LalmohanNews24.Com | logo

৭ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

নীলে ডুবে থাকা দ্বীপে কাটুক ঈদের ছুটি

নীলে ডুবে থাকা দ্বীপে কাটুক ঈদের ছুটি

রাতের খাবার খেয়েই হোটেলের পেছনে চলে গেলাম। সঙ্গে কেউ নেই। আকাশে রূপালি চাঁদ। সূর্য থেকে ধার করা আলোয় আলোকিত চারদিক, পায়ের নিচে বালু, পেছনে আমাদের অবকাশস্থল আর সামনে বঙ্গপোসাগর। আমি দাঁড়িয়ে আছি সেন্টমার্টিন দ্বীপের সমুদ্র সৈকতে। এখানকার সমুদ্র কক্সবাজারের মত গর্জন করে না, তবে শোনায় মুগ্ধতার গান। আমার মতো অনেকেই এই গান শুনতে অকালে এসেছেন এখানে! সুনসান এই নীরবতার মাঝে চন্দ্রস্নাত হয়েছে কেউ, কেউবা আবেশেই মুগ্ধ। গভীর রাত পর্যন্ত চলে আমাদের এই পূর্ণিমার আলোয় জ্যোৎস্না স্নান। এক ফালি পূর্ণিমার চাঁদ, সব গ্লানি মুছে যাক৷ নিদ্রাদেবী যখন পরম মমতায় পৃথিবীটাকে ঘুম পাড়াচ্ছে তখন আমার চোখে ঘুম নেই৷

জীবনানন্দের কবিতার মতো যেন আমার মরিবার হলো সাধ। সুকান্তের কবিতার মতো পূর্ণিমার চাঁদটিকে মনে হলো এক ফালি রুটি৷ আমি ক্ষুধার রাজ্যে চলে গেছি৷ এ ক্ষুধা যে জ্যোৎস্না স্নাত পূর্ণিমা রাতের ক্ষুধা। যত দেখি আমার ক্ষুধা মেটে না। পরিষ্কার আকাশে ধোঁয়াটে তারার মাঝে পূর্ণিমার চাঁদে বুঁদ হয়ে থাকে আমার এই মন। গুনগুনিয়ে উঠি উইনিংয়ের গান-

আঁধারে তুমি পূর্ণিমা চাঁদ
হৃদয়ে আমার সাধনার গোলাপ

চোখে উষ্ণতা তোমার
আবেশ জাগায়
অধরে কোমলতা যেন
মনকে রাঙায়
জীবন জাগানো আলো দিয়েছ তুমি

আঁধারে তুমি পূর্ণিমা চাঁদ
হৃদয়ে আমার সাধনার গোলাপ।

আহ্, সমুদ্র!

ভোরের আলো ফুটলো। বাংলাদেশের শেষ ভূ-সীমানায় আজই শেষ দিন। সাগরে জোয়ার, এখনই ছেঁড়া দ্বীপ যাওয়ার সেরা সময়। রুম গুটিয়ে রওনা হলাম আমরা৷ ছেঁড়া দ্বীপ দেখেই আমরা ৫ জন রওনা দিবো ঢাকার উদ্দেশ্যে। আপাতত হেঁটে ছেঁড়া দ্বীপের উদ্দেশ্যে আমরা। সেন্টমার্টিন গিয়ে এ দ্বীপে না গেলে চলে! সেন্টমার্টিন থেকে ছেঁড়া দ্বীপ স্পিডবোটে যেতে লাগে মিনিট দশেক। তবে ট্রলার হলে ৪০ মিনিট লাগে। হেঁটে লাগবে প্রায় ২ ঘণ্টা। ভাটার সময় অনেকে অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় সাইকেল চালিয়ে ওখানে চলে যান।

দক্ষিণ বিচের নির্জন প্রকৃতির মাঝে কেয়া বন সুশোভিত রাস্তা বুঝতে দিচ্ছে না আমাদের রোদের প্রকোপ। আকাশের নীল আর সমুদ্রের নীল ঠিক আলাদা করা যাচ্ছে না। দুটোই সমান পাল্লা দিচ্ছে চোখ তাতিয়ে দিতে। একটা নারকেলগাছও যে এত সুন্দর লাগতে পারে, সেটা সেন্টমার্টিন না গেলে অজানা থেকে যেত। ঘাটে বাঁধা নৌকো দুলছে ঢেউয়ে ঢেউয়ে। হালকা বাতাস চুল, ঘাড়, কানে সুড়সুড়ি দিয়ে পালাচ্ছে। সারি সারি নারকেলের বাগান দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভুলেই গেলাম পথে লম্বা জার্নির কথা।

ছেঁড়া দ্বীপ যাবার প্রায় পুরো পথেই দেখতে পাবেন অজস্র সাদা কালো প্রবাল, শামুক-ঝিনুক৷ কখনো পাথুরে পথের সঙ্গে চিকচিক করছে সাদা বালি, কেয়া বনের ঝাড় এক মোহনীয় পরিবেশের সৃষ্টি করে৷ আনুমানিক দুই ঘণ্টা হাঁটার পর আমরা দেখা পেলাম ছেঁড়া দ্বীপের৷ ‘চান্দি ফাটা’ রোদে সবাই মোটামুটি কাহিল৷ এখানে ম্যানগ্রোভ বনের সারিতে তাই খানিকটা যাত্রা বিরতি দিলাম সবাই৷ এখানকার সাগর কেমন- আমাদের এ নিয়ে কোনো ধারণা নেই৷

নীলে ডুবে থাকা ছেঁড়া দ্বীপ

ছেঁড়া দ্বীপের স্বচ্ছ পানি দেখে সবাই গোসল করেই কাটিয়ে দিলাম অনেকটা সময়। তারপর ঘুরে ঘুরে সব দেখতে কেটে গেল অনেক সময়। কেয়া গাছের ঝোঁপের অভাব নেই সেখানে। হাঁটতে হাঁটতে প্রবালের উপর অদ্ভুত কী একটা দেখা গেল। একটা পটকা মাছ বোধহয়, জোয়ারে ভেসে এসেছিল। পানি নেমে গেছে, মাছটা পানির অভাবে আর রোদের কারণে চুপসে গেছে। আমাদের একজন পাশে একটা প্লাস্টিকের  কন্টেইনার দেখতে পেয়ে সেটাতে মাছটা নিয়ে ছেড়ে দিলো। সজারুর মতো দেখতে মাছটা একসময় ভেসে দূরে চলে গেল। দ্বীপ ঘুরে দেখার সময় এরকম আরো কয়েকটা মৃত মাছ দেখেছি। বুঝলাম, ওখানে রোজই ঘটে এসব। ছেঁড়া দ্বীপ ঘুরে মাত্র একটা দোকান দেখতে পেলাম। সেটার অবস্থা সেন্টমার্টিনের পুরো উল্টো; মাছের টিকিটিও দেখলাম না। ডিম ভাজি আর নানাধরনের ভর্তা দিয়ে দুপুরের খাবার সারলাম সেখানেই। জিজ্ঞেস করলে দোকানের একটা ছেলে জানাল, দ্বীপটার তিনটা অংশ। আর তার একদম দক্ষিণ দিকটার নাম দারুচিনি দ্বীপ!

ফিরছি! তবে বিশাল বিশাল ঢেউ, স্বচ্ছ, নীলাভ, সবুজ জলরাশির মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম৷ মনটা আমার গাংচিলের মতো উড়ে চলে যেতে চায় এই দিগন্তের নীলিমায়। আহা কী অপূর্ব দৃশ্য! একই পথ দিয়ে আমরা চলে এলাম আবার সেন্ট মার্টিনের মূল ভূ-খণ্ডে৷ অদ্ভুত এক বিষন্নতা চেপে বসলো সবার মধ্যে। এ ক’টা দিন স্বপ্নের মতো কেটেছিল। বিদায় বেলায় তাই বিরহের সুর বেজে ওঠে। তবে ফেরার আগে দারুচিনি দ্বীপে যেতে ভুলিনি। ভ্যানে করে লোকালয়ের মধ্য দিয়ে নারকেল বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। কী দেখতে চলেছি তা অবশ্য অনুমিতই ছিল। দ্বীপের অন্য কোথাও নারিকেল গাছের তেমন উপস্থিতি লক্ষ না করলেও সেখানে অনেক নারকেল গাছ।

ছেঁড়া দ্বীপের কেয়া বন

কারো মন ভালো নেই। ট্রলারে চেপে বসলাম আমরা কজন বিষন্ন মানব। ট্রলার চেপে আমরা ফিরে এলাম আবার টেকনাফ, মনে অজস্র স্মৃতি নিয়ে।

নির্দেশনা

ঢাকা থেকে প্রথমে হানিফ, শ্যামলী, রিলাক্স, তুবা লাইন, গ্রিন লাইন, বাগদাদ, সেন্টমার্টিন পরিবহনের বাসে করে টেকনাফ যাবেন। বাসের ভাড়া নন-এসি ৯০০ টাকা আর এসি ১ হাজার ৪০০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত। শীতকালে জাহাজে করে যাওয়া যায়। টেকনাফ থেকে শিপ এল সিটি কুতুবদিয়া, কেয়ারী সিন্দবাদ, এমভি কাজল, বে-ক্রুজ, গ্রিন লাইন দিয়ে সেন্ট মার্টিন। শিপের ভাড়া ৫৫০ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত রয়েছে। তবে এই ঈদে যেতে হবে ট্রলারে করে। জাহাজ ঘাটের পাশ থেকে ট্রলার ছাড়ে। সাধারণত ট্রলার ও মালবাহী বোট ১৫০-৩৫০ টাকা নেয়। এটা সিজন ও যাত্রীভেদে কম বেশি হয়ে থাকে। সময় লাগে ২-৩ ঘণ্টা।

সেন্টমার্টিনে থাকার জন্য বেশ কয়েকটি উন্নত মানের রিসোর্ট, হোটেল ও কটেজ রয়েছে। মান ভেদে সেখানে জনপ্রতি রাতে ৫০০-২০০০ টাকার মধ্যে যে কেউ থাকতে পারবেন। তবে ঈদে ছুটিতে গেলে দরদাম করে নেবেন!

Facebook Comments


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি