LalmohanNews24.Com | logo

১লা শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৬ই জুলাই, ২০১৯ ইং

ক্ষেতে ক্ষেতে প্রতিবাদ

ক্ষেতে ক্ষেতে প্রতিবাদ

টাঙ্গাইলের কালাহাতীর কৃষক আব্দুল মালেকের অভিনব প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ছে ক্ষেত থেকে ক্ষেতে। এবার তাকে অনুসরণ করে একই উপজেলার আউলটিয়া গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান মজনু তার ক্ষেতের পাকা ধান এলাকাবাসীকে বিনা মূল্যে দিয়ে দিয়েছেন।

অপর দিকে সোমবার বিকেলে বাসাইলের কাশিল ইউপির বাথুলীশাদী গ্রামে নজরুল ইসলাম খান নামে আরেক কৃষক আব্দুল মালেকের মতো প্রতিবাদ করে ক্ষেতের ধান পুড়িয়ে দিয়েছেন।

এসময় নজরুল ইসলাম খান বলেন, বাজারে প্রতি মণ ধানের দাম ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা। অথচ এক মণ ধানের উৎপাদন খরচ এক হাজার টাকার উপরে। একজন শ্রমিক এক দিনে এক থেকে দেড় মণ ধান কাটতে পারে। আর বর্তমান বাজারে একজন ধানকাটা শ্রমিকের মজুরি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। সে সঙ্গে  শ্রমিক সংকটতো লেগেই আছে। ক্ষেতের পাকা ধান আছে কিন্তু ধানে চাল নাই শুধু চিটা আর চিটা। ধান সময়মতো ঘরে তুলতে পারছি না। তাই  উপায় না দেখে রাগে ,ক্ষোভে একজন প্রতিবাদী কৃষক হিসেবে আমি নিজের পাকা ধান ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছি। এতে যদি ধানের মূল্যবৃদ্ধিসহ বাংলাদেশের কৃষকদের বিভিন্ন সুবিধার বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় আসে।

গত ১২ মে দুপুরে কালিহাতী উপজেলার পাইকড়া ইউপির বানকিনা এলাকার কৃষক আব্দুল মালেক সিকদার ধানের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে নিজের পাকা ধানে আগুন দিয়ে অভিনব প্রতিবাদ জানান। তার এ প্রতিবাদ ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার মাধ্যমে দেশে বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

প্রতিক্রিয়ায় মালেক সিকদার বলেন, প্রতি মণ ধানের দাম থেকে প্রতি শ্রমিকের মজুরির দাম দ্বিগুণ। এবার ধান আবাদ করে আমরা মাঠে মারা পড়েছি। তাই মনের দুঃখে পাকা ধানে আগুন দিয়েছি।

তিনি আরো বলেন, সারাদেশের কৃষকদের পক্ষ থেকে তিনি এ অভিনব প্রতিবাদের পথ বেছে নিয়েছেন। কেননা, বাজারে প্রতিমন ধান বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা দরে। কিন্তু এক মণ ধান ফলাতে মোট খরচ হয়েছে এক হাজার টাকার উপরে। বর্তমানে ধান কাটা শ্রমিকের মূল্য ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা। একজন শ্রমিক দিনে এক থেকে দেড় মণ ধান কাটতে পারে। তাই কোনো উপায় না দেখে আমি দেশের কৃষকদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ হিসেবে নিজের পাকা ধান ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে এর প্রতিবাদ করেছি। অন্যদিকে বেশি মজুরি হলেও কামলা পাওয়া যায় না। খেতে ধান পাকলেও তা ঘরে তুলতে পারছি না। তাই এক দাগের ৫৬ শতাংশ ধানে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছি। একই সঙ্গে আমি ধানের দামের বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

কালিহাতী উপজেলার পাইকড়া ইউপি চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন পাকা ধানক্ষেতে আগুন দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা। কৃষকদের ধানের ন্যায্য মূল্য দেয়া উচিত। কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

কাশিল ইউপি চেয়ারম্যান মির্জা রাজিক পাকা ধান ক্ষেতে আগুন দেয়ার বিষয়ে আক্ষেপ করে বলেন, বিষয়টি  বেদনাদায়ক। কৃষকদের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে না পারলে কৃষি শিল্প হুমকির মুখে পড়বে,যা দেশের জন্য বিরাট ক্ষতির কারণ হবে।

বাসাইল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজনীন আক্তার বলেন, এবছর কৃষি বিভাগের পরামর্শে কৃষক বাম্পার ফলন ফলিয়েছে। একসঙ্গে ধান কাটা লাগার কারণে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি এবং শ্রমিক সংকট পড়ে যায় । তাছাড়া  সব কৃষক একসঙ্গে ধান বাজারজাত করেন। ফলে ধানের মূল্য নিম্নমুখী । আমরা বর্তমানে সরকারের ৫০ ভাগ ভর্তুকির মাধ্যমে কৃষকদের কৃষি যন্ত্রপাতি কেনার জন্য আগ্রহী করছি।

সোমবার টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী যোগনী হাটে গিয়ে দেখা যায়, বোরো ধানে বাজার ভরপুর। তবে প্রতিটি কৃষক হত্যাশাগ্রস্ত। ফলন বাম্পার হলেও ভালো দাম না পাওয়ায় কৃষকের মুখে মুখে হাসি নেই।

পিচুরিয়া এলাকার জহুরুল ইসলাম বলেন, আমি কৃষক মানুষ। ধান কাটা শ্রমিকদের মজুরি দিতে ধান নিয়ে হাটে এসেছি। এবছর ৫ বিঘা বোরো চাষ করেছি। ফলনও ভাল হয়েছে। তবে দাম তেমন নয়। এক মণ ধান বিক্রি করেছি ৫৭০ টাকা। এতে করে ধানের খরচই তুলতে পারছি না। কিভাবে মজুরি দেবো আর কিভাবে সংসার চালাবো সেটা ভেবেই পাচ্ছি না। এরকম ধানের মূল্য থাকলে আগামী ধানের চাষাবাদ বাদ দিতে হবে।

অপর কৃষক মো. মাগুন বলেন, রিকশা ভাড়া দিতে হবে বলে সাইকেল ধান নিয়ে ঠেলে হাটে এসেছি। কষ্ট করে এসেও প্রতি মণ ধান বিক্রি করছি ৪৫০ টাকায়। এতে আমার ধান কাটার শ্রমিকের মূল্যও হয়নি। তার পরে হাল চাষ, নিরানি, রোপন, সার ও কীটনাশকের মজুরি তো রয়েছেই। ধানের দাম এমন থাকলে কৃষক বাঁচবে কিভাবে।

টাঙ্গাইল ব্যবসায়ী ঐক্যজোটের সভাপতি আবুল কালাম মোস্তফা লাভু বলেন, এবছর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেছি বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে ভারতসহ আশেপাশের দেশ থেকে বাংলাদেশে চাল আসায় আমাদের দেশে ধানের দাম খুবই কম। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষক। আমি ভারতসহ আশে পাশের দেশ থেকে বাংলাদেশে চাল আমদানি বন্ধের দাবি জানাচ্ছি।

টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. আব্দুর রাজ্জাক জানান, ২০১৮-১৯ সালে জেলার ১২টি উপজেলায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৯২ হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিলো। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ১ লাখ ৭১ হাজার ৭০২ হেক্টর ধানের চাষ করা হয়েছে। ধান উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ালেও দাম ভালো না পাওয়ায় কৃষকদের মাথায় হাত। প্রতিমণ ধানের বাজার দর এখন ৫০০ খেকে ৫৫০ টাকার মধ্যে। আর ধান কাটার শ্রমিকের দর এলাকা ভেদে ৭০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা। এ মূল্যদিয়ে শ্রমিক নিয়ে ধান কেটে লোকসান গুণতে হচ্ছে বোরো চাষীদের।

উপ-পরিচালক বলেন, সরকার প্রতি মৌসুমেই ধানের ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেয় এবারো দেবে। আর এ সময়টাতে দেশের অধিকাংশ জায়গায় ধান কাটার কারণে শ্রমিক সংকটের সৃষ্টি হয়। আর এখন বিক্রি না করে কয়েকদিন পরে বিক্রি করলে ভালো দাম পাবে। এছাড়াও সরকার এবার ২৬ টাকা কেজি দরে ধান ক্রয় করবে। তখন কৃষকরা ধানের দাম ভালো পাবে।

Facebook Comments


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি