LalmohanNews24.Com | logo

৮ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২৩শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং

বাংলাদেশের ইতিহাসের উত্তাল ও রক্তাক্ত কয়েকটি দিন

বাংলাদেশের ইতিহাসের উত্তাল ও রক্তাক্ত কয়েকটি দিন

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পর দেশে এক ভয়ঙ্কর বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এর পর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দেশে কয়েকটি রক্তাক্ত ঘটনার জন্ম হয়েছিল।

বাংলাদেশের ইতিহাসের উত্তাল ওই সময়কালের নানা ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিবিসি বাংলা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের সূচনা

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর এর সঙ্গে যুক্ত মেজরদের সঙ্গে নিয়ে খন্দকার মোশতাক আহমেদ প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতাগ্রহণ করেন।

তবে খন্দকার মোশতাক সামনে থাকলেও হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত সেনা কর্মকর্তারা ছিলেন প্রবল ক্ষমতাশালী।

সেই সময় বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করা হলেও শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন মেজর বঙ্গভবন থেকে সেনাবাহিনীর অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করছিলেন।

এর তিন মাস পরেই নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই যে অভ্যুত্থান এবং পাল্টা অভ্যুত্থানটি হতে যাচ্ছিল তার প্রেক্ষাপটটি তৈরি হয়েছিল ক্ষমতার এই রক্তাক্ত পালাবদলের মধ্য দিয়ে।

অভ্যুত্থানের কারণ নিয়ে বেশ কিছু ব্যাখ্যা থাকলেও সেনাবাহিনীর তৎকালীন অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর থেকেই সেনাবাহিনীতে যে বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়েছিল, তার একটি হচ্ছে- নভেম্বরের অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান।

জুনিয়র সেনা কর্মকর্তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন সেনাবাহিনীর মধ্যে অনেকেই গ্রহণ করতে পারেননি। এর বাইরে আরেকটি দ্বন্দ্বও ছিল, যার সূচনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই।

সেনাবাহিনীর ভেতরে অন্তর্দ্বন্দ্ব

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তিনজন অফিসার ব্যাপক পরিচিতি পান। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, যুদ্ধের পর থেকে সেনাবাহিনীর মধ্যে এই তিনজন অফিসারের তিনটি প্রভাব বলয় তৈরি হয়েছিল।

ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন তখন ছিলেন ঢাকায় ৪৬ ব্রিগেডের মেজর পদমর্যাদার স্টাফ অফিসার।

যে তিনজন সেনা কর্মকর্তার কথা তিনি বলছেন, তারা ছিলেন জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশারফ ও কেএম শফিউল্লাহ।

এই দ্বন্দ্বটা আগেও ছিল, কিন্তু সেটি প্রকট হল ১৫ আগস্টের পর। জেনারেল শফিউল্লাহ মোটামুটি বের হয়ে গেলেন, জেনারেল জিয়া ইন হলেন। আবার জেনারেল জিয়া ইন হওয়ায় তার এবং ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফের মধ্য দ্বন্দ্বটা আরও বাড়ল’।

১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের দিন দশেক পর সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয় মেজর জেনারেল কেএম শফিউল্লাহকে।

বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলছিলেন, এর পর থেকে তিনি ‘সিনে ছিলেন না’ এবং অনেকটা গৃহবন্দি হিসেবেই সেনাপ্রধানের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।

নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহকে খালেদ মোশারফ এবং জিয়াউর রহমানের মধ্যকার দ্বন্দ্বের একটি ফল হিসেবে দেখছেন কেএম শফিউল্লাহ-‘ভবিষ্যৎ অন্ধকার মনে করে খালেদ মোশারফ জিয়াউর রহমানকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। তাকে সরিয়ে দিয়ে হাউস এরেস্টও করে ফেলেছিল এবং নিজেই চিফ অব স্টাফের র‍্যাংক পরল।’

‘ওইটা শেষ পর্যন্ত সে আর থাকতে পারেনি এবং সেই ঘটনাটাই লিংগার করে ৭ তারিখে জিয়াউর রহমান তাহেরকে সঙ্গে নিয়ে খালেদ মোশারফের ওই গ্রুপটাকে সরিয়ে দেয়।’

তিনি বলছিলেন, সিনে না থাকলেও সেনাবাহিনীর মধ্যে যে একটি উত্তেজনা রয়েছে, সেটি তিনি টের পাচ্ছিলেন এবং খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থানটির পটভূমিও ছিল সেখান থেকেই।

অভ্যুত্থান এবং ৩ নভেম্বর জেল হত্যাকাণ্ড

নভেম্বরের ৩ তারিখের প্রথম কয়েকটি প্রহরে বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দেয়ার মতো দুটি ঘটনা ঘটে-একটি অভ্যুত্থান এবং ঢাকা কারাগারে একটি হত্যাকাণ্ড।

মধ্যরাত পার হওয়ার পরই খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থানে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে বন্দি করা হয়।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভবন ঘেরাও করার জন্য যায় একটি ইনফ্রেন্টি ইউনিট, রেডিও স্টেশন দখল করে নেয় আরেকটি সেনা দল।

ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন বলছিলেন, বঙ্গভবন ঘিরে তখন এত বেশি সেনা সমাবেশ হয়েছিল যে ভেতরে থাকা মেজর ডালিম ও মেজর নুরসহ সেনা কর্মকর্তারা আর পাল্টা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। আর এরই মধ্যে আকাশে যুদ্ধবিমানও উড়তে দেখা যায়।

‘বঙ্গভবনের ওপর দিয়ে যখন দুটা কি তিনটা ফাইটার জেট উড়ে গেল, তখন তারা বুঝল যে তাদের হাতে আর সময় নেই, তাদের আত্মসমর্পণ করতে হবে।’

সেদিন সকাল থেকেই একটি সমঝোতার চেষ্টা চলছিল। মেজর ডালিম ও মেজর নূর বেশ কয়েকবার ক্যান্টনমেন্টে এসে খালেদ মোশারফের সঙ্গে দেখা করেন। দিনভর নানা দেন-দরবারের পর সন্ধ্যায় ঠিক হল তাদের দেশ থেকে চলে যেতে দেয়া হবে।

সেদিনই রাতে একটি এয়ারক্রাফটে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার সঙ্গে জড়িত কয়েক সেনা কর্মকর্তার একটি বিমানে থাইল্যান্ডে চলে যেতে দেয়া হয়।

এদিকে সেই রাতেই কেন্দ্রীয় কারাগারে চলে একটি হত্যাকাণ্ড।

কয়েকজন সেনাসদস্যের হাতে খুন হন ১৯৭১ সালের প্রবাসী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, তৎকালীন সরকারের অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচএম কামরুজ্জামান।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের তৎকালীন জেলার আমিনুর রহমান বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, রাত ১টা থেকে দেড়টার দিকে একটি পিকআপে করে কিছু সেনাসদস্য জেলগেটে উপস্থিত হন। এ সময় আইজি প্রিজনের ফোন পেয়ে তিনিও সেখানে যান। এর কিছুক্ষণ পর তার কার্যালয়ের টেলিফোনটি বেজে ওঠে।

‘টেলিফোন ধরলেই বলল যে, প্রেসিডেন্ট কথা বলবে আইজি সাহেবের সঙ্গে। কথা শেষ করার পরই আইজি সাহেব বললেন যে, প্রেসিডেন্ট ফোন করেছিল। বলল যে আর্মি অফিসাররা যা চায় সেটা তোমরা করো।’

এর পর কারা মহাপরিদর্শক আমিনুর রহমানের হাতে চারজনের নাম লেখা একটি চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে বলেন- এদেরকে এক জায়গায় করো।

‘সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দীন সাহেব ছিলেন একরুমে আর অন্য দুজন ছিলেন অন্য রুমে। তো অন্য রুম খুলে আনলাম।’

‘আমি ভাবলাম কথাবার্তা বলবে তো পরিচয় করিয়ে দিই। মনসুর আলী সাহেব ছিলেন সর্বদক্ষিণে। তাকে পরিচয় করানোর জন্য মাত্র ম.. বলা শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই গুলি করে দিল। গুলি করেই তারা খোলা গেট দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল।’

সাখাওয়াত হোসেন বলছিলেন, ওই জেলহত্যার ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে জানাজানি হয়নি। ঘটনাটি সেনা অফিসারদের কাছে পৌঁছে ৪ নভেম্বর সকালের দিকে।

সক্রিয় হয়ে ওঠে জাসদের গণবাহিনী

৩ নভেম্বরের পরের কয়েকটি দিন কার্যকর দেখা যায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা জাসদের গণবাহিনীকে। কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বাধীন এ গণবাহিনী পরবর্তী অভ্যুত্থানে একটি মূল ভূমিকা পালন করে।

কর্নেল তাহেরের ভাই এবং গণবাহিনীর তৎকালীন ঢাকা মহানগর প্রধান অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, জিয়াউর রহমানের থেকেই খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থানের খবরটি জানতে পারেন কর্নেল তাহের।

তিনি বলেন, ৩ নভেম্বর ভোররাতের দিকে জিয়াউর রহমান ফোন করেন কর্নেল তাহেরকে।

‘জিয়াউর রহমান বলেন, তাহের ওরা আমাকে বন্দি করেছে। আমার জীবন বিপন্ন।’

যদিও জিয়াউর রহমানের মূল টেলিফোন লাইনটি কেটে দেয়া হয়েছিল, তবে একটি প্যারালাল লাইন সচল থাকায় তিনি টেলিফোন কলটি করতে পেরেছিলেন বলে জানান অধ্যাপক হোসেন।

কর্নেল তাহের সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন ১৯৭২ সালে। এর পর থেকে তিনি সরাসরি জাসদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। এরই মধ্যে গঠিত হয় সেনাসদস্যদের নিয়ে সৈনিক সংস্থা এবং গণবাহিনী, যদিও বিষয়গুলো তখনও প্রকাশ্য ছিল না।

অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলছেন, নভেম্বরের ৩ তারিখেই কর্নেল তাহের নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসেন এবং এর পর থেকেই সৈনিক সংস্থার সদস্যসহ সেনাসদস্যরা তার সঙ্গে দেখা করতে শুরু করেন।

খালেদ মোশারফ ক্ষমতা হাতে নিলেও দ্রুতগতিতে কোনো সরকার গঠন করতে পারেননি। এর মধ্যেই অনেকটা অগোচরে ঘটে যায় জেল হত্যাকাণ্ড। এসব মিলিয়ে অনেকটা ‘সরকারহীন’ অবস্থার মধ্যে ছিল কয়েকটি দিন।

‘এর মধ্যে জাসদ, গণবাহিনী এবং তাহের সৈনিকদের সঙ্গে ক্রমাগত আলোচনা চালিয়ে যান’বলেন অধ্যাপক হোসেন।

নভেম্বরের ৫ ও ৬ তারিখে গণবাহিনী আরও সক্রিয় এবং সংগঠিত হয়ে উঠতে শুরু করে। কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা চলতে থাকে।

সাখাওয়াত হোসেন বলছেন, গণবাহিনী যে একটি কিছু করতে যাচ্ছে সেটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে ৬ তারিখ বিকালে, যখন ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে গণবাহিনীর নামে একটি লিফলেট ছড়ানো শুরু হয়।

ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন বলছিলেন, লিফলেটের একটি কপি তিনিও দেখেছিলেন।

লিফলেটে খালেদ মোশারফ, শাফায়াত জামিল ও কর্নেল হুদাকে ‘ভারতীয় চর’বলে প্রচার করা হয়।

এরই মধ্যে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে প্রেসিডেন্ট হিসেব শপথ পড়ানো হয়। কিন্তু প্রশাসন এবং সেনাবাহিনীতে ঠিক কী হচ্ছে সে নিয়ে বেশ কিছু অস্পষ্টতা রয়ে গিয়েছিল।

‘একটা ক্যু-তে যে হোমওয়ার্ক হয় সেটি ছিল না। যে যার মতো করে চলছিল। এই বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে যখন ৬ তারিখ রাতে এ লিফলেট জওয়ানদের মধ্যে ছড়ানো হল, তখনই সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল যে গণবাহিনী নামে একটি ফোর্স ক্যান্টনমেন্টের ভেতর কাজ করছে।’

এদিকে গণবাহিনীর বিদ্রোহের মূল পরিকল্পনাটি হয় ৬ তারিখ সন্ধ্যায়।

‘বিশাল একটি হলরুমের মধ্যে সেনাবাহিনীর প্রায় ৬০-৭০ জন সদস্য ছিলেন। সেখানে গণবাহিনীর নেতৃত্বস্থানীয়দের মধ্যে কর্নেল তাহের, তার পরের অবস্থানেই ছিল হাসানুল হক ইনু এবং আমি নিজেও ছিলাম। সেখানেই প্রত্যেকের কাজ ভাগ করে দেয়া হয়’, বলেন অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন।

তবে তিনি বলেন, দলীয়ভাবে জাসদের সিদ্ধান্ত ছিল প্রস্তুতি নিয়ে ৯ নভেম্বর অভ্যুত্থান হবে। কিন্তু ক্যান্টনমেন্টের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় সেই রাতেই বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

৭ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থান

৭ নভেম্বর দিবাগত রাতেই শুরু হয়ে যায় পাল্টা অভ্যুত্থান। যার পুরোভাগে ছিলেন সেনাবাহিনীর জওয়ানরা।

কেএম শফিউল্লাহ বলছিলেন, সৈনিকদের মধ্যে স্লোগান উঠছিল ‘সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই, জেসিও ছাড়া র‍্যাংক নাই’।

‘সিপাহিদের মধ্যে একটা হতাশা সৃষ্টি হয়েছিল। তারা ভাবছিলেন অফিসাররা তাদের ব্যবহার করে উচ্চপদে উঠছে কিন্তু তাদের কথা কেউ চিন্তা করে না।’

সেই রাতেই মুক্ত করা হয় জিয়াউর রহমানকে।

৭ তারিখ রাতে ক্যান্টনমেন্টে গোলাগুলির শব্দ শুরু হয়। কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করে বিদ্রোহীরা।

‘জিয়াউর রহমানকে গণবাহিনী বের করতে পারেনি, তাকে রাতেরবেলা বের করল ফোর বেঙ্গল আর টু ফিল্ড রেজিমেন্ট।’

সাখাওয়াত হোসেন বলছিলেন, পর দিন সকালেই তিনি গণবাহিনীর সদস্য এবং কিছু সেনাসদস্যসহ সেনানিবাসে কর্নেল তাহেরকে দেখতে পান। এর পর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কথা বলার সময় একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে কিছু উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ও হয়।

‘তাহের চাচ্ছিল জিয়াউর রহমান রেডিওতে গিয়ে গণবাহিনীর ১৩ দফা ঘোষণা করবেন এবং বলবেন যে তিনি এসব দাবি মেনে নিয়েছেন। এর পর সিপাহি-জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে সেই দাবি মেনে নেয়ার কথা জানাবেন।’

‘কিন্তু তিনি যাননি। উনি তার আগেই তার ভাষণ রেকর্ড করে রেডিওতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এখানেই তাহের ও জিয়ার বিচ্ছেদ।’

ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন বলছেন, ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের সময় জওয়ানদের সঙ্গে অনেককে অস্ত্রসহ বেসামরিক পোশাকেও অংশ নিতে দেখা গিয়েছিল।

তবে ওই অভ্যুত্থানে গণবাহিনী তাদের বেসামরিক সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করতে পারেনি বলছেন অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন।

তিনি বলছেন, জাসদ যে উদ্দেশ্য নিয়ে বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল সেটি ব্যর্থ হওয়ার এটিও একটি কারণ।

‘কথা ছিল সৈনিকরা জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে এলিফেন্ট রোডে নিয়ে আসবে। সেখানেই একটি বাসায় কর্নেল তাহেরসহ জাসদের নেতারা অবস্থান করছিলেন। কিন্তু তারা সেটা করতে পারেনি।’

অধ্যাপক হোসেন বলছেন, গণবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত সৈনিকরাই জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেছিল।

‘জিয়াউর রহমান তাদেরকে বলেছিলেন যে, কর্নেল তাহের তার বন্ধু এবং তাকেই যেন তারা এখানে নিয়ে আসে। এভাবে তারা কিছুটা প্রতারিতও হয়েছিল। তাদের ওপর যে সুনির্দিষ্ট যে নির্দেশ ছিল, সেটা তারা করতে পারেনি।’

এদিকে ৭ নভেম্বর সকালেই কর্নেল কেএন হুদার সঙ্গে ঢাকায় রংপুর থেকে আসা ১০ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে হত্যা করা হয় খালেদ মোশাররফ, কর্নেল কেএন হুদা এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল এটিএম হায়দারকে।

খালেদ মোশারফকে কার নির্দেশে এবং কেন হত্যা করা হয়েছিল তার কোনো সুনির্দিষ্ট তদন্ত হয়নি এবং সেই হত্যার কোনো বিচারও এখনও পর্যন্ত হয়নি।

ক্ষমতার কেন্দ্রে জিয়াউর রহমান

আনোয়ার হোসেন বলছেন, জিয়াউর রহমানের রেডিও ভাষণের পর অভ্যুত্থানে গণবাহিনীর ভূমিকা চাপা পড়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা জন্মে যে, এটি পুরোপুরিই জিয়াউর রহমানের অভ্যুত্থান।

৭ নভেম্বরের পর ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন জিয়াউর রহমান।

এর কিছু দিন পর ২৪ নভেম্বর কর্নেল তাহেরকে গ্রেফতার করা হয় এবং ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে সামরিক আদালতে তাকে ফাঁসি দেয়া হয়।

দীর্ঘদিন পর ২০১৩ সালে সুপ্রিমকোর্ট এক রায়ে কর্নেল তাহেরের সেই বিচারকে অবৈধ হিসেবে ঘোষণা করেন।

১৯৮১ সাল পর্যন্ত উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরবর্তী সময় প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জিয়াউর রহমান।

১৯৮১ সালের মে মাসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তাকে হত্যা করা হয়।

Facebook Comments


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি