LalmohanNews24.Com | logo

১৫ই ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং

ভোটের উৎসব

ভোটের উৎসব

ভোট মানুষের নাগরিক অধিকার। আমাদের দেশে প্রতি পাঁচ বছর পর পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। একযোগে সারা দেশ ভোট উৎসবে মেতে ওঠে । ভোট উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে। ভোটার, প্রার্থী, কর্মী ও সমর্থক, এমনকি যারা ভোটার হয়নি তারাও থেমে থাকে না। বিপুল আনন্দ ও উৎসাহ-উদ্দীপনায় প্রাণে প্রাণে বয়ে চলে ভোটের আমেজ। দেশের সকল শ্রেণি পেশার মানুষ, নারী-পুরুষ ও জোয়ান-বুড়ো  সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটের উৎসব মুখর পরিবেশে অংশ নেয়। বাঙালী সংস্কৃতিতে বিভিন্ন উৎসবের পাশাপাশি আধুনিক সময়ে যোগ হয়েছে  ভোট উৎসব।
ভোট এলেই মানুষের মধ্যে বয়ে যায় উৎসবের আমেজ। দেশের প্রতিটি ভোটার ভোটের মাধ্যমে তার স্বাধীন ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে চায়। ভোটার এলাকার প্রতিটি অধিকার সচেতন নাগরিক নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য সজাগ হয়ে ওঠে এবং চেষ্টা করে। দেশের অগ্রযাত্রা ও ভাল-মন্দ ভোটের ওপর নির্ভর করে। ভোটে উত্তেজনা ও উৎকন্ঠা দুটোই আছে। তবু মানুষ থেমে থাকে না। ভোট উৎসবে মেতে ওঠে। ভোট উপলক্ষে সাধারণ জনগণের অনেক প্রত্যাশা। নির্বাচনের প্রতি বাঙালীর দুর্বলতা আছে। তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে যায় ভোটাধিকার প্রয়োগের চেতনা। অন্য যেকোন দিকের চেয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের দিকটায় বাঙালী খুব সচেতন।
জাতীয় নির্বাচন ছাড়াও স্থানীয় নির্বাচন যেমনঃ ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন প্রভৃতি সব নির্বাচনই খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্থানীয় সমস্যাগুলো স্থানীয় ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি সমাধান করবেন। এসব নির্বাচনেও মাঠ সরগরম থাকে। পছন্দের প্রার্থীকে জেতাতে ভোটারদের তোড়জোড় থাকে।
দেশের প্রতিটি অঞ্চল, শহর-নগর, বন্দর-গ্রাম, হাটবাজার, ও পাড়া-মহল্লা ভোটের হাওয়ায় দুলতে থাকে। নিজের ভোট নিজে দেয়ার আনন্দই আলাদা। প্রতিটি ভোটার তার নিজের ভোট নিজে দেয়ার আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। গুণতে থাকে প্রতীক্ষার প্রহর। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত প্রহরের মাহেন্দ্রক্ষণে ভোট দিতে না পারলে ভোটার মনে দারুণ কষ্ট পায়। আর নাগরিক মনের এই বেদনা সহজে দূর হওয়ার মতো নয়।
ভোট একটি বিপ্লব। ভোট একটি প্রতিবাদ। ভোট একটি উৎসব। জনগণ অনেক কথা মুখে বলতে পারে না। তাই তারা তাদের মনের কথা নীরব ভোট বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করে। বিশ্বের প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশে ভোট হয়। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও চর্চা করার উপযুক্ত একটি ক্ষেত্র ভোট। এটি জনগণের মতপ্রকাশের মাধ্যম। অবশ্য ভোটে রাজনীতির প্রভাব বিস্তার থাকে। প্রত্যেক দল তার মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে।
ভোট উৎসব জেগে উঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হচ্ছে চা দোকান। গরম গরম চা কাপে চুমু দিতেই ভোটারদের মধ্যে সেকি বাগবিতণ্ডা! নিজের পছন্দের প্রার্থীকে জেতাতে ভোটারদের সেকি দাপাদাপি! জয়লাভের আশায় মেতে ওঠে সবাই। যার সমর্থন শূন্যের কোঠায় সেও বলে, আমি জিতবো। সবাই আশাবাদী। প্রার্থী ও ভোট কর্মীদের নানামুখী তোড়জোড়ে সরগরম হয়ে ওঠে নির্বাচনী মাঠ। বিভিন্ন ধরনের পোস্টার, লিফলেট ও ফেস্টুনের ছড়াছড়ি চলে সর্বত্র এবং সেই সঙ্গে টাকার ছড়াছড়িও চলে। রাত জেগে ভোট পাহারা দেয়ার ধুম পড়ে যায়। প্রচার-প্রচারণা ও নানা বিচিত্রতায় ভরে ওঠে নির্বাচনী অঙ্গন। ভোটে জেতার জন্য প্রার্থীরা ভোটারদের মাঝে নানামুখী উন্নয়নের ফুলঝুরি ছড়ায়। অনেক ধরনের প্রতিশ্রুতি দেয়। বিগত দিনের ভুল ত্রুটির জন্য ক্ষমা চায়। মানুষ খুব আনন্দ পায়। এতসব আনন্দের মাঝে বেদনাও কম নয়। মূহুর্তের মধ্যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। তুমুল গন্ডগোল হয়। অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। অনেকে আহত। অনেক প্রাণ ঝরে যায়। অনেক সুযোগ সন্ধানী মানুষ আছে, যারা নিজের ব্যক্তিগত শত্রু দমনের জন্য নির্বাচনকেই বেছে নেয়। তাই নির্বাচনে প্রার্থীরা এদিকটায় খুব নজর রাখতে হবে। সহিংসতা এড়িয়ে চলতে হবে। তা না হলে কখনও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আশা করা যায় না।
দেশে গণতান্ত্রিক পন্থায় সব দলের মতামত ও অংশ গ্রহণের ভিত্তিতে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবি রাখে সবাই। কোনো অবস্থাতেই যাতে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, এমনটাই প্রত্যাশা করেন সকল রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটাররা। তারা নির্বাচন কমিশনকে সকল দল মতের উর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষ ভূমিকা নেয়ার আশা প্রকাশ করেন। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইন বিভাগের পক্ষপাতহীন স্বচ্ছতা থাকা চাই। কারণ নির্বাচন কতটা নিরাপদ ও স্বচ্ছ হবে বা আদৌ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে কিনা তা নির্ভর করে নির্বাচন কমিশনের ওপর। কিন্তু যদি সরিষা ক্ষেতে ভূত থাকে, তবে সরিষার ভূত ছাড়াবে কে? একটি গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা একান্ত প্রয়োজন।
দেশের সর্বস্তরের জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পায়। এজন্যই নির্বাচনের গুরুত্ব বেশি। আনন্দ ও বেদনার সংমিশ্রণে এগিয়ে চলে নির্বাচনী কার্যক্রম। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসে উত্তাপ, উত্তেজনা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, সংশয় ও সহিংসতা তত বাড়তে থাকে। নির্বাচনে কমবেশি প্রাণ বিয়োগের ঘটনা ঘটে থাকে।  তাই নির্বাচন এলে এখন সকলের প্রশ্ন জাগে, এবার নির্বাচনে ব্যয় হবে কতো প্রাণ? নির্বাচনে কোন প্রাণ খরচ হোক কিংবা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটুক, এটা কখনও কাম্য নয়। নির্বাচনী মাঠ সকলের জন্য সমান করা সংশ্লিষ্ট তথা কর্তব্যরত কর্তৃপক্ষের একান্ত কর্তব্য। সেই সঙ্গে সাধারণ ভোটারদের ভোট দেয়ার অধিকারটাও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়া উচিত।
রাজনৈতিক দলগুলো কী ধরনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে জনগণের সামনে আসবেন, নির্বাচনী ইশতেহারে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এতে নির্বাচনমুখী রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের সম্ভাবনা থাকে। সব দলের অংশ গ্রহণে একটি সুস্থ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আশা করে ভোটাররা। নির্বাচনকে অর্থবহ করে তোলার দায়িত্ব সবার। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ ভূমিকা নিতে হবে, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে, প্রশাসন দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে, কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকতে হবে, নির্বাচনী পরিবেশ ঠিক রাখতে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, কর্মী ও সমর্থকদের সবাই সচেতন হতে হবে ও জনগণকে সচেতন করতে হবে। সাধারণত নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চললে পরিবেশ অনুকুলে থাকে। আমাদের প্রত্যাশা, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন করা হোক ভোট উৎসব। সুষ্ঠু নির্বাচনই হোক ভোটের প্রকৃত উৎসব। আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে তাকে দেব – এই স্লোগানের প্রকৃত বাস্তবায়নে হোক ভোট উৎসব। গণমানুষের প্রতীক্ষা আর পছন্দের ভোট উৎসবে স্বাধীন ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটুক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি ও প্রাবন্ধিক, লালমোহন, ভোলা। nurulamin911@gmail.com, 01759648626

Facebook Comments


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি