপ্রীতি আর দুর্নীতির অভিযোগে ডিসমিস করলেন সংসদের ১৯ জন সদস্যকে।’
‘শাসকগোষ্ঠির মধ্যে এ ধরনের পরিশোধন প্রক্রিয়া জনগণের মনে আশার সঞ্চার করলো। মুজিব ঘোষণা দিলেন আমি কাউকে ছাড়বো না। যে কোন অপরাধীর বিরুদ্ধে আমি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। মুজিবের মাঝে এ পুরনো গতিশীলতা দেখে সকলেই মনে-প্রাণে বিশ্বাস করলো যে, এ সুযোগে মুজিব জনগণের বিশ্বাস আবারও ফিরে পাবেন। একজন বাঙ্গালী সাংবাদিক আমাকে বললো, নেতা সবকিছু ঠিকঠাক করে ফেলবেন। শুরু হলো রাজনৈতিক চমৎকারিত্ব প্রদর্শনের পালা। তিনি একের পর এক জনগণের মৌলিক অধিকারসমূহ খর্ব করতে শুরু করলেন। সাংবিধানিক নিয়ম-কানুন, আইনের শাসন, বাক-স্বাধীনতা, মতামতের অধিকার, সুযোগের সমতা ইত্যাদি সবই বিলুপ্ত হয়ে গেলো। কায়েম হলো দুঃশাসনের চরম পরাকাষ্ঠা।’
(বাংলাদেশ- রক্তের ঋণ,এন্থনী মাসকারেনহাস, পৃ:৩২,৩৩, হক্কানী পাবলিশার্স, ২০১৪)

১৯৭৪ সালের শুরু থেকে দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। একদিকে খাদ্য সংগ্রহের অভিযান ব্যর্থ, অন্যদিকে চোরাচালান প্রতিরোধে সরকার ব্যর্থতা দেশ এক মহাসংকটের কবলে পতিত হয়। এতদিন খাদ্য বিভাগের হাতে যে সামান্য খাদ্য মজুদ ছিল সেটা প্রতিদিনের চাহিদা মেটাতে গিয়ে ৭৪ সালের জুন মাসের মধ্যে সে তলানীতে গিয়ে ঠেকে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী খাদ্য আমদানি করা সম্ভব না হওয়ায় আগস্ট, সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবর মাসে খাদ্যের মওজুদ প্রায় শূন্যের কোটায় চলে যায়। খাদ্য ঘাটতির ফলে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যও বৃদ্ধি পায় এবং সেটা জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে থাকে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, তখন জনগণের ক্রয় ক্ষমতাও ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। খাদ্যভোগের হার সমসাময়িক দশকের সর্বনিম্ন স্তরে আসে আর জনগণ সেটা প্রতিরোধ করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে। একদিকে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস অপরদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি প্রবণতা জনগণকে অসহায় করে তোলে। ওদিকে কাজ ও মজুরি না থাকায় সাধারণ জনতা এবার সত্যি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে গেল।

ইতোমধ্যেই খাদ্যের অভাবে দেশের লোক অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছিলো। বিশেষ করে রংপুর ও ময়মনসিংহের মতো খাদ্য ঘাটতির জেলাগুলোতে দুর্ভিক্ষের আক্রমণ ছিল প্রবল। কর্মসংস্থান না থাকায় এবং দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ায় এ সময় গ্রামাঞ্চলের গরিব লোকজন দলে দলে শহরাঞ্চলে এসে ভীড় জমাতে থাকে। এ অবস্থায় দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং সংবাদপত্রসমূহ বারংবার সরকারকে সতর্ক করে দিলেও সরকার অব্যাহতভাবে দাবি করতে থাকে যে, পরিস্থিতি পুরোপুরিভাবে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রংপুরে যখন ব্যাপক আকারে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় তখনো খাদ্যমন্ত্রী গোটা জাতিকে এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা একটা সাময়িক ব্যাপার মাত্র। তিনি দাবি করেছিলেন, সরকারের হাতে যথেষ্ট চালের মজুদ রয়েছে। সরকারি দলের নেতারা যখন পরিস্থিতির জন্য ব্যবসায়ী, মজুতদার, কালোবাজারি ও চোরাচালানিদের দায়ী করে বলছিলেন যে, তারা খাদ্যের বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে। তারা বলছিলেন ‘সমাজ বিরোধী’ এবং ‘রাষ্ট্র বিরোধী’ লোকেরাই ছিলো পরিস্থিতির জন্য সম্পূর্ণরূপে দায়ী।

এপ্রিল মাসেও খাদ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়ে বলেন যে, সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রতি মাসে ২,০০,০০০ টন করে খাদ্যশস্য আমদানি করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এই পরিমান খাদ্যদ্রব্য দেশে এসে পৌঁছেনি। উপরন্তু সরকারি গুদামে চালের মজুদ দ্রুত হ্রাস পাওয়ায় জনগণ কচু খেয়ে, কুড়া, ভাতের মাড়, শামুক, গাছের পাতা ও নানারকম লতাপাতা খেয়ে মানুষ বেঁচে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করে।

১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে উপকূলীয় জেলাগুলোতে জলোচ্ছাস হয় এবং আগস্ট মাসে ব্যাপক বন্যা হওয়ায় বিদেশ থেকে প্রচুর রিলিফ আসে। কিন্তু সে রিলিফের দ্রব্য সাধারণের মধ্যে বন্টনের বদলে লুট হয় এবং চোরাই পথে ভারত চলে যেতে থাকে। এসময় দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল সরকারের প্রতি সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিল। তারা অভিযোগ করেছিল যে, প্রচুর পরিমানে চাল ডাল সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পাচার হচ্ছে। এসময় ভারতে চালের মূল্য ছিল বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশী। এজন্য পাচার করে সরকারের মদদপুষ্ট চোরাকারবারীরা ব্যাপক লাভবান হচ্ছিল। রিলিফ-লুটপাট ও চোরাইপথে ভারত পাচারের কাহিনী তখনকার সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত হয়। চোরাই দ্রব্যের মধ্যে চাল ছাড়াও বিদেশ থেকে আসা নানারকম খাদ্য, কম্বল, কেরসিন, লবন ইত্যাদি ছিল। ১৯৭৪ সালের আগস্ট, সেপ্টেম্বর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরে দৈনিক ইত্তেফাকসহ অন্যান্য দৈনিক সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোতে প্রতিদিন ছাপা হয় ক্ষুধার্ত মানুষের ছবি। ছাপা হয় চোরাচালানের ঘটনা, প্রতিবেদন প্রকাশ করে রিলিফ লুটের ঘটনা প্রবাহ নিয়ে।

অন্ন নেই, বস্ত্র নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। কোটি কোটি আদম সন্তান অনাহারে ক্লিষ্ট। ৩ আগস্ট দৈনিক ইত্তেফাক প্রকাশ করে জালপরা অর্ধনগ্ন বাসন্তীর ছবি। দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত হয় বাঁচার জন্য বমি খাচ্ছে মানুষ। সংবাদে ছাপা হয় ডাস্টবিনের খাদ্য নিয়ে কুকুর-মানুষে লড়াই। তৎকালীন বাংলাদেশ রেডক্রস সম্পর্কে অসংখ্য অভিযোগ ছিল চুরি, লুটপাট, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির। গ্রাম-গঞ্জের কবিআলরা পর্যন্ত রেডক্রসের প্রধান গোলাম মোস্তফাকে নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক কবিতা লেখে। জননেতা আতাউর রহমান খান রেডক্রসের অপতৎপরতার প্রতিবাদ করেন। ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ আনেন। কিন্তু সেটা আমলে না নিয়ে গোলাম মোস্তফা আতাউর রহমানের জীবন বৃত্তান্ত মিডিয়ায় তুলে ধরে তাকে অপদস্ত করার চেষ্টা করে।

১০ আগস্ট দৈনিক ইত্তেফাকে এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ১৩ আগস্ট প্রকাশিত এক রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, সারাদেশের মানুষ কচু ঘেচু ও গাছের পাতা খেয়ে কোনমতে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। ১১ আগস্ট প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জনাব আতাউর রহমান খান বলেন, দুনিয়ায় এমন কোন নজির নেই যে, রেডক্রস সমিতির চেয়ারম্যান দলীয় লোক হয়। তিনি গোলাম মোস্তফার বদলে একজন বিচারপতি বা বিশেষজ্ঞ শিক্ষাবিদকে সংস্থার চেয়ারম্যান বানানোর অনুরোধ জানান। কিন্তু কে শোনে কার কথা।
সে সময়ের রেডক্রসের চেয়ারম্যানও প্রভাবশালী আওয়ামি লিগনেতা গোলাম মোস্তফার ছত্রছায়ায় চোরাকারবারীরা আরও ব্যাপক হারে দ্রব্য পাচার করতে থাকে এবং সংবাদপত্রগুলি সেসময় চোরাচালানের সংবাদ প্রকাশ করতে থাকে। এ ধরনের সমালোচনার মুখে চোরাচালান দমনে ব্যর্থ হয়ে সরকার সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেয়। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামি লিগের প্রভাবশালী সদস্য ও পৃষ্ঠপোষক মহল এতে ক্ষুব্ধ হয়। অভিযোগ দাঁড় করায় যে, তারাও নাকি চোরাচালানের সাথে কমবেশী যুক্ত। যদিও শেখ মুজিব সেনাবাহিনীর চোরাচালান দমনে কার্যকর অবদান রাখায় তাদের প্রশংসা করেন। তা সত্ত্বেও চোরাকারবারে লীগ নেতাদের নাম প্রকাশ পাওয়ায় সরকার অসময়ে সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহার করে নেয়। কারণ তারা অভিযোগ করছিল যে, সম্মানিত নেতৃবৃন্দ অযথা হয়রানির শিকার হচ্ছে এবং সেনাবাহিনী উদ্দেশ্যমূলকভাবে লিগনেতাদের হয়রানি করছে। কার্যত সেনাবাহিনীকে তুলে নেয়ার পর বলা চলে দেশব্যাপী লুটপাট ও চোরাকারবারের রামরাজত্ব কায়েম হয়।

সরকারের এ উন্মাসিক মনোভাব ও সার্বিক পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এর পরিণাম ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ছিয়াত্তরের মনন্তর (১১৭৬) আর পঞ্চাশের মনন্তরের (১৩৫০) মত মানুষ তাদের ঘরবাড়ি-জমি- জোত রেখে বাঁচার তাগিদে দলে দলে শহরের দিকে আসতে থাকে। তাদের ধারণা শহরে বিত্তবানরা থাকে, তাদের কাছে চেয়েচিন্তে খাবার পাওয়া যাবে। কিন্তু সেবছর ফসল উৎপাদন না হওয়ায় শহর ও শহরতলির লঙ্গরখানায় সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকে একচিলতে রুটি পাওয়া যাবে না, এটা বুঝলো তারা শহরে এসে বেঘোরে প্রাণ হারানোর পর।

গ্রাম থেকে দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকা থেকে হাজার হাজার লাখ লাখ মানুষ আসতে থাকে শহরের দিকে। তখন বিভিন্ন শহরে মাত্র ১৩৫টি রিলিফ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। ১২ আগস্ট যাত্রাবাড়ির রিলিফক্যাম্পে আশ্রয়গ্রহণকারীরা বলে যে, তিন দিনে তাদের জন্য একমুঠো খাবারও বরাদ্দ দেয়া হয়নি। ১৩ আগস্ট আইসিআরসি’র সদস্য মি. এলভিন রিলিফ কাজ পরিদর্শনে গেলে আদমজীর লোকরা রিলিফ কমিটির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে চুরি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ করে। এলভিন চলে গেলে চেয়ারম্যান ও তার লোকরা অভিযোগকারীদের উপর হামলা চালায়। এতে অনেকে আহত হলে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

আসলে তখন লঙ্গরখানার নামে চলে দেশের মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা। সে সময়ের পত্রিকার পাতা ওল্টালে যে কারো গা শিউরে উঠবে। মানবসৃষ্ট সে ৭৪ এর দুর্ভিক্ষ কেড়ে নেয় লাখ লাখ মানুষের জীবন। দৈনিক ছাপা হয় হাড্ডিসার-কংকালসার মানুষের ছবি। একজন দু’জন নয়, শয়ে শয়ে হাজারে হাজারে। গ্রামে কৃষক-চাষী যারা একসময় শক্তহাতে লাঙ্গল ধরতো, মহিষের হাল চালাতো, মাঠে মাঠে বইয়ে দিতো ফসলের সমারোহ, সেই সামর্থবান কৃষকরা দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে স্রেফ প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে শহুরে মানুষের কাছে হাত পাতে, বাঁচার জন্য একটু ফেন চায়। সন্তানের জন্য একমুঠো ভাত চায়। সে উপবাসী নারী-পুরুষ, শিশু সন্তানরা খাবার না পেয়ে শূন্য মুখে ফিরে যায়। তারপর বেওয়ারিশ লাশ হয়ে পড়ে থাকে পথের পাশে।
১৩ অক্টোবর সংবাদপত্র সূত্রে জানা যায়, দৈনিক ৮৪টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন হচ্ছে, দৈনিকবাংলা খবর দেয় জামালপুরে দৈনিক শতাধিক লোক অনাহারে মারা যাচ্ছে। ক্ষুধা নিবৃত্তিতে ব্যর্থ হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবারের সদস্যরা একত্র হয়ে আত্মহত্যা করছে, কেউ বা গলায় ফাঁসি দিয়ে মরছে। লাশের পরিমান বেশী হওয়ায় আঞ্জুমান লাশ দাফন বন্ধ করে দিয়েছে। ভাত নেই, কাপড় নেই, থাকার জায়গা নেই। ১০ অক্টোবর ইত্তেফাক এক ছবি ছাপে। সেখনে দেখা যায় লজ্জা নিবারণের জন্য মাছ ধরার জাল পরে আছে কুড়িগ্রামের বাসন্তী ও দুর্গতি। মেয়েরা চট পরে ভিক্ষার থালা নিয়ে ঘুরছে এ দ্বার থেকে সে দ্বারে। গৃহবধু হচ্ছেন প্রমোদবালা।

রিলিফের এত কেলেংকারীর সংবাদ প্রকাশিত হল কাগজে কিন্তু একজনেরও বিচার হয়েছে, এটা কেউ শোনেনি। দেশে পানির দামে বিক্রি হয়েছে জমি, স্বর্ণালংকার, ভিটেমাটি। একদিনের সম্ভ্রান্ত গৃহস্থ-কৃষক দুর্ভিক্ষে সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। দেশে অনাহারী সর্বহারার সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকার বাইতুল মোকাররম এলাকায় উলঙ্গ-অর্ধউলঙ্গ নারী-পুরুষ অন্ন-বস্ত্রের দাবিতে মিছিল করে। কিন্তু গ্রাম থেকে আসা সেই অসহায় অনাহারী মানুষের আর্তনাদ আওয়ামী লুটেরা-পাণ্ডাদের হৃদয় গলেনি।

৮ অক্টোবর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি জাতির বিবেক বলে পরিচিত অধ্যাপক আবুল ফজল চট্টগ্রাম বিশ্বদ্যিালয়ের ৮৪ জন শিক্ষকসহ একটি বিবৃতি দেন। তাতে বলেন- ‘জাতির জীবনে দুর্যোগ মোকাবেলার প্রতি এত অনাসক্তি, এত অবহেলা, এত অদ্ভুত আচরণ ঔদাসিন্য কখনো দেখা যায়নি। নিজের প্রতি আস্থাহীন জাতি যে কি পরিমান জড়পদার্থে পরিণত হতে পারে, বর্তমান বাংলাদেশ তার জ্বলন্ত উদাহরণ।’
সরকারের ছত্রছায়ায় দেশের চরম দুর্দিনে প্রভাবশালী লীগনেতাদের মজুদ্দারি ও কালোবাজারি সমানভাবেই অব্যাহত ছিল। ১৯৭৪ এর ১ নভেম্বর বাইতুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে দেশের প্রথিতযশা আইনজীবী, লেখক, শিক্ষক, চিকিৎসক, অধ্যাপক, সাংবাদিক, চিত্রশিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও ছাত্রসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়াজিত পেশাজীবীদের এক বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর বুদ্ধিজীবীদের এতবড় সমাবেশ এর আগে আর কখনো হয়নি। সমকাল পত্রিকার প্রখ্যাত সম্পাদক সিকান্দর আবু জাফরের সভাপতিত্বে এ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন আইনজীবী মির্জা গোলাম হাফিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামজাদা শিক্ষক ড. আহমদ শরিফ, মাধ্যমিক স্কুল সমিতির সম্পাদক জয়নাল আবেদীন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সাংবাদিক কূটনীতিক এনায়েত উল্লাহ খান, এডভোকেট কামরুন্নাহার লাইলী, সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন আহমদ, সাংবাদিক মহিউদ্দীন আলমগীর, বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন ওমর, মুহাম্মদ জাকারিয়া প্রমুখ। সমাবেশ থেকে মিছিল বের হয় এবং সেটা শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। সমাবেশে গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয় যে, এই মন্বন্তরের ব্যাপকতা ও ভয়াবহতা ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের ভয়াবহতাকে ছাড়িয়ে গেছে। এই মন্বন্তর বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে সৃষ্টি হয়নি বরং শাসকগোষ্ঠি ও তাদের সহযোগীদের গণবিরোধী নীতি ও কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষ পরিণতি।
সমাবেশের প্রস্তাবে একটি সর্বদলীয় রিলিফ কমিটি গঠনের আহ্বান জানানো হয়। অধিক পরিমানে লঙ্গরখানা সৃষ্টি, সেখানে পর্যাপ্ত খাবার ব্যবস্থাসহ নানারকম নির্যাতন বন্ধের দাবি জানানো হয়।

১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষ চলাকালে দেশের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন দূরদর্শী জননেতা তাজউদ্দিন আহমদ। বলা হয়ে থাকে যে, তাঁর মত একজন চৌকস নেতার অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার সময় দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায় কিভাবে ? ব্যাস, এইটুকু। এর বাইরে তার ব্যাপারে উচ্চকন্ঠে আর কোন সমালোচনা হয় না। আসলে তিনি সচেতনভাবেই দেশের সার্বিক পরিস্থিতির উপর নজর রাখছিলেন। এবং দেশের এ দুঃসহ অবস্থায় বিভিন্ন দেশ সফর করে কিছু অনুদান আনার চেষ্টা করছিলেন।

এ বিষয়ে ‘তাজউদ্দিন আহমদ নেতা ও পিতা’ গ্রন্থে শারমিন আহমদ বলেন- “১৯৭৪ সালের ৮ আগস্ট আব্বু দুই সপ্তাহের জন্য মধ্যপ্রাচ্য সফর করেন। মধ্যপ্রাচ্যের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার, পারস্পরিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য আব্বুর এই সফর বাংলাদেশের জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তেল সম্পদের উপর ভিত্তি করে বাণিজ্য, ব্যাংকিং এর জন্য মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তির চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এই প্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা বাংলাদেশের জন্য ছিল প্রয়োজনীয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের দুর্দিনে মধ্যপ্রাচ্য পাশে এসে দাঁড়ায়নি। তারপরও বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে যুদ্ধবিদ্ধস্ত, খরা ও বন্যাপীড়িত বাংলাদেশের স্বার্থে তিনি ইরাক-কুয়েত- সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। এ সফরের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল বাংলাদেশ সম্পর্কে ম্যধপ্রাচ্যে বিরূপ মনোভাবের পরিবর্তন ঘটানো।”

১৩ অক্টোবর ১ মাস সাতদিন পর দেশে ফিরলেন আব্বু। …বিমানবন্দরে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে আব্বু জোরালো বক্তব্য রাখলেন। তিনি বললেন ‘বর্তমান জাতীয় দুর্যোগকালে উটপাখির মত বালিতে মাথা গুঁজে যদি ভাবা হয় যে, ঝড় থেমে গেছে তা হবে মারাত্মক ভুল’। তিনি অবিলম্বে দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয়ভাবে খাদ্য সংকটের বাস্তব সমাধানের আহ্বান জানান।(পৃ: ১৮২, ১৯০)।

ঠিক এ বক্তব্যটাই তাজউদ্দিনের জন্য কাল হয়ে গেল। তিনি কেন দুর্ভিক্ষ মোকাবেলার জন্য সর্বদলীয় কমিটি গঠনের আহ্বান জানালেন, এজন্য নাকি শেখ মুজিব বেজায় রুষ্ট হন। এরপর তাজউদ্দিনকে তিনি বাকশাল গঠনের প্রস্তাব রাখলে তিনি তার বিরোধীতা করেন। ১৩ অক্টোবর থেকে ২৬ অক্টোবর অনেক বেশী সময় না। এর মধ্যেই তাজউদ্দিনকে অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে হল। কারণ তিনি যেভাবে যে প্রক্রিয়ায় দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করতে চাচ্ছিলেন, সেটা শেখ মুজিব মেনে নিতে পারেননি। এ কারণে তাজউদ্দিন অর্থমন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও অর্থব্যবস্থা ধ্বংসের জন্য তাকে দোষারোপ করা হয়না। দোষারোপ করা হয় দেবতারূপী শেখ মুজিবকে।

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের লেখা ‘আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম’ গ্রন্থের একটু লেখা আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই। তিনি বলেছেন, “মুক্তিযুদ্ধে আমরা সবাই ত্রিপুরা বা পশ্চিমবঙ্গে যাইনি, যেতে পারিনি, যাওয়া সম্ভব ছিল না। গেলে মুক্তিযুদ্ধ হতো না। গিয়েছিল অনেকে ও তাদের মধ্যে বেশীরভাগ ছিল অসহায় মানুষ।….. গিয়েছিল অনেক শক্তিমান, যাদের কথা ছিল রাজাকার হওয়ার, কিন্তু পরিস্থিতি তাদের মুক্তিযোদ্ধা করে তুলেছিলো। পরে তারা তার সুফল তুলেছিল প্রাণপণে। (৪২) তারা মূলত সিক্সটিন্থ ডিভিশন বা নকল মুক্তিযোদ্ধা। ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত যারা ছিল অন্যকাজে কিন্তু ১৬ ডিসেম্বর দেখা দেয় মুক্তিযোদ্ধা রূপে। এরাই শুরু করে লুটতরাজ, পরিত্যাক্ত বাড়িঘর দখল, তারাই বিভিন্ন কারখানার প্রশাসক হয়ে ওঠে। বিক্রি করে দিতে থাকে সবকিছু। দখল তখন হয়ে উঠেছিল একটি চমৎকার কাজ। ঘরবাড়ি দখল, পাকিস্তানীদের ফেলে যাওয়া ব্যবসা দখলে মেতে উঠেছিল অজস্র বাহিনী। সবচেয়ে দক্ষতা দেখিয়েছিল মুজিব বাহিনী নামের একটি সংঘ।”

চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ আওয়ামী লুটপাটের একটি প্রামাণ্য দলিল। এই দুর্ভিক্ষ আওয়ামি লিগ সরকারের সম্পূর্ণ উদাসীনতার জন্য হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। একদিকে ক্ষুধার্ত মানুষ ডাস্টবিন থেকে খাবার কুড়ে খাচ্ছে অন্যদিকে শেখ মুজিবের পুত্রদ্বয় কোটি টাকা খরচ করে বিয়ে করেছেন। দৈনিক ইত্তেফাক পাশাপাশি দুইটি ছবি ছেপেছিলো, ক্ষুধার তাড়নায় মানুষ বমি খাচ্ছে অন্যদিকে শেখ মুজিব তার ৫৫তম জন্মদিনে ৫৫ কেজি ওজনের কেক কেটে জন্মদিনের উৎসব পালন করছেন।

খাদ্যমন্ত্রী আব্দুল মোমেন ২২ নভেম্বর’ ৭৪ এক বিবৃতিতে জানান যে, বন্যাজনিত দুর্ভিক্ষের সময় অনাহার ও ব্যাধির ফলে ২৭ হাজার লোকের মৃত্যুও হয়েছে। খাদ্যমন্ত্রীর হিসাব বাস্তবের ধারে কাছেও ছিল না। বিবিসির ১ নভেম্বর রাতের খবরে বলা হয় যে, বেসরকারি হিসাবে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষে এ পর্যন্ত লক্ষাধিক লোক প্রাণ হারিয়েছে।
বেতারে বলা হয় যে, লন্ডনের একটি পত্রিকার সংবাদদাতা সর্বাধিক দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকা রংপুরে গিয়েছিলেন। তিনি জানান যে, শুধু এ এলাকায়ই ২৫ হাজার লোক মারা গিয়েছে। তবে বেসরকারিভাবে বিভিন্ন সংবাদপত্রের সূত্রে যে তথ্য এসেছে তাতে ৭৪ এর দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ছয় লক্ষের অধিক।
১৯৭৪ সালে স্রেফ দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত কিছু সংবাদ ও দুর্ভিক্ষের তথ্যচিত্র কেবল তার কয়েকটি আমরা এখানে হুবহু তুলে ধরছি:

উদ্বেগকজন খাদ্য পরিস্থিতি
দেশের কোন কোন এলাকায় ধান, চাউল ও গমের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি এবং সেই সঙ্গে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে বলিয়া বিভিন্ন সূত্রে খবর পাওয়া যাইতেছে। খাদ্যের চোরাচালান, এক শ্রেণীর লোকের কারসাজি, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতি, সরকারি নিয়ন্ত্রণ তৎপরতার অভাব প্রভৃতিই এই পরিস্থিতির জন্য মূলত: দায়ী বলিয়া অভিযোগ পাওয়া যায়।
এরা গরুর গোশত খাইয়া ভোলা মহকুমার বোরহানুদ্দিন থানার ১০ ব্যক্তি মারা গিয়াছে এবং ৬০ জন অসুস্থ হইয়া পড়িয়াছে, এই খবরে বিস্মিত হইবার বা ইহাতে বিশ্বাস স্থাপন না করিবার কিছু নাই। স্বয়ং সরকার দলীয় স্থানীয় এমপি সাংবাদিকদের এই খবর দিয়াছেন। জান বাঁচানোর জন্য মানুষ মরা গরু খাইতে আরম্ভ করিয়াছে, তবু বাঁচিতে পারিতেছে না, বরং মরা গরুর গোশত খাইয়া আরও আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলিয় পড়িতেছে, এ খবর বড় মর্মান্তিক, বড় সাংঘাতিক। একদিকে নির্মম প্রকৃতি, আরেক দিকে নির্দয় লুটেরারা কি তবে বাঙালিকে কাঙালি না বানাইয়া ছাড়িবেই না?- ইত্তেফাক, মার্চ- ২৩, ১৯৭৪।।
নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ খাদ্যশস্যের অবিশ্বাস্য রকম মূল্যবৃদ্ধি ও তীব্র খাদ্যাভাবের দরুন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল হইতে দুঃখজনক খবর পাওয়া যাইতেছে।- ইত্তেফাক, এপ্রিল- ৪, ১৯৭৪।

‘যাদের হাতে কালো টাকা নেই, যারা হাইজ্যাকার হতে অভ্যস্ত নয়, যাঁরা লুটপাট করে খেতে পারে না, যাঁরা মন্ত্রী মেম্বার নয়, তাদের পক্ষে চালের এই অগ্নিমূল্যেও বাজারে বাঁচার কোন উপায় নেই’। ড. আলীম আলরাজী ও জনাব মশিউর রহমানসহ ১৫ জন ভাসানী ন্যাপ নেতৃবৃন্দ গত শুক্রবার সংবাদপত্র প্রদত্ত বিবৃতিতে এ কথা বলেছেন। -গণকন্ঠ, এপ্রিল- ৮, ১৯৭৪।

অস্বাভাবিক মৃত্যুরহার দৈনিক গড়ে ১০ জন
এ বৎসর থেকে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১০ জন লোককে অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যু বরণ করিতে হইতেছে বলিয়া এক পরিসংখ্যানে জানা যায়। চুয়াত্তুরের ১ জানুয়ারি হইতে এ পর্যন্ত গত ১৩৪ দিনে লঞ্চ ডুবিয়া, ট্রেন দুর্ঘটনায়, গুলিখাইয়া, মুন্ডচ্ছেদ হইয়া, পিটুনী খাইয়া ৮২৮ জনকে মৃত্যুবরণ করিতে হইয়াছে। ইহাছাড়াও এ বৎসর আগুনে পুড়িয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হইয়া, বিষপান কিংবা গলায় দড়ি দিয়া আত্মহত্যা করিয়া প্রায় ৪০০ জন প্রাণ হারাইয়াছেন।- ইত্তেফাক, মে- ১৫, ১৯৭৪।

এক মুঠ নুন দ্যাও
‘রিলিফের চাউল গম চাওনা। বানের পানিতে হামার গুলার সউগ গেইছে, জমি গেইছে, ঘর গেইছে, বিচনধান গেইছে। ওগের ঔষধ পাইনা। ইলিফ আইলে নেতা পোতা, মেম্বোর চেয়ারম্যানরা চুরি করি খাইবে। তোমরা হামাক গুলাক এক মুটনুন দ্যাঁও। পাটর পাতা-কলার পাতার মাকিয়া আজরাইলের হাত থাকি জানটাকে বাঁচাবার চাই’। ইত্তেফাক, আগস্ট- ১, ১৯৭৪।

‘ইট্টু ফেন দেবেন মা’
‘ইফতার করার লাইগা ইট্টু ফেন দেবেন মা? মাগো তিনদিন কিছ ুখাই নাই, পোলাডা না খাইয়া দাপাইতেছে। এক টুকরা রুটি দেন না’ ‘বাবা তোমরা আমারে মাইরা ফেলাও আর সইতে পারি না।’ এগুলো আজকের ঢাকার সাধারণ সংলাপ। রাজনীতির ফুটপাত, অফিস-বারান্দা, কমলাপুর, তেজগাঁও রেলওয়ে স্টেশন, সদরঘাট টারমিনাল, স্টেডিয়ামের চত্ত্বরে তাদের আস্তানা। ওরা মরছে দল বেঁধে। মরার আগে প্রাণপণ চেষ্টা করছে বেঁচে থাকতে। যুবক, যুবতী, তরুণ, তরুণী, বৃদ্ধা লাখ লাখ মানুষ বাঁচার জন্য যেকোন অবলম্বনকে আঁকড়ে ধরছে। এক টুকরো রুটির জন্য যুবতী কিশোরী মেয়েরা সতীত্বকে সঁপে দিচ্ছে হিংস্র হায়েনার কাছে। বাপমায়ের চোখের সামনে যুবতী মেয়ের দর-দাম চলছে। হাজার হাজার সখিনা, সালেহা, গুণবতী, মালেকারা তাদের দেহের বিনিময়ে নিজের এবং বাপ-মার প্রাণ রক্ষার চেষ্টা করছে।- সোনারবাংলা, সেপ্টেম্বর- ১৫, ১৯৭৪।
খাদ্যাভাবঃ শহরে ক্ষুধার্ত মানুষের ভীড় ঃ অবিলম্বে লঙ্গরখানা খোলার দাবি- ইত্তেফাক, সেপ্টেম্বর- ২০, ১৯৭৪।

ক্ষুধার্ত মানুষের আর্ত চিৎকারে ঘুম ভাঙ্গে
নিরন্ন, অভুক্ষ, অর্ধভুক্ত, অর্ধনগ্ন ও কঙ্কালসার অসহায় মানুষের আহাজারি ও ক্ষুধার্ত শিশুর আর্ত চিৎকারে এখন রাজধানীর সমস্যা পীড়িত মানুষের ঘুম ভাঙে। অতিপ্রত্যুষ হইতে গভীর রাতি পর্যন্ত দ্বারে দ্বারে করুণ আর্তি ঃ ‘আম্মা একখানা রুটি দ্যান’। গৃহিনীরা কখনো বিরক্ত হন, আবার কখনও আদম সন্তানের এহেন দুঃসহ দুর্দশা দেখিয়া অশ্রুসজল হইয়া ওঠেন।- ইত্তেফাক, সেপ্টেম্বর- ২৩, ১৯৭৪।

ওরা বুভুক্ষু মানুষের মুখের গ্রাস কাড়িয়া লইতেছে
খাদ্যদ্রব্য বন্টনব্যবস্থায় কারচুপি এবং দুর্নীতিবাজদের ব্যক্তি স্বার্থসিদ্ধিও হীনচক্রান্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় খাদ্যাভাব তীব্রতর করিয়া তুলিতেছে। রেশন ও রিলিফের দ্রব্য আত্মসাৎ এবং কালোবাজারে বিক্রয়ে ঘটনা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাইয়া চলিয়াছে।- ইত্তেফাক, সেপ্টেম্বর- ২৩, ১৯৭৪।

রাজধানীর পথে পথে জীবিত কঙ্কাল
শীর্ণকায় কঙ্কালসার আদমসন্তান। মৃত না জীবিত বুঝিয়া ওঠা দুস্কর। পড়িয়া আছে রাজধানী ঢাকা নগরীর গলি হইতে রাজপথের এখানে সেখানে। হাড় জিরজিরে বক্ষে হাত রাখিয়াই কেবল অনুভব করা যায় ইহারা জীবিত না মৃত।- ইত্তেফাক, সেপ্টেম্বর- ২৯, ১৯৭৪।

এখানে মৃত্যু হানা দেয় বারবার
মৃত্যুর লোমশ থাবা হানা দিয়া চলিয়াছে রাজধানীর ফুটপাথে- নিরন্ন অনাহারক্লিষ্ট মানুষের অস্থি কঙ্কালসার দেহ প্রতিদিনই ঢলিয়া পড়িতেছে স্টেডিয়ামের চত্বরে, গুলিস্তানের জনাকীর্ণ ফুটপাথে, সদরঘাটের টার্মিনালে কিংবা কমলাপুর স্টেশনের সদাব্যস্ত প্লাটফর্মে। শুধু একমুষ্টি অন্নের জন্য হন্যে হইয়া ঘোরে নগ্ন-অর্ধনগ্ন নারী পুরুষের দল। পাষান প্রাচীরে ঠুকিয়া অবশেষে যখন তাহারা ফিরিয়া আসে তাহাদেও ভাসমান আস্তানায়, তখন হয়তো দেখিতে পায়, আদরের সন্তান, পতিপরায়না স্ত্রী, স্নেহময়ী মাতা-পিতা অথবা পরম প্রিয় অনুজ সমস্ত দুঃখ কষ্টের অনেক ঊর্ধ্বে চলিয়া গিয়াছে।- ইত্তেফাক, অক্টোবর- ৪, ১৯৭৪।

‘একটু ফেন দাও গো পুরবাসী……’ একটু ফেন দাও গো পুরবাসী ……। তিরিশ বছর পর এ বাংলায় আবার ফিরে এসেছে সেই আহ্বান। ফিরে এসেছে সেই অতি পরিচিত দৃশ্য, ফেনের প্রতীক্ষায় কুকুর মানুষের পাশাপাশি অবস্থান আর ফেন নিয়ে কাড়াকাড়ি।- গণকন্ঠ, অক্টোবর- ১৫, ১৯৭৪।

রাজধানীতে গড়ে ২০টি লাশ দাফন
ঈদের দিন হইতে গতকাল (রবিবার) পর্যন্ত রাজধানীতে ৪১টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হইয়াছে বলিয়া গতকাল আঞ্জুমান-ই-মফিদুল ইসলামের প্রধান কর্মসচিবের সহিত যোগাযোগ করিয়া জানা গিয়াছে।- ইত্তেফাক, অক্টোবর- ২১, ১৯৭৪।

‘হেরিনু জননী মাগিছে ভিক্ষা, ঢেকে রেখে ঘরে ছেলের লাশ’
দুঃখিনী বাংলার লাখো-কোটি ভূঙ্গা নাঙ্গা মানুষের জীবনে আজ ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর মৃত্যুর অন্ধ-তামাসা। মৃত্যুর ছায়ার এখানে দীর্ঘতর হইতেছে, অনাহারের লোমশ থাবা ক্রমশঃ সমগ্র জনশক্তির টুটি টিপিয়া ধরিতে উদ্যত। রংপুরের কুড়িগ্রামে, গাইবান্ধায়, নীলফামারীতে সন্তানহারা মায়ের বিলাপ-ধ্বনি, ক্ষুধার্ত শিশুর আর্তক্রন্দন আজ অনুরণন তোলে গোটা বাংলাদেশে। সারিসারি মৃতদেহের শেষ নিঃশ্বাসে ঝড় ওঠে। লাশের বক্র দেহভঙ্গীতে জিজ্ঞাসার চিহ্ন‘আমরা কি বাঁচার অধিকারটুকুও হারাইয়াছি’।- ইত্তেফাক, অক্টোবর- ২৪, ১৯৪।

চারিদিকে শুধু মৃত্যুর বীভৎস চিত্র
মৃত্যু আর মৃত্যু। গাইবান্ধা তথা সমগ্র রংপুর জেলার চারদিকে শুধু মৃত্যুর বীভৎস চিত্র। গাইবান্ধা মহকুমায় বর্তমানে দৈনিক গড়ে প্রায় সাত শত লোক অনাহার, কলেরা এবং পেটের পীড়ায় মৃত্যুবরণ করিতেছে।- ইত্তেফাক, অক্টোবর- ২৭, ১৯৭৪।

দুর্ভিক্ষে লক্ষাধিক লোকের মৃত্যু
গতকাল (সোমবার) রাত্রে বিবিসির খবরে প্রকাশ ঃ বেসরকারি হিসাবে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষে এ পর্যন্ত লক্ষাধিক লোক প্রাণ হারাইয়াছে। বেতারে বলা হয় যে, লন্ডনের একটি পত্রিকার সংবাদদাতা সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা রংপুরে গিয়েছিলেন। তিনি জানান যে, শুধু এ এলাকায়ই ২৫ হাজার লোক মারা গিয়াছে।- ইত্তেফাক, নভেম্বর- ২, ১৯৭৪।

উত্তরাঞ্চলে অনাহারে ও কলেরায় দৈনিক গড়ে দেড় সহস্র লোকের মৃত্যু
উত্তরাঞ্চলের শহরে-বন্দরে-গ্রামে-গঞ্জে এখন অনাহার জনিত মৃত্যুও নিদারুণ বিভীষিকা। পথে ঘাটের মৃত্যুর এই হৃদয় বিদারিক চিত্র এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করিয়াছে। উত্তরাঞ্চলের নিম্নমধ্যবিত্ত প্রতিটি পরিবার আজ মৃত্যুর ভয়ে ভীত।- ইত্তেফাক, নভেম্বর- ৯, ১৯৭৪।

দুর্ভিক্ষ ঃ পাঁচ লাখ মরেছে ঃ দশ লাখ মরবে
ক্ষমতাসীনদের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ সাড়ে সাত কোটি মানুষের একটি সংগ্রামী পরিবার থেকে ইতিমধ্যেই ৫ লক্ষ নর নারীকে কেড়ে নিয়েছে। জীবিতরা লড়াই করছে ক্ষুধা ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে। অখাদ্য-কুখাদ্য দিয়ে উদরপূর্তি করেও সমগ্র জাতি ক্রমাগতই এক সকরুণ মৃত্যুও পথেই ধাবিত হচ্ছে। এই মুহুর্তে নতুন ফলানো ফসল নবান্ন করার মহালগ্নেও পথে পথে লক্ষ লক্ষ ভূখা মানুষের হৃদয়বিদারী আর্তনাদ।- গণকন্ঠ, ডিসেম্বর- ৮, ১৯৭৪।

‘৭৪-এর বন্যার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম বাংলার সমগ্র চিত্র সহসা উদ্ভাসিত হলো নগরবাসীর কাছে এবং সেই সঙ্গে সমস্ত বিশ্ববাসীর কাছে। প্রতিদিন দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার মানুষ মারা যেতে লাগলো, লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল জীর্ণ মানুষ শহরে এসে ভীড় জমালো এবং শহরের রাজপথে প্রতিদিন পড়ে থাকলো শত শত বেওয়ারিশ লাশ। বিচিত্রার আলোকচিত্র শিল্পী শামসুল ইসলাম আলমাজী এই সময়ে প্রচুর দুর্ভিক্ষের ছবি তুলেছেন। এসব ছবির অধিকাংশই তখন পত্রিকায় ছাপানো সম্ভব হয়নি। কিন্তু সেই দলিল চিত্রগুলো এখনো রয়ে গেছে। এই সমস্ত ছবি স্বৈরাচার ও দুঃশাসনের সাড়ে তিন বছরের বঞ্চনা, শোষণ ও নির্যাতনের প্রামাণ্য দলিল হয়ে থাকবে।- বিচিত্রা, ১৯৭৫।

এই নিস্ক্রিয়তা ভয়াবহ
দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ বিরাজ করিতেছে। সাড়ে সাত কোটি অধিবাসীর মধ্যে অন্ততঃ সাড়ে পাঁচ কোটি লোক বিপন্ন ও ক্ষুধার্ত। প্রতিদিন অনাহারে শত শত মানুষ মৃত্যু বরণ করিতেছে। দেশের প্রত্যেকটা গ্রামে মৃত্যুর করাল ছায়া, নিরন্ন ও অসহায় মানুষের আর্তরব। গ্রাম ভাঙ্গিয়া হাজার হাজার মানুষ খাদ্যের আশায় শহরে পাড়ি জমাইতেছে। রাস্তা-ঘাটে জীবন্ত কঙ্কালের মিছিল। যেখানে সেখানে পড়িয়া থাকিতে দেখাযায় নর-নারী ও শিশুর লাশ। রংপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় আজ দাফন করার লোকও পাওয়া যায় না। গোদের উপর বিষফোড়ার ন্যায় আবার দেশের নানান স্থানে ব্যাপক আকারে দেখা দিয়েছে মহামারী। প্রতীকি ভাষায় বলিতে গেলে, মৃত্যু যেন দশ হাত বিস্তার করিয়াছে। সরকার দেশের নানা স্থানে এক অনুমোদিত হিসাব মোতাবেক ৪৫০০টি লঙ্গরখানা খুলিয়াছেন। আরও লঙ্গরখানা খোলার উদ্যোগ নেওয়া হইতেছে। বেসরকারি পর্র্যায়ের কতক কতক স্থানে লঙ্গরখানা খোলাহইয়াছে ও হইতেছে। কিন্তু দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতার তুলনায় এই ব্যবস্থা নিতান্তই ন্যূন। অবস্থা দিনদিনই ভয়াবহতর হইয়া উঠিতেছে। বলিতে গেলে নৃশংস একটা যুদ্ধজনিত অবস্থার চাইতেও শোচনীয় ও ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে পড়িয়াছে দেশের মানুষ।
………. দেশের এমন ভয়াবহ অবস্থা, অথচ দেখিয়া শুনিয়া মনে হয় না যে, তদ্দরুন দায়িত্বশীলদের টনক নড়িয়াছে। চরম দুর্ভিক্ষাবস্থা মোকাবেলা করার জন্য সরকারি কার্য তৎপরতা পর্যাপ্ত নয়। দেশ গোল্লায় যাউক, দায়িত্বশীলদের যেন তাহাতে বিশেষ কিছু করার নেই, এইরূপ দুর্বহ লক্ষণ পরিদৃষ্ট হইতেছে। আগের মত ইফাইলের গোলাক ধাঁধায় নিমজ্জিমত প্রশাসন যেমন নির্জীব, তেমন নিস্ক্রিয়। জরুরী অবস্থায় প্রশাসনকে এবং অন্যান্য দায়িত্বশীল সংস্থাকে কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রয়োজনে সংহত, গতিশীল ও কার্যতৎপর করিয়া তুলিতে হয়, তাহা যেন সরকারি বড় কর্তাদের অজ্ঞাত। দেশের অন্ততঃ সাড়ে পাঁচ কোটি লোক আজ ধ্বংসের মুখে পড়িয়াছে, অথচ আমাদের গোটা প্রশাসন আজও তেমনি নিশ্চল, নিরুদ্বেগ ও নিস্ক্রিয়।
শুধু তাহাই নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা ও দুর্নীতি চরম হইতে চরমতর পর্যায়ে পৌঁছিয়াছে। রেশন ব্যবস্থায় ফাঁকি দিয়া নিরন্ন মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত লাখ লাখ মণ চাউলও আট প্রতি মাসে চুরি হইতেছে। বন্টনব্যবস্থার দুর্নীতি ও সীমা ছাড়াইয়া গিয়াছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরসমূহ এই ব্যাপারে কিছুই করিল না, কিছুই করিতে পারিল না। ইহা ধ্রুত সত্য যে, বন্টন ব্যবস্থাকে মোটামুটি দুর্নীতির উর্ধেŸ রাখিতে পারিলে খাদ্যসংকট এমন মারাত্মক অবস্থায় পৌঁছত না। দায়িত্বে ন্যস্ত ব্যক্তিবর্গ এবং সংশ্লিষ্ট দফতরকে আমাদেও জিজ্ঞাস করিতে ইচ্ছা হয়, বন্টন-ব্যবস্থার দুর্নীতি উচ্ছেদের ব্যবস্থা আপনারা কেন করেন নাই, কেন নিতে পারেন নাই,—- আইন বিধিসহ প্রয়োজনীয় ক্ষমতা তো আপনাদের হাতে তুলিয়া দেওয়া হইয়াছে ? বন্টনব্যবস্থার এহেন দুর্নীতি, কারচুপি ও অপতৎপরতা, অন্যদিকে চোরাচালান অব্যাহত চলিয়াছে, চোরাচালানের স্রোত শতমুখী হইয়া ছড়াইয়া পড়িয়াছে। প্রত্যেকটা ফসলের মৌসুমে এক শ্রেণীর অপরিচিত লোক ও তাহাদের স্থানীয় টাউটরা সীমান্তবর্তী এলাকার হাটে-বাজারে ধান, চাউল ও পাট কিনিতেছে এবং দেশের বাহিরে পাচার করিয়া দিতেছে । সেই শ্রেণীর বিদেশী লোক এমন কি মাঠের ফসলও নাকি আগাম কিনিয়া নেয়। শুধু ধান, চাউল ও পাট পাচারই নয়, আমদানিকৃত বহু যন্ত্রপাতি ও দ্রব্যসম্ভারও পাচার হইয়া যাইতেছে।
বহুবার আমরা আবেদন জানাইয়াছি যে, সীমান্তের পাহারা কার্যকর ও জোরদার করা হউক। বহুবার বলিয়াছি যে, সময় থাকিতে চোরাচালানের রুই-কাতলদের ধরিয়া চরম দণ্ড দেওয়া হউক। চোরাপথে পাচার করিয়া দেশের কোটি কোটি টাকা লুন্ঠন করা হইতেছে, পাটশিল্পকে প্রায় ধ্বংসের মুখে ঠেলিয়া দেওয়ার ব্যবস্থা হইয়াছে, দেশটাকে স্থায়ী খাদ্য ঘাটতির মুখে ফেলা হইতেছে, অথচ সরকার সীমান্ত পাহারার ব্যবস্থা নিয়া ও আইন-শৃঙ্খলা এজেন্সির তৎপরতা অব্যাহত রাখিয়াও বড় বড় চোরকে ধরিতে পারিলেন না ? বড়বড় চোর কোথায় থাকে, অতঃপর এই প্রশ্নটিই মনে উদিত না হইয়া পারে না।- ইত্তেফাক সম্পাদকীয়, কার্তিক- ৮, ১৩৮১।
মনে পড়ে গোলাম কুদ্দুসের‘বিদীর্ণ’কাব্যগ্রন্থের‘জীবনগ্রন্থ’কবিতার কয়টি ছত্র ঃ
‘মাঠে-মাঠে পাকা ধান ঝরে,
মা-জননী দেহের বেসাতি করে,
বোন সখিনা কবরের কাফন তুলে নিয়ে
ইজ্জত বাঁচিয়ে
অবশেষে মুখ থুবড়ে
মাটিতে পড়ে,
অথবা যৌবনের ভার নিয়ে
অন্ধকার জীবনের বন্ধ পথ ধরে !
ত্রিশ বছর পূর্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও মন্বন্তরের পটভূমিতে লেখা কবিতা। কিন্তু আমাদের আজিকার অবস্থার সঙ্গে কি অদ্ভুত মিল ! ইয়াসিন কেনারামেরা নিরন্ন মানুষের মুখের গ্রাস লইয়া তাহাদের কারবার করিতেছে। এই মহাদুর্যোগকে মূলধন করিয়া কি প্রকারে লাখপতি হইতে কোটিপতি হওয়া যায় সেই নীল-নকশার ডিজাইনাররাও বোধ করি এই মুহূর্তে বড় কর্মব্যস্ত। অবৈধ অস্ত্রধারীরাও কিন্তু হাত গুটাইয়া বসিয়া নাই। খুন-খারাবি, ডাকাতি-রাহাজানির খবর এই জাতীয় মহাবিপর্যয়ের দিনেও প্রাত্যহিক। কী বিচিত্র এই দেশ, সেলুকাস।- ইত্তেফাক, উপ-সম্পাদকীয়, আগস্ট- ৩, ১৯৭৪।

পাঠকগণ বিশ্বাসকরুন, লঙ্গরখানায় সমবেত হাজার হাজার লোকের একজনেরও গায়ে আমি এমন কাপড় দেখি নাই যাহার দ্বারা সে আসন্ন শীতে আত্মরক্ষা করিতে পারে। লজ্জা নিবরণের কাপড়ই নাই, আর ত শীত-নিবারণ। ইহাদেও উপায় কি ? নতুন ধান নামিলেও ইহাদের খাইবার মত নিজস্ব কিছ ুনাই, বাড়িতে ফিরিয়া যাইবার মত ঘর নাই, লজ্জা নিবারণের মত কাপড় নাই- চটের টুকরাও নাই, পৌষ মাঘের হাড়কাপুনি শীত নিবারণের মত কাঁথা-কম্বলও নাই।- ইত্তেফাক, উপ-সম্পাদকীয়, অক্টোবর- ৮, ১৯৭৪।
শিষ্টাচার বিবর্জিত রাজনীতির টালমটাল সময়ে তৎকালীন মুজিব সরকারের আমলা ও আওয়ামি নেতাদের অসংখ্য অপকর্ম ও জোচ্চুরির ফসল ৭৪ এর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। তার সত্যতা মিলে খোদ শেখ মুজিবের এক বক্তব্যে। তিনি আক্ষেপ করে প্রকাশ্য এক মিটিংয়ে বলেছিলেনÑ“আমি যা ভিক্ষা করে আনি, সব চাটার গোষ্ঠী খেয়ে ফেলে। আমার গরীব কিছুই পায় না।” অথবা “মানুষ পায় সোনার আমি পাই চোরের খনি।” কারা সেদিন রিলিফের চাল ও কম্বল চুরি করেছিল? কারা নিরন্ন আদম সন্তানের মুখের গ্রাস কেড়ে খেয়েছিল? নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর আশপাশের লোকজন। বঙ্গবন্ধু তাদের চিনতেন। কিন্তু ব্যবস্থা নিতে পারেননি। নিলে ইতিহাস অন্যরকম হতো। তারজন্য তাঁর কঠোর হওয়ার খুব প্রয়োজন ছিল কিন্তু তিনি তা হতে পারেন নি। বলা চলে শাসকদলের নেতাদের লুটপাট, চোরাচালান, উন্নাসিকতা ও অমানবিক আচরণই এজন্য দায়ী। যারজন্য চরম মূল্য দিতে হয় স্বয়ং শেখ মুজিবকে এবং দেশের ১৫ লাখ অনাহারি মানুষকে।
যারা দুর্ভিক্ষে অনাহারে মারা গেল, তারা তো বেঁচে গেল। যারা বেঁচে রইল তারাও দুর্ভোগ দুঃসহ অবস্থা ঠেলেই বেঁচে রইল। যারা চুয়াত্তরে গ্রাম থেকে খাদ্যের সন্ধানে শহরে এসেছে সেই শহরে আসা সর্বস্বান্ত অগণিত মানুষই ভাসমান মানুষ, যাদের আশ্রয় জুটেছিল পথেঘাটে, রাস্তার পাশে, লঞ্চটার্মিনালে আর ট্রেন-বাস ষ্টেশনে, সেই না খাওয়া দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের মিছিল আজও শেষ হয়নি। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন মনে করেন, কোন অঞ্চল বা দেশে দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয় প্রাকৃতিক কারণে নয়, বন্টনব্যবস্থার ত্রুটির জন্য। দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আগে থেকে সতর্ক থাকলে বা সময়মত বন্টনপদ্ধতি কার্যকর করতে পারলে দুর্ভিক্ষের মত দুরবস্থাও প্রতিহত করা যায়। ১৯৭৪ সালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে যে দুর্ভিক্ষ হয় তার জন্য যুদ্ধ ও বন্যাকে যতটা দায়ী করা হয় তার চেয়ে বেশি দায়ি সুষম বন্টনব্যবস্থা। যদি সরকার সময়মত সতর্ককারীদের সতর্কবার্তা আমলে নিতো এবং লুন্ঠন ও চোরাচালান প্রতিহত করতে পারতো তাহলে এত খাদ্যাভাব দেখা দিত না, আর এত লোকও না খেয়ে মরতো না। যদিও এখন বলা হয় আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি বা আমাদের দেশের অর্থনীতি সিঙ্গাপুরের চেয়ে শক্তিশালী, এ বক্তব্য কতটা গাঁজাখুরি, তার প্রমাণ মিলে করোনায় আক্রান্ত লকডাউন দেশে প্রাণের আশায় ছুটন্ত উপবাসী-অনাহারক্লিষ্ট নারী-পুরুষের মিছিল দেখে। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে না পারলে এ করোনা মহামারী অব্যবহিত পর যে খাদ্যসংকট দেখা দিবে সেটা প্রতিহত করা যাবে না। দেশ অনিবার্যভাবে আরেকটি দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে যাবে।
বি: দ্র: আমি এখানে ১৯৭৪ সালের মহাদুর্ভিক্ষ নিয়ে যে আলোচনা করলাম। সেটা খুব বেশি দিন আগের ঘটনা নয়। মাত্র ৪৫/৪৬ বছর আগের ঘটনা মাত্র। যারা সে মহাআকাল দেখেছেন তাদের অর্ধেক লোক এখনো বেঁচে আছেন। যার কাছে এ আলোচনাকে কম বা অতিরঞ্জন মনে হবে তিনি যেন কষ্ট করে আমায় একটু জানান। ধন্যবাদ।

লেখক: কালাম ফয়েজী, কথা সাহিত্যিক।

Facebook Comments Box


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি