LalmohanNews24.Com | logo

১০ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৩শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

কেন পিছিয়ে আমরা

কেন পিছিয়ে আমরা

আজ যেমন বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সরকারি-সেরকারি পর্যায়ে সকল স্তরে অগনন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে এবং লোকজন অতিশয় আগ্রহের সাথে তাদের আদরের ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য পাঠাচ্ছে একইভাবে মধ্যযুগেও ইউরোপের দেশে দেশে এরকম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল এবং অভিভাবকরা তাদের ছেলে মেয়েদের বাধ্যতামূলকভাবে বিদ্যালয়ে পাঠাতো। তখন শুধু বিত্তবানরাই শিক্ষিত হয়নি, তারা সমাজের সকল স্তরের শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করে। সেসময় মুসলিমবিশ্বে রাজা-মহারাজা, সম্রাট-বাদশারা তাদের বংশধরদের জন্য সে রকম যুগোপযোগী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেনি। যদিও বিশ্ব ছিল তখন মুসলিম সুলতানদের নিয়ন্ত্রণে। তাদের দাপটে কাঁপতো ইউরোপসহ সারা পৃথিবী। মুসলিম বিশ্বের প্রতাপশালী শাসকগণ কেন জানি নানিজেদের বংশধরদের জ্ঞানচর্চা বা বিদ্যার্জনের জন্য বৃহৎ কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেনি। যার অনিবার্য পরিণাম, কালক্রমে তাদের উত্তরাধিকাররা রাষ্ট্রক্ষমতা হারাতে থাকে। বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রায় সবগুলো প্রতিষ্ঠিত হয় ইউরোপে। যেমন ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি (১০৯৬), ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি (১২০৯), ইতালীর বলোগনা ইউনিভার্সিটি(১০৪৪), পদুয়া ইউনিভার্সিটি(১২২২), নেপলস ফ্রেডরিকো ইউনিভার্সিটি(১২২৪), সেইনা ইউনিভার্সিটি(১২৪০), ফ্রান্সের প্যারিস ইউনিভার্সিটি(১১৫০), জার্মানীর হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটি(১৩৮৬), পর্তুগালের কইব্রা ইউনিভার্সিটি(১২৯০), অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা ইউনিভার্সিটি(১৩৬৫) এবং স্পেনের সালামানকা ইউনিভার্সিটি(১২১৪)। বিশ্বমানের এসব ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে একাদশ-দ্বাদশ শতক থেকেই আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানে এগুতে থাকে ইউরোপ। তার সামান্য আগে-পরে সারা মুসলিম বিশ্বে মাত্র তিনটি বড় আকারের মাদ্রাসা বা ধর্মীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। সেগুলি হচ্ছে মরক্কোর কারাউস বিশ্ববিদ্যালয়( ৮৫৯), মিশরের আলআজহার বিশ্ববিদ্যালয় (৯৭২), বাগদাদের আলনিজামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (১০৬৫)। অথচ এ সময়ে পুরো ভারতবর্ষের কোথাও মুসলিম সুলতান-সম্রাটরা তাদের হাজার বছরের শাসনামলে একটাও বিশ্বমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেনি।

ইউরোপীয়দের বিশ্ববিদ্যালয় বা বিশ্বমানের পতিষ্ঠান স্থাপনের প্রকৃয়া থেকে বোঝা যায় তাদের শাসকরা ছিল দূরদর্শী এবং জ্ঞানী। শতবর্ষ পর, হাজার বছর পর কী হতে পারে, তর জন্য সময় থাকতেই তারা প্রস্তুতি নেয়। এ থেকে আঁচ করা যায়, কেন মুসলিমবিশ্ব ইউরোপের ওপর খুব বেশি সময় কর্তৃত্ব করতে পারেনি।

ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কয়েকশ’ বছর তাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত ছিল। মুসলমানদের মধ্যে দীর্ঘদিন একটা ধর্মীয় জোশ ও ঐক্যশক্তি কাজ করেছিল। ফলে তারা রোমানদের এশিয়া-আফ্রিকা থেকে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয় এবং স্পেনসহ ইউরোপের কতক অংশে কয়েকশ’ বছর রাজত্ব করার সুযোগ লাভ করে। কিন্তু বেশিদিন সেটা তারা ধরে রাখতে পারেনি। মাত্র কয়েকশ’ বছরের মাথায় তাদের লজ্জাজনকভাবে বিতাড়িত হতে হয়। এরপর অবশ্য কয়েকশ’ বছর অটোমান তুর্কীরা পশ্চিম এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা ও পূর্বইউরোপে এবং আফগান-মোগলারা মধ্য এশিয়ায় রাজত্ব করে। এসময় তিন মহাদেশেই মুসলমানদের প্রতাপ ছিল। কিন্তু ত্রয়োদশ শতকে তাদের অগ্রযাত্রা থেমে যায়। চতুর্দশ শতক থেকে শুরু হয় পেছনে হটার পালা। এর কারণ কি? কারণ একটাই। তা হল তারা জ্ঞানচর্চায় পিছিয়ে যায়। আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্প বাণিজ্য, সাহিত্য সংস্কৃতি, ইতিহাস ঐতিহ্য না তারা নিজেরা চর্চা করেছে, না চর্চার জন্য বিশ্বমানের কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। তাছাড়া তাদের অর্ধেক জেনারেশন যে নারী তাদেরকে ন্যূনতম শিক্ষা থেকে একেবারে মাহরুম রাখা হয়। মোল্লাদের ফতোয়ার ভয়ে নারীরা শত শত বছর পর্দার অন্তরালে থাকতে বাধ্য হয়। নারীরা অশিক্ষার অন্ধকারে চলে যাওয়ায় তাদের সন্তানরাও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়। এভাবে সারা মুসলিম বিশ্ব অন্ধকারে থেকে যায়। আসল শিক্ষা ভুলে তারা ধর্মীয় ফতোয়াবাজি, আত্মগরিমা ও নিজেদের অতীত ঐতিহ্যচর্চার মধ্যে আটকে যায়। শাসক ও বীরের ভূমিকা থেকে পিছু হটতে হটতে মুসলানরা একেবারে অনুকরণ-অনুসরণকারীর জায়গায় চলে আসে। কবি নজরুল ইসলামের ভাষায় ঃ

বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে আমরা তখন বসে

বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজি হাদিস কোরান চষে

আজ বিশ্ব যে জ্ঞান বিজ্ঞান ও গণতন্ত্রের উপর ভিত্তি করে এগিয়ে চলেছে, তার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব ইউরোপের। তারা নিজেরা নিজেরা যুদ্ধ করেছে, পাশাপাশি জ্ঞান বিজ্ঞানের পেছনেও অর্থ ঢেলেছে। তাদের যুদ্ধ থামলেও বিজ্ঞানচর্চা থামেনি। আর মুসলিম বিশ্বের বেশির ভাগ অর্থ ব্যয় হয়েছে তাদের বিলসিতা, অভ্যন্তরীন রেশারেশি এবং খুনাখুনিতে। মধ্যযুগের মুসলিম জ্ঞানী-বিজ্ঞানীদের কিছু অবদান থাকলেও রাষ্ট্রক্ষমতা হারানোর সাথে সাথে তাদের সে অবদানও অন্তরালে হারিয়ে যায়।

ইউরোপে বিজ্ঞানী নিউটন যখন ‘দি প্রিন্সিপিয়া’ রচনা করেন ভারতবর্ষে তখন সম্রাট শাহজাহান স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মরণে বহুমূল্য ব্যয় করে তাজমহল নির্মাণ করেন । সম্রাট তাজমহল ও লালকেল্লা নির্মাণের পাশপাশি যদি বিশ্বমানের একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতেন তাহলে বোধকরি মোগল সাম্রাজ্য এখনো টিকে থাকতো। যখন অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ, হার্ভার্ড, রোম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বড় বড় শিক্ষিত-স্কলারগণ বের হতে থাকেন তখন মুসলিম বিশ্বের ছোট বড় রাজাগণের উত্তরাধিকাররা রাজত্বের মালিকানা নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে খুনাখুনিতে লিপ্ত। ঝগড়া আর মারামারি করতে করতে তারা নি:শেষ হতে থাকে। জনম জনমের জন্য তারা যে পেছালো, পেছন থেকে সামনে এগুনো কিছুতেই আর সম্ভব হলো না। ঘুরে দাঁড়াতে আজ প্রয়োজন নিরলস জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, ঈমানী যোশ এবং নিজেদের ভিতরকার ঐক্যচেতনাকে জাগ্রত করা।

Facebook Comments Box


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি