LalmohanNews24.Com | logo

৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

জেলেদের অবদানের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি দেয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব

বিজ্ঞাপন

জেলেদের অবদানের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি দেয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব

মোঃ জহিরুল ইসলাম, প্রকল্প সমন্বয়কারী, ইকোফিশ প্রকল্প: জাতীসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী চলতি বছর অভ্যন্তরীণ মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় স্থানে উন্নিত হয়েছে । ২০১৭ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৫ম । বর্তমানে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে মাত্র দৃুটি দেশ চীন ও ভারত ।

মৎস্যখাত থেকে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৩ শতাংশ, জিডিপির ৩.৫৭ শতাংশ এবং মোট কৃষি খাতের ২৫.৩০ শতাংশ অর্জিত হয় (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৮) । ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে ৬৯ হাজার মেট্রিক টন মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হয়েছে। ২০১৭ -২০১৮ অর্থ বছরে শুধু ইলিশ উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ টন, ১১টি ইলিশ উৎপাদিত দেশের মধ্যে বাংলাদেশের মধ্যে প্রায় ৭০% ইলিশ উৎপাতি হয়। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ১১ শতাংশ লোক মৎস্য আহরণে প্রত্য জড়িত ।

২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে মোট মৎস্য উৎপাদন ছিল প্রায় ৪১ লাখ ৩৪ হাজার মেট্রিক টন। মাছ বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন খাবারের অন্যতম একটি উপাদান যা প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০% সরবরাহ করে।
জেলে সমাজের সমন্বিত মূল সমস্যা সমূহঃ

১.মাছের উৎপাদন/ আহরণ হ্রাস, অসন্তোষজনক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ঋণ প্রাপ্তির সুযোগের অভাব, সুশাসন সংশ্লিষ্ট সমস্যা সমূহ, উলকূলীয় এলাকায় ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত, বিকল্প আয় বর্ধক কাজের অভাব, জলদস্যু ।
সুপারিশমালাঃ

২.বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জেলেদের বাড়ির ভৌগলিক অবস্থা নির্ধারণ সহ জেলে পরিবারগুলোর একটি তালিকা/ডাটাবেইস তৈরি করতে হবে। এই প্রক্রিয়া কর্তৃপক্ষকে জেলেদের নিবন্ধন এবং পরিচয় নিশ্চিত সংক্রান্ত অনের সমস্যার হাত থেকে রক্ষা করবে। একই সাথে প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর কম খরচে জেলেদের তথ্য হালনাগাদ করা যাবে।জেলেদের এমন ডাটাবেইস হবে সব ধরণের লেন-দেনের মূল ভিত্তি যা সত্যিকার অর্থেই নিয়মিত ভাবে দেখাশোনা করা যাবে। পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে একই প্রক্রিয়ায় জেলেদের নৌকার অবস্থান জানা যাবে, বিশেষ করে ঝুকিপূর্ণ আবহাওয়ার সময়ে।

৩.উপকূলীয় এলাকার মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে পারে এমন একটি ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সুপারিশ করা হল। উপক’লীয় জেলে সম্প্রদায়ের জন্য চলমান ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থা পর্যালোচনা এবং পূনঃনকশা করা প্রয়োজন যেখানে সঞ্চয়ের উপরে বেশি গুরুত্ব থাকবে। সুপারিশ করা যাচ্ছে যে, এনজিওগুলো স্থানীয় অবস্থা (যেমন-ঝুকি, মৌসুম, প্রয়োজনীয় লোনের পরিমাণ, আয়ের প্রবাহ ইত্যাদি) বিবেচনা করে উৎপাদনশীল খাতে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময়ে উপকূলীয় এলাকায় চলমান ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের সকল ধরণের কিস্তি আদায় বন্ধে নীতিমালা প্রনয়ন করতে হবে।

৪.মাছ ধরার চাপ কমানোর জন্য এই ক্ষেত্রে অনেক বেশি জেলের আগমণ রোধ করতে হবে। দীর্ঘ সময়ের জন্য বিশেষ পরিকল্পনার মাধ্যমে জেলেদের জন্য কার্যকর বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে যুবক শ্রেণিকে আয় বর্ধক পেশায় স¤পৃক্ত করতে হবে। তরুণ জেলেদের জন্য আয়বর্ধক কাজের ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা, অনুপ্রেরণা, এবং সহায়তা দিতে হবে এবং সরকারী এবং বেসরকারীভাবে জেলে সম্প্রদায়ের উপরে বিশদ গবেষণা পরিচালনা করতে হবে।

৫.উপকূলীয় এলাকার জন্য বিশদভাবে সরকার কিংবা দাতা সংস্থার অর্থায়নে সামাজিক উন্নয়ন/ক্ষমতায়ন এবং নেতৃত্ব বিকাশে প্রকল্প শক্তিশালী করতে হবে। সামাজিক সংগঠনগুলোকে শক্তিশালীকরণ এবং দরিদ্রদের অধিক অন্তর্ভুক্তির জন্য চেষ্টা চালাতে হবে।

৬.প্রতিক্রিয়াশীল একটি কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন বিশেষ করে কীটনাশক রোধ ও সার প্রোয়োগ করার ক্ষেত্রে । উদাহরণ স্বরূপ, সমাজে প্রয়োজন অনুসারে সেবার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা দরকার এবং সংহত এবং সমন্বিত সম্প্রসারণ সেবা নিশ্চিতে সমাজ ভিত্তিক সংগঠন (সিবিও) স্থাপন এবং এর ক্ষমতায়ন প্রয়োজন। প্রতিটি জেলে সম্প্রদায়ে অভিজ্ঞ একটি এনজিওকে সিবিওগুলোকে সংগঠিত এবং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে।এ জন্য সহ ব্যবস্থানা কর্যক্রম সম্প্রসারণ করতে হবে ।
ক্স উপকূলীয় এফ এম রেডিও ষ্টেশন কাম তথ্য কেন্দ্র এবং অন্যান্য মিটিয়ার মাধ্যমে প্রতিদিনের আবহাওয়া, বাজার ব্যবস্থা এবং জেলে সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব বিস্তারকারী সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি স¤পর্কিত তথ্যাবলী প্রচার করতে হবে। তথ্য প্রচার এবং এতে সবার প্রবেশে সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

৭.দরিদ্রদের মাঝে ন্যায্য উপায়ে চরের/খাস জমি বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে; যাদের জমি এবং বসত-ভিটা নদী ভাঙনের স্বীকার হয়েছে তাদেরকে অগ্রাধিকার দিতে হবে (যেমন চর উন্নয়ন এবং জরিপ প্রকল্প-সিএসডিপি); জেলেদের বেস্টনকারী রাস্তা, সাইক্লোন সেন্টার, স্বাস্থ্য কেন্দ্র, এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের মত অবকাঠামোগুলো সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকা উচিৎ।
ক্স জেলেদেও ঝুঁকি ভাতা ও ইন্সুরেন্স প্রতিবেশি রাস্টের সাথে মিল রেখে দুর্যোগে মৃত্যুর ক্ষেত্রে ১ লক্ষ টাকা করা, জেলেদের দাদনমুক্ত করতে তহবিল গঠন করা প্রয়োজনে জেলে ব্যাংক করতে হবে ।

৮. নদীর মোহনাগুলো ড্রেজিং করতে হবে, জেলে ও নৌকার নিবন্ধন করতে হবে এবং তাদেরকে লাইসেন্সের আওতায় আনতে হবে ।

সকল জেলে যাতে পরিমান মতো ভিজিএফ ও অন্যান্য সুবিধা পায় সে ব্যবস্থা করতে হবে । প্রয়োজনে আরৎদার, মহাজন, মাঝি, ভাগি সবাইকে অংশীদার ভিত্তির নীতিমালা প্রদান করতে হবে, স্থানীয় সরকার ও মৎস্য বিভাগকে যুক্ত করতে হবে । নদীতে অবৈধ জাল বিশেষ কওে ঘুটা জাল, বেন্দিজালসহ অন্যান্য জাল বন্ধে র‌্যাবকে যুক্ত করতে হবে ।

৯.সরকারীভাবে মাছঘাট নির্ধারন করে দিতে হবে এবং মনিটরিং করতে হবে । মাছ ঘাটের সাথে জড়িত জেলেদের নিয়ে তহবিল গঠন সংক্রান্ত নীতিমালা করে দিতে হবে।

১০.সংবাদ সংস্থা, এনজিও, এবং স্থানীয় সম্প্রদায়কে সিবিও ভিত্তিক অ্যাডভোকেসি কার্যক্রমে অনুপ্রাণিত করা এবং সংক্রান্ত প্রকল্প গ্রহন ও সরকারী নীতি নির্ধারণী পর্য়ায়ে পৌছে দেয়া উচিত।

উপকূলীয় মৎস স¤পদের প্রাচুর্য শুধু তখনই জেলে সম্প্রদায়ের উপকারে আসবে যখন তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে একটা সম্মানজনক জীবিকার ক্ষেত্রে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। যেসব অধিকার জেলেরা নিজেদের বলে দাবি এবং সংরক্ষণ করতে পারবে না সেসব দ্বারা তাদের দরিদ্রতা নিরসন করা যাবে না। তথাপি, টেকসই জীবিকা এবং স¤পদ সৃষ্টিতে সফল হবার লক্ষ্যে জেলে সম্প্রদায়ের জন্য যেকোন উদ্যোগ গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অবশ্যই জেলে সম্প্রদায়ের সামাজিক অন্তর্ভুক্তি স¤পর্কিত বিষয়সমূহ নজরে আনতে হবে যাতে করে জেলে সম্প্রদায়ের দরিদ্রতার বিষয়টি নীতিনির্ধারণি পর্যায়ে প্রকাশিত এবং জ্ঞাত হয়।

কারণ, প্রান্তিক জেলেদের বর্তমান দুরবস্থা এবং দরিদ্রতার পেছনে একটি মাত্র কারণ রয়েছে, যথা- জাতীয় অর্থনীতিতে তাদের অবদান নীতিনির্ধারকদের দ্বারা মূল্যায়িত কিংবা স্বীকৃত হয় না কিংবা এর গুরুত্ব তাদের কাছে অজানা। আলোচিত বিষয়গুলো প্রতিটি জেলে সম্প্রদায়ের অসংগঠিত অবস্থা এবং যথাযথ নেতৃত্বের অভাবেই ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে।জাতীয়ভাবে জেলেদের অবদানের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি দিয়ে মৎস্যজীবী নেতৃত্বের উন্নয়ন ও সহ:ব্যবস্থাপনা হতে পারে এর একটি টেকসই সমাধান ।

(স্বাক্ষাৎরকার ও তথ্য সংগ্রহে : সোহেল মাহমুদ, স্টাফ রিপোর্টার, লালমোহননিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)

Facebook Comments Box


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি