LalmohanNews24.Com | logo

৮ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২৩শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং

ভেলর টিপু সুলতানের দূর্গঃ যেখানে সুলতান পরিবারের রক্তের ইতিহাস

ভেলর টিপু সুলতানের দূর্গঃ যেখানে সুলতান পরিবারের রক্তের ইতিহাস

মোঃ জসিম জনি, ভেলর, তামিলনাডু (ইন্ডিয়া) থেকে: দি সোর্ড অব টিপু সুলতান মনে আছে সবার। বাংলাদেশে আমরা ছোটবেলায় বিটিভির কল্যাণে এই সিরিজটি দেখেছিলাম। হ্যা এবার সেই টিপু সুলতানের দূর্গে আজ প্রবেশ করলাম। যেখানে টিপু সুলতানের পরিবারকে বন্ধি করে হত্যা করা হয়েছিল।

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ এই তামিলনাডু। তামিলনাডু রাজ্যের প্রধান রাজধানী হচ্ছে চেন্নাই। চেন্নাইয়ের পূর্ব নাম মাদ্রাজ। মাদ্রাজ নামটি পরিবর্তিত হয়ে এখন চেন্নাই নাম ধারণ করেছে। চিকিৎসার জন্য আসা বাংলাদেশের মানুষ এই মাদ্রাজের কথাই বলতো। ভেলোর হচ্ছে তামিলনাড়ু রাজ্যের একটা জেলা। চেন্নাই শহর থেকে ১৪৫ কিলোমিটার ও ব্যাঙ্গালোর শহর থেকে ২১১ কিলোমিটার দূরে ভেলর। এই ভেলর শহরেই অবস্থিত মুহীশুরের বাঘ টিপু সুলতানের দূর্গ। ভেলর সিএমসি হাসপাতালে যারা চিকিৎসা করাতে আসেন তারা একবার না একবার টিপু সুলতানের দূর্গে যাবেনই। এই দূর্গ সমন্ধে জানতে ইন্টারনেট গেঁটে যা জানতে পারলাম তা সত্যিই বিস্ময়কর।

দক্ষিণ ভারতের মহীশূর রাজ্যের শাসক ছিলেন টিপু সুলতান৷ পিতা হায়দার আলী মহীশূর রাজ্যের সেনাপতি ছিলেন৷ শ্রীরঙ্গপত্তনম গ্রামে কাবেরী নদীর একটি ব-দ্বীপে নির্মিত একটি দূর্গ থেকে রাজ্য শাসন করতেন৷ বর্তমানে শ্রীরঙ্গপত্তনম গ্রাম দক্ষিণ ভারতের কর্ণটক রাজ্যের মান্ডিয়া জেলার অন্তর্গত৷ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সঙ্গে যুদ্ধে ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে নিহত হন টিপু সুলতান। টিপুর এক সেনাপতি মীর সাদিক বিশ্বাসঘাতকতা করে ব্রিটিশদের সঙ্গে হাত মেলান৷

যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হবার পর টিপুর রাজপ্রাসাদের সব সদস্যকে ইংরেজরা বন্ধী করে নিয়ে অাসে ভেলোর শহরে। শহরের উপকন্ঠে নির্মিত দুর্গে নারী, শিশু সহ তাদের সবাইকে বন্ধী করে রাখা হয়। পরবর্তিতে এখানে তাদের হত্যা করে দুর্গের অনতিদুরেই একটি কবর স্থানে পর্যায়ক্রমে তাদের সবাইকে সমাহিত করা হয়।

ভারতের প্রাচীন ভেলোর শহরের এই দুর্গ সেখানকার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো। ১৭৮০ সালে সুলতান হায়দার আলী ইংরেজ শাসকদের বিতাড়ন অভিযানের অংশ হিসেবে ভেলোর দুর্গ দখল করেন। তবে, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র টিপু সুলতান পিতার ইংরেজ বিতাড়ন যুদ্ধ পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় ১৭৯৯ সালে এক যুদ্ধে প্রাণ হারান।

মাত্র ১৫ বছরের কিশোর! অাজকের যুগ হলে নবম শ্রেনীর পাঠ্যবই নিয়ে ব্যাস্ত থাকতেন। অথচ তখন তিনি যুদ্ধের ময়দানে। হ্যা তিনি মুহীশুরের বাঘ টিপু সুলতান। পিতা হায়দার অালী নিজের যোগ্যতাবলে সেনাপতি থেকে মহীশুর তথা অাজকের কর্নাটকের শাষক হন। ১৯৬৫ সালে মালাবার অভিযানে মাত্র ১৫ বছরের কিশোরপুত্র টিপু সুলতানের সাহস অার রণকৌশল দেখে তাজ্জব হয়ে যান পিতা হায়দার অালী। তারপর জীবনের পুরোটা সময় কেটেছে যুদ্ধের ময়দানে। একদিকে মারাঠা শক্তি, অন্যদিকে নিজাম। তারচেয়ে ও বড় শত্রু ইংরেজ। পিতা পুত্র মিলেই একের পর এক হামলা চালিয়েছেন ইংরেজদের উপর। ১৭৮২ সালে যুদ্ধে অাহত পিতা যখন মৃত্যু সয্যায় তখনও টিপু সুলতান ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানে। পিতাকে শেষবারের মত একনজর দেখতেও পারেন নি!

১৭৫৭ সালে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ্দোল্লার পতনের পর ইংরেজরা যখন একের পর এক রাজ্য দখল নিতে শুরু করে। দুর্বল রাজ্য প্রধানরা ইংরেজ অাক্রমনে খড়কুটোর মত ভেসে যেতে লাগলো। তখন প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন ব্যাঘ্র খ্যাত মহীশুরের টিপু সুলতান। কিন্তুু শেষ রক্ষা হয় নি। ১৭৯৯ সালে চতুর্থ ও শেষ মহীশুর যুদ্ধে ইংরেজদের কাছে পরাজিত টিপু সুলতানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। টিপু সুলতানের এ পরাজয়ের পর পুরো দক্ষিন ভারত ইংরেজদের করায়ত্ব হয়।

বাঘ অার টিপু সুলতান যেন একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। তার অামলে রাজ্যের পতাকায় কানাড়ি ভাষায় লেখা থাকতো ” বাঘ ই ইশ্বর “। তিনি বলতেন অামি শেয়ালের মত হাজার বছর বাচতে চাই না, বাঘের মত এক মুহুর্ত বাচতে চাই “। তার সিংহাসন, রাজ প্রাসাদ সবখানে বাঘের মাথার মুর্তি শোভা পেতো। পোষাক পরতেন বাঘের মত ডোরাকাটা। রাজ্যের সৈন্যদের পোষাক ও ছিলো ডোরাকাটা। তলোয়ারের হাতল সহ সব যুদ্ধাস্ত্রে থাকতো বাঘের মোটিফ। এমনকি তিনি নিজেই প্রাসাদে বাঘ পালতেন, তার শোবার ঘরের সামনের খাচায় ও ছিলো দুটো বাঘ। টিপু নামের অর্থ ও বাঘ। অার ইংরেজদের কাছে তিনি ছিলেন বাঘের ন্যায় মুর্তিমান অাতংক।

ফলে টিপু সুলতানের অাজন্ম শত্রু ইংরেজরাই তাকে “মহীশুরের বাঘ” খেতাবে ভুষিত করেছিলো। টিপু সুলতানের ছিলো ৪ স্ত্রী, ১৫ পুত্র, ৮ কন্যা। সবাইকে ভেলরের এই দূর্গে হত্যা করা হয়। এখনো দুর্গের দেয়ালে উঠলে দর্শনার্থীরা অনুভব করতে পারে সেই সব বন্ধী নারী পুরুষের অার্তচিৎকার। দুর্গের দেয়ালের প্রতি কোনায় কোনায় সুলতান আর সুলতানাদের স্বপ্নের অপমৃত্যুর স্পষ্ট ছায়া দেখতে পাওয়া যায়।

Facebook Comments


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি