LalmohanNews24.Com | logo

১০ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৩শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

কালবৈশাখী যেন উপকূলবাসীর কাল!

কালবৈশাখী যেন উপকূলবাসীর কাল!

আক্তারুজ্জামান সুজন, অতিথি প্রতিবেদক: ভোলার দুলারহাট থানার তেতুলিয়া নদী সংলগ্ন নীলকমল ইউনিয়নের বেড়ীবাধ এলাকার মানুষগুলির যাপিত জীবন খুব কাছ থেকে দেখেছি।দেখেছি ওদের নদীভাঙনের কবল অার প্রতিবছরে কালবৈশাখীর ঝড়ের ছোবলে ক্ষত বিক্ষত হয়ে বেঁচে থাকার দুঃখগাঁথার বাস্তব চিত্র। সভ্যতার বিকাশ হয়। সেই আলোয় ওরা বিকশিত হয় না। ওদের কোন উন্নতি হয় না। ওরা ঘিঞ্জি আর নোংড়া পরিবেশে বসবাস করে। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাওয়ার বদলে বাবার হাত ধরে নদীতে মাছ ধরতে যায়। ওদের ঘরের বেড়া দিয়ে কুকুর ঢোকে। বাদলার দিনে চালের ফুটো দিয়ে জল পড়ে। ঝড়ে ঘর ভাঙে। কোন বেলা খেতে পায়, কোন বেলা পায় না। ভাতের খিদে মেটাতে মাছ বিক্রি করে ওরা। ছেলেমেয়েরা কাদা-মাটি মেখে উলঙ্গ থাকে রাতদিন। উৎসব-পার্বণে একটা লাল জামার জন্য চোখের জলে ভাসে ওদের অবুঝ শিশুরা।

আজও ওদের পরনে তেল চিটচিটে ছেঁড়া ময়লা কাপড়। বউরা দুই কাপড়ে বছর কাটায়। দিনরাত পরিশ্রম করার পরও নিত্যদিনের অভাব যেন ওদের ছায়াসঙ্গী। তারপরও চোখমুখে অন্ধকারে রাস্তা খোঁজার প্রাণান্তকর চেষ্টা। নীলকমল ইউনিয়ন ১ নং ওয়ার্ড কাশেম মিয়ার বাজার ঘুরে ফেরার পথে দেখা হয় ফুল বানুর সাথে, কোলের বাচ্চাকে নিয়ে একটা ঘিঞ্জির মত ঘরে বসে আছে। তিন ছেলে এক মেয়ে কে নিয়ে তার সংসার, স্বামী মোঃ রইজল নদীতে মাছ ধরে সাথে দুই ছেলে জামাল অার কামালকে নিয়ে। কথা হয় তাদের যাপিত জীবন নিয়ে, তিনি বলেন একসময় তার বাপ দাদার ঘর বাড়ি জমি জমা সবকিছুই ছিলো, কিন্তু নদী ভাঙনের কবলে পড়ে তারা সবকিছু হারিয়েছে। এখন প্রায় প্রতিবছরে কালবৈশাখী ঝড়ে তাদের ঘড় ভাঙে, প্রতি বছর বৈশাখ মাস যেন তাদের জীবন যাপনে কাল হয়ে দেখা দেয়, তাই তারা বাধ্য হয়ে ঘিঞ্জির মত ঘরে বাস করে, সরকার থেকে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ত্রান সামগ্রী পেলেও তাদের জীবন যাপনের চাহিদার তুলনায় সেটা খুবই অল্প।

এর পরে পাশ্ববর্তী এলাকায় লালমোহন উপজেলার ফরাশগন্জ ইউনিয়নের বেড়ীর মাথার পাশে কথা হয় বিবি জয়নব ও সরিফা বেগমের সাথে, তাদের যাপিত জীবনের গল্প ও ঠিক একই রকম। তারা জানিয়েছেন গত ১৭ ই এপ্রিল, ২০১৮ তারিখে প্রচন্ড কালবৈশাখী ঝড়, তাদের বাড়ি ঘর কে লন্ডভন্ড করে দিয়ে যায়, এখনো তাদের বাসস্থান কে তারা বাসযোগ্য করতে পারেনি। কালবৈশাখীর ঝড়ের ছোবলে ক্ষত বিক্ষত হয়ে বেঁচে থাকার দুঃখগাঁথার বাস্তব চিত্র শুধু নীলকমল ও ফরাশগন্জ ইউনিয়নে নয়, এমনই এক চিত্র দেখা গেছে ভোলার কলাতলীর চর, মাঝের চর, চর জহির উদ্দিন, চর নিজাম, মদনপুর, নেয়ামতপুর, হাজিপুর, চর নাসরিন, ঢালচর, চর পাতিলা, চর মোজাম্মেলসহ বিচ্ছিন্ন চরগুলোতে, মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মধ্যবর্তী অর্ধশতাধিক চরে প্রায় ২ লাখেরও বেশি মানুষের বসবাস। চরাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, ছড়ানো ছিটানো খড়ের ছাউনিযুক্ত প্রায় ৩০ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ বসতঘর। চরের সমতল জমিতে মাটি দিয়ে ৫-৬ ফুট উঁচু ভিটে তৈরি করে বানানো হয়েছে ঘরগুলো।

কোন ঘরে টিনের চালা, আবার কোন ঘরে খড়ের ছাউনি। অধিকাংশ ঘরে পাতার বেড়া। ছোট ছোট নড়বড়ে ঘরগুলোর একই মেজেতে পরিবারের সকলে কোনমতে করে বসবাস করে। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) উপ-পরিচালক মো. সাহাবুদ্দিন জানালেন, চরাঞ্চলে যে পরিমাণ সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে তা পর্যাপ্ত নয়। সাইক্লোন শেল্টারের অভাবে মোট জনসংখ্যার অর্ধেককেই শেল্টারের বাইরে থাকতে হয়। তাই আরো প্রায় ২০০ সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা দরকার। ভোলা জেলা প্রশাসক মো. মোহাম্মদ মাসুদ আলম সিদ্দিক জানান, চরাঞ্চলের বিপদগ্রস্ত মানুষদের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে আনার জন্য আমাদের প্রায় ৬০০ সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন চরে মুজিব কেল্লা তৈরি করা হবে। সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এসব বসতঘরের নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ সুবিধাসহ গৃহপালিত পশুপাখি রাখার সুব্যবস্থাও থাকে এখন থেকে সেরকম অবকাঠামো নির্মাণে জোর দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

Facebook Comments Box


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি