LalmohanNews24.Com | logo

২রা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৫ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

চিরঋনী হয়ে রইলাম স্যার

চিরঋনী হয়ে রইলাম স্যার

আমার_আস্থা_ভালবাসার_এক_নির্ভরশীল_অভিবাবক_হারালাম সবার নিকট দোয়া চাই। ক্ষমা  করবেন জাহাঙ্গীর আলম স্যার, চিরঋনী হয়ে রইলাম।আপনি আকস্মিক চির বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। আপনার জন্য কিছু করতে পারিনি। আপনার ঋন শোধ হওয়ার নয়।

এ সমাজের মানুষগুলো যখন আত্নকেন্দ্রিক আর নিজ পরিবারকে নিয়ে ব্যস্ত থাকাকেই স্বাচ্ছন্দবোধ করেন ঠিক তার বিপরীতমুখী অবস্থানেই ছিলেন আপনি।আমি কোন ভাষায় আপনার গুনাবলী বর্ননা করে নিজের আবেগ অনুভুতিকে সান্তনা দিব জানা নেই। যারা আপনাকে চিনতেন, জানেন, আপনার সংস্পর্শে থেকে সাহচর্য পেয়েছেন তারা হয়তবা আমার লেখার ভাষা সহজেই বোধগম্য করতে পারবেন।আপনি নিজে যতটুকু সুখী ছিলেন, সে সুখ শুধু নিজে আর পরিবারের মাঝেই বিলিয়ে দেননি,সে সুখ কে নিকটাত্নীয় বন্ধু বান্ধব,আত্নীয় স্বজন প্রতিবেশী সহ সকলের মাঝেই বন্টন করেছেন।

সকলেরই বিপদে আপদে পাশে থেকে নিজেই স্ব-ইচ্ছায় সকলের খোজঁ খবর নিয়ে সুখী হতেন। আত্নীয় স্বজন সহ সকলের সুখ,দুখের,আপদ, বিপদের শেষ ভরসাস্থল ছিলেন আপনি। ছায়ার মত সকল আত্নীয় স্বজনদের আগলে রেখেছেন।আত্ন-প্রচারবিমুখ এমন বিরল মহানুভব নিরহংকারী উদার মানুষের বড্ড অভাব এ সমাজে,তার মধ্যও আপনি চলে গিয়ে যে শুন্যতা সৃস্টি করে রেখে গেছেন তা পুরন হওয়ার নয়।তাইতো মৃত্যুর পর অনেকেই আমরা বলেছি আমাদের দ্বারা মানুষের কোন উপকার হয়না।
আমাদের হায়াত কেটে নিয়ে আল্লাহ যদি আপনাকে বাঁচিয়ে রাখত??

সাধাসিধে সাধারন মানুষের মত জীবনযাপনকারী,আত্নপ্রচার বিমুখ অসম্ভব বিনয়ী,নির্লোভ, নিরহংকারী,অমায়িক ব্যবহার,ও ব্যতিক্রমী গুনাবলীর এ মহান পরোপকারী, নিঃস্বার্থবান মানুষটি গতকাল ১৬ই ফেব্রুয়ারী শুক্রবার আনুমানিক সকাল ১১:১৫ মিনিটের দিকে আকস্মিকভাবে ইন্তেকাল করেন।বাদ মাগরিব তাকে রায়েরবাজার বুদ্ধিজিবী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

জাহাঙ্গীর আলম স্যারের জম্মস্থান ভোলার দৌলতখাঁন উপজেলায়। লালমোহন ওয়েস্টান পাড়ার মরহুম নুরুল ইসলাম কাকা ওনার শ্বশুর ছিলেন।নুরুল ইসলাম কাকার সাথে পারিবারিক সম্পর্কের কারনেই আমার ওনার সাহচর্যে আসা।উনি মৃত্যুর পুর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহম্মেদের কন্যা বর্তমানে গাজীপুরে কাপাসিয়ার সাংসদ সিমিন হোসেন রিমি এমপির মালিকানাধীন ধানমন্ডির এ্যামব্রোসিয়া গেস্ট হাউজের ব্যবস্থাপক ছিলেন।সততা ছিল তার অলংকার।দীর্ঘ বছর এ প্রতিস্ঠানে অত্যান্ত সততা ও নিস্ঠার সহিত দায়িত্ব পালন করায় তানজিম আহম্মেদ সোহেল তাজ,সিমিন হোসেন রিমি এমপি,মরহুম জোহরা তাজউদ্দীন সহ তাজ পরিবারের সকলে তাকে অন্যরকম শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। সততা,সত্যবাদিতা,নীতি,আদর্শ পরোপকারিতা ও মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাড়িয়ে তিনি ছিলেন বিপদগ্রস্ত আশাহত মানুষের শেষ ভরসাস্থল,
মানবতাবাদী মানুষের অহংকার।

স্যার….আপনার বিষয়ে স্মৃতিচারন আর আমার প্রতি আপনার অবদান লিখে শেষ করা যাবেনা তারপরেও কিছু বিষয় লিখছি।
আমি ২০০৫ সালে ঢাকায় এসে মিরপুর বাঙ্গলা কলেজে ভর্তি হই।২০০৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রথমবারের মত একদিন আপনার অফিসে দেখা করতে যাই।সে হতেই আপনি ছিলেন ইট পাথরের তিলোত্তমা নগরী ঢাকা শহরে আমার একমাত্র অভিবাবক। লড়াই সংগ্রাম করে ঢাকায় আমার লেখাপড়ার অন্যতম সারথী ছিলেন আপনি।বিপদে,আপদে আমার ছায়ার মত শুধু অভিবাবক নয়,আমার ভালবাসা আর ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল ছিলেন। যখনই আমার কোন বড় এ্যামাউন্টের টাকার প্রয়োজন হত,পৃথিবীর কোথাও টাকার ব্যবস্থা না হলে শেষ ভরসার আশ্রয়স্থল হিসেবে আপনাকে ফোন দিলেই আমার সমাধান হত। মাঝে মধ্য পরিশোধ করতে পারতাম,আবার থেকেও যেত। একসময় হিসেব করে টাকা শোধ দিতে চাইলেও নেননি বিধায় কয়েক বছর পর বিদেশ গিয়ে একাউন্টে পাঠিয়ে শোধ করেছিলাম।ছাত্র অবস্থায় প্রায়ই আপনার অফিসে যেতাম,গেলেই টাকা যেভাবে হোক আমার পকেটে ভরে দিতেন,এভাবে বিভিন্ন জায়গায় দেখা হলে অনেকবার টাকা দিয়েছেন। ছাত্র অবস্থায় বিভিন্ন ঈদে অনেক কিছু কেনার জন্য টাকা দিতেন।এসব টাকা কোন দিন শোধ করতে পারিনি।

শেষ অবধিও আমার নিকট পাওনা রেখে গেছেন। আমি একবার দুর্ঘটনায় পতিত হওয়ার খবর শুনে ঢাকা মেডিকেল এসেছিলেন পরে চিকিৎসার জন্য টাকাও দিয়েছিলেন তাও শোধ করতে পারিনি।আপনার সাথে দেখা হলে অফিসে এলে কত কিছু যে আমায় এনে খাওয়াতেন তা লিখে শেষ করা যাবেনা।আপনার ভালবাসা,

আদর স্নেহে আমি অভিভুত হয়ে যেতাম। আপনার অফিসে গেলেই বুঝতেন কোন না কোন সমস্যায় নিয়ে আসছি।নিজেই আগ্রহভরে জিজ্ঞাসা করতেন।বলতে না চাইলেও বুঝতেন সমাধান করতেন। ঢাকার লেখাপড়ার জীবনে আপনি ছিলেন আমার দুঃসময়ের কান্ডারী।।

আমাকে ৫লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন শেয়ার ব্যবসা করার জন্য। আপনার শেয়ার বিক্রি করে বিভিন্নভাবে আপনার নিকট বহু টাকা নিয়েছি।একবার মোটা অংকের টাকা লস দিলেও আমায় কিছু বলেন নি,বললেন তুমি আমার টাকা লস দিয়ে হলেও ব্যবসাটা তো শিখতে পারছ। এটা কি লস হল নাকি? আমি আশ্চর্যান্বিত হয়ে গিয়েছিলাম। আমি আপনাকে অনেক বিরক্ত করেছি,আমি লজ্জিত, আমি চিরঋনী,ক্ষমা করবেন স্যার।

শুধু আমি নই লালমোহনের অনেকেই যারা ঢাকায় লেখাপড়া করত আপনার নিকট গেলে অনেক সহযোগীতা করেছেন।শুধু শ্বশুরবাড়ি এলাকার লোক হিসেবে লালমোহনে অনেকের জন্য যা করেছেন তা অকল্পনীয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে এমএ ডিগ্রী সম্পন্ন এ মানুষটির ব্যবহারই ছিল তার অমায়িক গুন।ব্যবহারেই সবাই মুগ্ধ হয়ে তার ভক্ত হয়ে যেত।রাগ কি জিনিস কোন দিন দেখিনি।এমন কোন বিষয় ছিলনা যে ক্ষেত্রে তার কোন জ্ঞান ছিলনা। যে কোন মানুষ তার নিকট কোন সমস্যা বললে, পরামর্শ চাইলে এত চমৎকার ভাবে তাকে পরামর্শ দিয়ে সান্তনা দিতেন তা শুনলে শুধু মানুষ মুগ্ধই হতনা তার কস্ট টা সে সেখানেই ভুলে যেত। তার কথা শুনলে কেউ তার নিকট হইতে উঠতে চাইতনা। জীবনে চলার পথে গঠনমুলক পরামর্শ দিয়ে তিনি আমাকে সব সময় অনুপ্রেরনা দিতেন,পরামর্শ, দীক্ষা দিয়ে একজন আদর্শ শিক্ষকের ভুমিকা ও পালন করেছিলেন।

কয়েক বছর পুর্বে হজ্ব করে আসা পাচঁ ওয়াক্ত নামাজী এ মানুষটি স্টক করার পর আধা ঘন্টার মত দিব্যি কথা বলে তার ছেলেকে কিছু ওসিয়ত করে কালেমা পড়তে পড়তে বিদায় নেন। এমন সুন্দর মৃত্যু আমার মনে শক্তি আর সান্তনা দেয় তিনি নিঃসন্দেহে জান্নাতী।
কিন্তু একটি কস্ট আমার থেকে গেল। প্রায় দুই বছর পর আমি বছর খানেক পুর্বে বিদেশ হতে এসে ওনার সাথে সাক্ষাত করতে অফিসে গেলে মুখটা মলিন দেখে জিজ্ঞাসা করলাম”স্যার আপনার শরীর কেমন আছে? মলিন স্বরেই বললেন একটু হার্টে সমস্যা আছে জানিনা কখন চলে যাই। আমি বললাম আপনার প্রতি অসংখ্য মানুষের আন্তরিক দোয়া আছে,আপনি ধুমপান করেন না, বাজে কিছু খান না।স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন, আপনি দীর্ঘ বছর বাঁচবেন।আপনার কিছু হবেনা।

আমি কথাগুলো মানসিক শক্তি আর দৃঢতার সাথেই বলেছিলাম। এর পুর্বে হাজারো ছবি তার সাথে তোলার সুযোগ হলেও কখনো তার সাথে ছবি তোলার অভিপ্রায় জাগেনি। কিন্তু কেন জানি সেদিন ভেবেছিলাম যাওয়ার সময় একটি ছবি তুলে রাখব, কিন্তুু আসার সময় মনে ছিলনা।এর পর আরও একবার ছোট ভাইকে সাথে নিয়েও তার অফিসে গিয়েছিলাম ছবি তুলব তা ও আসার পথে মনে ছিলনা। আমি ও কয়েকবার গেলাম ছবি তুলব তুলব বলে কিন্তু কেন জানি আসার সময় ভুলে যেতাম।

স্যার……আপনার সাথে হয়ত আমার ছবি তুলা হয়নি।কিন্তু স্যার আপনি আমার হৃদয়পটে থাকবেন অনন্তকাল, যুগ যুগান্তর! যতদিন বেঁচে আছি আপনাকে কোন দিন ভুলবনা।মনে পড়লেই ছুটে যাব আপনার কবরের পাশে,দোয়া পড়ে আপনার রুহের মাগফেরাত কামনা করে একাকী আপনার সাথে কথা বলে আসব।আপনাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করার পুর্বে অশ্রুসজল নয়নে পিকআপ হতে আপনার লাশের খাটিয়া কাধেঁ করে এনে কবর পর্যন্ত এনেছি। কবরে শায়িত করার পুর্বে শেষবারের মত আপনার পা ধরে ক্ষমা ও চেয়েছি। ক্ষমা করবেন আপনার স্নেহের মহির কে? পরপারে ভাল থাকবেন স্যার।মহান আল্লাহ আপনাকে জান্নাতবাসী করুন।আমীন।।

 

লেখকঃ এম.ইউ মাহিম

বিশেষ প্রতিবেদক

লালমোহননিউজ২৪ ডটকম

Facebook Comments Box


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি