LalmohanNews24.Com | logo

২রা শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৭ই জুলাই, ২০১৯ ইং

বাসে নারী নির্যাতন

বাসে নারী নির্যাতন

নুরুল আমিন:  সময়ের সঙ্গে সভ্যতার অনেক পরিবর্তন হয়েছে, অনেক উন্নত হয়েছে। কিন্তু নারীর প্রতি সহিংসতা কমেনি। বরং তা নতুন রূপ নিচ্ছে। প্রতিনিয়ত পথে-ঘাটে, হাটবাজারে, শহরে, বাড়িতে ও কর্মস্থলে নারীরা অশ্লীলতার শিকার হচ্ছেন। এমনকি চলন্ত বাসেও নারীরা নিরাপদ নয়। গণপরিবহনে নারী নির্যাতন, ইভটিজিং, শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ, ধর্ষণের ভিডিও ধারণ ও হত্যাকাণ্ডের মত জঘন্য ঘটনা সেই বর্বর যুগকেও হার মানায়। বাসে নারীযাত্রী নাজেহাল হওয়া, বিপন্ন ও ভোগান্তির শিকার হওয়া সত্যি উদ্বেগজনক।
আমরা অনেক আগেই অন্ধকার যুগ পেরিয়ে এসেছি। আমরা এখন সভ্য যুগের বাসিন্দা। কিন্তু তা সত্বেও মানুষরূপী কিছু অমানুষের পশুবৃত্তি ও নৃশংস আচরণ যেন আমাদেরকে অন্ধকার যুগের দিকে ঠেলে নিচ্ছে। যা কখনও মেনে নেয়ার মত নয়। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে নারী বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি একান্ত প্রয়োজন। সেই সঙ্গে বদলাতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি।

গণপরিবহনের কন্ট্রাক্টর, হেল্পার, ও চালকদের অশুভ চক্র অহরহ নারী নির্যাতন ও যৌন হয়রানি করে চলেছে। এমনকি পরিবহন শ্রমিক ও এক শ্রেণির অসাধু দুষ্ট যাত্রীর কাছে প্রতিনিয়ত নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। দিন দিন এ ঘৃণ্য অপরাধ বেড়ে চলেছে। চলন্ত গাড়িতে নারীর ওপর নিপীড়ন কোনভাবেই কমছে না। দুষ্টরা বাসে যাত্রী উঠা-নামার সময় কৌশলে নারীর গায়ে হাত দেয়, টিকেট কাটার নামে বার বার বাসের ভেতরে গা ঘেঁষে আসা যাওয়া করে। নারী যাত্রীকে একা পেলে সম্ভ্রমহানি করে। তাই যাত্রা পথে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন করে ভাবতে হবে। জরুরী ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এসব বর্বরদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। নারীর প্রতি আমাদের মানবিক হতে হবে।

অনেক সময় নারীরা নির্যাতিত হওয়ার পরেও বিভিন্ন কারণে তা প্রকাশ করেন না। আবার গাড়িতে নির্যাতিত হওয়ার ঘটনায় অভিযোগ কোথায় দেবেন তা ঠিক করতে পারেন না। আইনি জটিলতায় বিপাকে পড়ার ভয়তে অনেক সময় সাংবাদিকরা নিউজ করেন না। এতে অনেক ঘটনা চাপা পড়ে যায়। কিন্তু তারপরেও কিছু ঘটনা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, হৃদয়কে প্রকম্পিত করে।
দেশে আয়ের একটি বিরাট অংশ নারীদের  অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে আসে। আসা যাওয়ার নিরাপত্তা না পেলে শ্রমের প্রতি নারী শ্রমিকদের আগ্রহ কমে যেতে পারে। আর এই প্রভাব এসে পড়বে আমাদের অর্থনীতির ওপর। তাই বাসে নারীরা কতটা নিরাপদ তা ভাবা দরকার। ছাত্রী, শিক্ষিকা, নার্স, গার্মেন্টস কর্মী, ডাক্তার, গৃহিনী কেউই বাদ পড়েন না বাসে নির্যাতন থেকে। বাসে নারী নির্যাতন বন্ধের জন্য আইন থাকা জরুরী।

নারী নিগ্রহের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে অনেকেই  মাদকাসক্ত। নৈতিক, সামাজিক ও মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের কারণে এদের কাছে কোন নারী নিরাপদ নয়। নারী দেখলে অল্পতেই এদের সুরসুরি জাগে, লোলুপতা বাড়ে এবং এরা খুব বেসামাল হয়ে উঠে। নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে নারীদের সংযত হওয়া উচিত। বেপর্দায় চলাফেরা ক্ষতির কারণ। রাতে কখনও কোন নারী যানবাহনে একা চলাচল করা ঠিক নয়। মনে রাখতে হবে, বাসে উঠে ঘুমানো যাবে না। দুর্বলতা প্রকাশ করা যাবে না। যাত্রী কম দেখলে বাসে উঠা ঠিক হবে না। এতে বিপদে পড়ার ঝুঁকি থাকে। বাস গন্তব্যে পৌঁছলেই নামতে হবে।

পরিবহনে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ নেয়া জরুরী। যেমন : অভিযোগ দেয়ার বিষয়টি সহজ করতে হবে। পরিবহনের চালক ও হেল্পারসহ সকল স্টাপ ও যাত্রীর সচেতনতা বাড়াতে হবে। তাদের নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। মাদকমুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। গাড়ির কর্মচারীদের জন্য  প্রশিক্ষণ ও মোটিভেশন প্রোগ্রাম করতে হবে। নারীর জন্য নির্ধারিত সিটে অন্য যাত্রী বসা বন্ধ করতে হবে। সিট খালি না থাকলে নারী যাত্রী, এমনকি পুরুষ যাত্রীও উঠানো বন্ধ করতে হবে। পরিবহনে কমপক্ষে দুইজন পুলিশ নিরাপত্তা জন্য রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

জরুরী হেল্পলাইনের একটি সহজ নম্বর সার্বক্ষনিক সেবার জন্য চালু করতে হবে। যাতে চলন্ত গাড়িতে বসে যে কোন সময় যে কোন স্থান থেকে কল করলে বিপদগ্রস্ত যাত্রী নিকটস্থ থানার তাৎক্ষণিক সহযোগিতা পায়। বাসে নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা করতে হবে এবং অপতৎপরতা বন্ধের নীতিমালা করতে হবে। রুট অনুযায়ী মোবাইল কোর্টের ও থানার ফোন নম্বর এবং সতর্কতামুলক নীতি বাক্য গাড়িতে প্রকাশ্যে লিখে রাখতে হবে। সেই সঙ্গে গাড়ির নাম ও নম্বর লিখতে হবে। নারীদের জন্য আলাদা বাস ও নারী কর্মচারীর ব্যবস্থা করতে পারলে ভাল হয়।

প্রতিটি বাসে বাধ্যতামূলক সিসি ক্যামেরা স্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে। নারী নির্যাতন বন্ধের জন্য কঠোর আইন একান্ত প্রয়োজন। নারী নির্যাতনকারী ও ধর্ষকদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং দ্রুত বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। যা দেখে অন্য অপরাধীরাও সতর্ক হবে এবং নিজেদের শুধরে নেবে। নারী নির্যাতন বন্ধের জন্য আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ ব্যতীত এসব নিয়ম ও নীতিমালা গ্রহণ ও কার্যকর করা সম্ভব নয়।  সরকার, মানবতাবাদী সেবামূলক সংগঠন তথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ ও কঠোর অবস্থান নিলে এবং সেই সঙ্গে জনগণ আন্তরিকভাবে সচেতন হলে নারী নির্যাতন বন্ধ করা যাবে আশা করা যায়।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক, লালমোহন, ভোলা। nurulamin911@gmail.com, 01759648626.

Facebook Comments


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি