LalmohanNews24.Com | logo

২২শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ৭ই মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

ধর্ষণ: অতীত থেকে বর্তমান

ধর্ষণ: অতীত থেকে বর্তমান

ধর্ষণের মতো জঘন্যতম অপরাধ দিন দিন বাড়ছে। বেড়েছে নারীর প্রতি সহিংসতাও। কঠোর আইন, প্রচার প্রচারণা ও উচ্চ আদালতের নানা ধরনের নির্দেশনার পরও নারীর প্রতি সহিংসতা কমানো যাচ্ছে না। ধর্ষণ যেন একটি সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিচ্ছে। কোন কিছুতেই এই ব্যাধি সারানো যাচ্ছে না। শুধু ধর্ষণের মধ্যেই এই অপরাধ সীমাবদ্ধ নেই। ধর্ষণের পর অপরাধ আড়াল করতে ধর্ষিতাকে অনেক সময় নির্মমভাবে হত্যার ঘটনাও ঘটছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে দেশে। এরমধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে ২৫ সেপ্টেম্বর স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণ। যা নিয়ে এখনো সারাদেশে তোলপাড় চলছে। পৈচাশিক কায়দায় গত ৪ অক্টোবর আরও একটি নারী নির্যাতনের বর্বর ঘটনা প্রকাশ্যে আসায় দেশবাসী রীতিমতো ক্ষুব্ধ। ঘটনাটি ২ সেপ্টেম্বর ঘটলেও ৩২ দিন পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘৃণার ক্ষোভ ঝড়ে পড়ে সারাদেশে। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় গৃহবধূর বসতঘরে ঢুকে তার স্বামীকে পাশের কক্ষে বেঁধে রেখে গৃহবধূকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। এ সময় গৃহবধূ বাধা দিলে তাকে বিবস্ত্র ও বেধড়ক মারধরের দৃশ্য মোবাইলে ভিডিওচিত্র ধারণ করে। একপর্যায়ে ৪ অক্টোবর দুপুরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে এমন বীভৎসতা চোখে দেখা যায় না। গা শিউরে উঠে!

একসময় দেশে অ্যাসিড-সন্ত্রাস একটা বড় সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অ্যাসিড-সন্ত্রাসের কথা এতটা শোনা যায় না। এর কারণ হচ্ছে এর বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে ঘৃণা তৈরি হয়েছে। মানুষ সচেতন হয়েছে। অপরাধীর শাস্তিও হয়েছে। ফলে এই ব্যাধি একেবারে শেষ হয়ে না গেলেও নিয়ন্ত্রণে আছে।

দেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা সারা বছর ধরেই ঘটছে। তবে সব ঘটনা আলোচনায় আসে না। ফলে আমরাও অবগত হই না। কিন্তু পরিসংখ্যান দেখলেই ধর্ষণ বৃদ্ধির উদ্বেগজনক চিত্র আমাদের সামনে উঠে আসে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) সারাদেশের ধর্ষণের ঘটনা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৯৭৫টি। এর মধ্যে গণধর্ষণের ঘটনা ২০৮টি। এ ছাড়া ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ৪৩টি।
২০১৯ সালে এক হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩২ জন। অর্থাৎ, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে দ্বিগুন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিসংখ্যান মোতাবেক প্রতিদিন দেশে গড়ে চার থেকে পাঁচটি প্রকৃত ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। আর বছরে গড়ে নারী ও শিশু ধর্ষণ, নির্যাতনসহ অন্যান্য অপরাধে মামলা হয় ষোল থেকে সাড়ে ষোলো হাজার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানা মাধ্যমে ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশও হচ্ছে। ধর্ষকরা গ্রেফতারও হচ্ছে। তারপরও থামছে না ধর্ষণের মতো অপরাধ। ভাইরাসের মতো সমাজের সকল স্তরে এই ব্যাধি ছাড়িয়ে পড়ছে।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক শুধু নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করেনি, বরং হত্যার পাশাপাশি বাঙালি নারীদের তারা তুলে নিয়ে ক্যাম্পে নিয়মিত ধর্ষণ করতো! সেই বীবৎসতা ২০০১ সালের পর আবার চাঙ্গা দিয়ে ওঠে। ২০০১ সালে নির্বাচনের পরে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। নৌকায় ভোট দেয়ার অপরাধে পুরো গ্রাম অবরুদ্ধ করে অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ শত শত নারীকে ধর্ষণ-নির্যাতন করা হয়েছে। ভোটের এক সপ্তাহ পর সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার পূর্ব দেলুয়া গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের পূর্ণিমা রাণী ধর্ষণ মামলার ঘটনা সারা দেশে আলোচিত ছিল। ভোলা জেলার লালমোহনেও শিশু রিতা রানী থেকে শুরু করে গৃহবধু সেফালী, সুজাতা, বিষ্ণুপ্রিয়াসহ বহু হিন্দু সম্প্রদায়ের নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট দিনাজপুরে ইয়াসমিন ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় আন্দোলনরত জনতার ওপর গুলি চালিয়ে পুলিশ ৭ জনকে হত্যা করেছিল। সেইসব দুঃসহ স্মৃতি এখনো তারা করে ঘটনার শিকার পরিবারগুলোর।

রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী নির্যাতন কমানোর ক্ষেত্রে ক্ষমতায়নের ভারসাম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীদের নিয়ে আসছেন। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা এখন অনেক বেড়েছে। প্রশাসনে সচিব থেকে ডিসি-ইউএনও পর্যায়ে এখন নারীরা প্রাধান্য পাচ্ছে। পুলিশের মাঠপর্যায়েও নারী এসপির সংখ্যা বাড়ছে। এটি তিনি করছেন মূলত নারীর ক্ষমতায়নে দেশ ও জাতির প্রতি তাঁর প্রতিশ্রুতি থেকে। তিনি জাতিসংঘে অঙ্গীকার করেছেন ২০৪১ সাল নাগাদ কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ৫০-৫০ এ উন্নীত করার। একই সঙ্গে তিনি নারীর সমতা, ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতি নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অঙ্গীকার নবায়ন ও প্রচেষ্টা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ৫০-এ উন্নীত করেছেন। পাশাপাশি সংসদ নেতা, সংসদীয় উপনেতা, বিরোধীদলীয় নেত্রী ও স্পীকার পদে নারী নেতৃত্ব দিচ্ছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ৩০ শতাংশ আসন মহিলাদের জন্য নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে। আর জনসেবাতে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর জন্য বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কারণেই নারীরা এখন উচ্চ আদালতের বিচারক, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং আরও অনেক কিছু হয়ে উঠছেন। ২ কোটি নারী কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে নিয়োজিত রয়েছেন এবং ৩৫ লাখেরও বেশি নারী তৈরি পোশাক খাতে কাজ করছেন, যা আমাদের বৃহত্তম রফতানি আয়ের ক্ষেত্র। এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার নারী সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করেছেন। নারীর ক্ষমতায়নে সাফল্যের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী অনেক প্রশংসাও অর্জন করেছে।
তবুও ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ায় দেশ আজ উদ্বিঘ্ন। ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে, পর্নোগ্রাফির বিকাশ। সমাজ পরিবর্তিত হচ্ছে। আজ প্রযুক্তির কারণে অনেক খারাপ জিনিস হাতের নাগালে চলে এসেছে। সবার হাতেই প্রযুক্তি, সবার হাতেই মোবাইল। সর্বত্র পর্নোগ্রাফিতে সয়লাব। এতে আসক্ত হয়ে যুবক, তরুণরা নারীর প্রতি সহিংস হয়ে উঠছে। প্রযুক্তির কারণে মানুষ যেন নীতি, নৈতিকতা, ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা ভুলে না যায়, তা শেখাতে হবে। এক্ষেত্রে সবার আগে দায়িত্বটা থাকে পরিবারের। পরিবার নিয়েই সমাজ। ছেলেমেয়েরা যাতে পরিবারের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে পারে, এমন পরিবেশ সৃষ্টি করে রাখা প্রয়োজন প্রতিটি পরিবারের। এতে ছেলেমেয়েদের বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। যখন কোন সন্তান তার পরিবারের কাছে ব্যক্তিগত অভাব বা ব্যক্তিগত বিষয়াদির কথা প্রকাশ করতে না পারে, তখন স্বাভাবিক কারণেই সে বন্ধু বা বান্ধবী বা পরিচিতদের কাছে যায়। আর তখনই তার বিপথগামী বা ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ধর্ষণের মতো অপরাধগুলো সংঘটিত হয় এভাবেই।
নোয়াখালী বেগমগঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র ও সিলেট এমসি কলেজে স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় দেশজুড়ে আন্দোলনের কারণে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধনী আনে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে আইনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে। একইসঙ্গে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১ (গ), ২০ (৭) উপধারা সংশোধন এসেছে। এ আইনের কারণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন দেশবাসী। এই আইন কার্যকর করার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব পালন করতে হবে পুলিশকেই। দেখাতে হবে কঠোর মনোভাব।

আইনে ধর্ষণ মামলার বিচার ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা সম্ভব হয় না। কারণ একজন ধর্ষিতাকে মেডিকেল রিপোর্ট ও পুলিশি তদন্তে প্রমাণিত হতে হয় যে, তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এতে মামলার দীর্ঘসূত্রিতা দেখা দেয়। বিচারিক আদালতের রায়ের পর হাইকোর্টে আটকে যায়, গড়াতে থাকে বছরের পর বছর। সমাজ থেকে ধর্ষণ কমাতে হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করা দরকার। শাস্তি কঠোর হলেও তা যদি বাস্তবায়িত না হয় তাহলে ওই শাস্তি সমাজে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে। বর্তমানে ধর্ষণ যেভাবে সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে তা দূর করতে হলে এসব মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। সমাজের বর্তমান চাওয়া বিবেচনায় নিয়ে মামলাগুলোর জন্য বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে উচ্চ আদালতে আলাদা বেঞ্চ গঠন করা যেতে পারে।

লেখক:
সাধারণ সম্পাদক-লালমোহন প্রেসক্লাব।

Facebook Comments


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি