LalmohanNews24.Com | logo

১৩ই আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২৬শে জুন, ২০১৯ ইং

নুসরাতের অপেক্ষায়: আইসিইউয়ের সামনে ছুটছেন ভাই, শুধুই কাঁদছেন মা!

নুসরাতের অপেক্ষায়: আইসিইউয়ের সামনে ছুটছেন ভাই, শুধুই কাঁদছেন মা!

‘বোনটা আমার কখনও কারও ক্ষতি করেনি। সবার উপকার করে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। আমি বড় ভাই হলেও আমার সঙ্গে তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। অথচ আমার আদরের বোন এখন মৃত্যুশয্যায়। মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে ওরা আমার বোনটাকে হাত বেঁধে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিলো।’

বুধবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আইসিইউয়ের সামনে কান্নজড়িত কণ্ঠে এসব কথা বলেন ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান।

শরীরের ৮০ ভাগের বেশি পুড়ে যাওয়া বোনকে আইসিইউতে রেখে হাসপাতালের বাইরে পাগলের মতো পায়চারি করছেন নোমান। কারও সঙ্গেই স্থির হয়ে কথা বলতে পারছেন না। একের পর এক ফোন কলে জবাব দিচ্ছেন- ‘বোনের অবস্থা ভালো না, আগের মতোই’।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অগ্নিদগ্ধ নুসরাতের দায়িত্ব নিয়েছেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু নুসরাতের শারীরিক অবস্থা সিঙ্গাপুরে নেওয়ার মতো নয়। তাই এখানকার ৯ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড প্রতিদিন সিঙ্গাপুরের ডাক্তারদের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা দিচ্ছে নুসরাতকে।

ঢাকা মেডিকেলের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আইসিইউতে দোতলায় ৫ নম্বর রেড ইউনিটে চিকিৎসাধীন নুসরাত। একটু দূরেই সিঁড়ির কাছে মাদুর পেতে বসে আছেন মা শিরিন আক্তার। কালো বোরখা পরা, মুখে নেকাব। মেয়ের কথা তুলতেই অঝোরে কাঁদতে শুরু করলেন। পাশে থাকা নুসরাতের মামা সৈয়দ সেলিম তার বোনকে সামলাতে পারছিলেন না। পরে নুসরাতের বাবা এ কে এম মূসা এবং ভাই নোমান এসে শিরিন আক্তারকে শান্ত্বনা দিয়ে নিচে নিয়ে যান।

আইসিইউয়ের সামনে নুসরাতের বড় ভাই নোমান বলেন, গত ২৭ মার্চ সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা পিয়ন দিয়ে আমার বোনকে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে কু-প্রস্তাব দেয় এবং শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে। আমার বোন বাড়ি এসে মাকে একথা জানালে মা সঙ্গে সঙ্গে মাদ্রাসায় চলে যান এবং অধ্যক্ষের কাছে ঘটনা জানতে চান। অধ্যক্ষ আমার মাকে অপমান করলে মা ওইদিনই সোনাগাজী থানায় অভিযোগ করেন। এরপর পুলিশ এসে অধ্যক্ষকে আটক করে নিয়ে যায়। ওইদিন থেকেই মামলা তুলে নিতে অধ্যক্ষের লোকজন হুমকি দিয়ে আসছিল।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, এরপর থেকে বোনের নিরাপত্তায় আমি নিজে গিয়ে তাকে মাদ্রাসার কক্ষে পৌছে দিতাম। আবার ছুটি হলে গিয়ে নিয়ে আসতাম। গত ৬ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৯টার সময় বোনকে মাদ্রাসায় নিয়ে যাই। কিন্তু ওইদিন আমাকে গেইট থেকে ভেতরে যেতে দেয়নি দারোয়ান। পরে আমি বাইরে গেলে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর আমার সহপাঠী আবুল কাদের দৌড়ে এসে বলে- রাফির গায়ে আগুন দিয়েছে।

বলতে বলতে চোখে পানি চলে আসে নোমানের। ভারি হয়ে আসে গলা। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন, ‘ছুটে গিয়ে দেখি নুসরাতের অবস্থা খারাপ। সবাই যে যার মতো পানি দিচ্ছে তার শরীরে। সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে তাকে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেই। সেখান থেকে ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে যাই। তারপর সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠায়।’

এ সময় পাশে দাঁড়ানো মামা সৈয়দ সেলিম ভাগ্নের কাঁধে শান্ত্বনার হাত রাখেন। ভাগ্নি নুসরাত সম্পর্কে বলেন, ‘ওর মতো পর্দানশীল মেয়ে কম হয়। এমন একটি মেয়েকেও যৌন হয়রানি করল অধ্যক্ষ। তারপর আগুনে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টা- আমরা কোনভাবেই মানতে পারছি না।’

মামা সৈয়দ সেলিম বলেন, ‘নুসরাত বড় হয়ে বাবার মতো শিক্ষক হতে চেয়েছিল। তার এই স্বপ্নকে যারা কেরোসিন ঢেলে জ্বালিয়ে দিয়েছে তারা ক্ষমা পাবেন না। পাওয়ার যোগ্যও না।’

এসব কথা শুনতে শুনতেই নোমানের ফোনে কল আসে। মেজ ভাই নাহিয়ান আরমান বিদেশ থেকে চলে আসতে চান বোনকে দেখার জন্য। পরে তাকে বুঝিয়ে শান্ত করেন বাবা এ কে এম মূসা।

নোমানরা তিন ভাই, এক বোন। সবার কাছে একটু বেশিই আদরের নুসরাত। বোন লাইফ সাপোর্টে থাকায় ভাইয়েরা তাই পাগলপ্রায়।

মাদ্রাসায় ঘটনা তদন্তে গিয়ে পুলিশ আলামত পেয়েছে কিছু মোড়ানো প্লাস্টিক এবং বোরখার কিছু পোড়া অংশ। নুসরাত নিজেও বলেছে দুর্বৃত্তরা ৪-৫ জন ছিল এবং তারা বোরখা পরা, মুখ ঢাকা ছিল।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বুধবার বলেন, নুসরাতের অবস্থা আগের মতোই আছে। সে এখনও শঙ্কামুক্ত নয়।

গত ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথম পত্র পরীক্ষা দিতে সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে যান নুসরাত। এরপর কৌশলে তাকে পাশের ভবনের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে ৪/৫ জন তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়।

Facebook Comments


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি