LalmohanNews24.Com | logo

৩রা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৭ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

কামাল পারভেজ ক্ষণজন্মা ছাত্রনেতা

কামাল পারভেজ ক্ষণজন্মা ছাত্রনেতা

কালাম ফয়েজী ।।
কামাল পারভেজ একটি নাম একটি ইতিহাস। যারা আজ ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত তারা অনুমানই করতে পারবেন না একজন ছাত্রনেতা কত জনপ্রিয় হতে পারেন, ছাত্র শিক্ষক অভিভাবকসহ গণমানুষের কত ভালবাসা তিনি অর্জন করতে পারেন।
লালমোহনের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছাত্রনেতা কামাল পারভেজ।
নির্লোভ-নিরহংকার ও সেবাপরায়ণ ছাত্রনেতা তিনি। এলাকার কোথাও কোন ছাত্র বিপদে পড়েছে, তার পরীক্ষার ফি নেই, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নেই, এটা কামাল পারভেজ জানলেই মুহূর্তে ছুটে যেতেন তার কাছে এবং অতিশয় আন্তরিকতার সাথে তাকে তুলে আনার চেষ্টা করতেন।
সময়টা এত রাফ এন্ড টাফ ছিল না। যে যেই সংগঠন করুক, সকলের প্রতি সকলের দরদ ছিল অন্যরকম। কেউ সমস্যায় পড়লে সে যে দলেরই সমর্থক হোক যে যার জায়গা থেকে তার উপকার করার চেষ্টা করতো। কামাল পারভেজ লালমোহনের ছাত্র সমাজের পাশে ছিলেন সবসময় সব রকম সুখ-দু:খে, আনন্দে-নিরানন্দে। তার কথা লালমোহনের মানুষ ভুলবে কেমন করে!
আমি বলব না, কামাল পারভেজ ফেরেস্তার মত নেতা ছিলেন। মানুষের পক্ষে ফেরেস্তা হওয়া সম্ভব না।
মানুষ ফেরেস্তার চেয়ে সেরা ঠিক কিন্তু দোষে-গুণে তার পূর্ণতা। আপনারা কি বিশ্বাস করতে পারেন, এত বড় একজন ছাত্রনেতা সংসার নির্বাহের জন্য দোকানদারি করতেন। তিনি করিম রোডের মাথায় বসে দোকান চালাতেন। এবং দিনের একটা বড় সময় তিনি বেচাকেনা করতেন। এই দোকান করা অবস্থায়ই যখন ডাক পড়তো, কোন ছাত্রের কোথাও সমস্যা হয়েছে, তিনি মটরসাইকেল চালিয়ে মুহূর্তে সেখানে পৌঁছে যেতেন। দোকানদারির আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল, কারো ছোটখাট বিপদে তিনি এখান থেকেই মোকাবেলা করার চেষ্টা করতেন। তিনি বলতেন- “সব সময় হাতে টাকা থাকে না, কারো কাছে চাইতেও লজ্জা লাগে। কিন্তু কাউকে তো খালি হাতে ফেরাতে পারি না। এজন্য দোকান দিলাম, যাতে সবসময় হাতে টাকা থাকে এবং তাৎক্ষণিক ছাত্রদের উপকার করা যায়।
তার সমস্যা ছিল তবু তিনি সৎভাবে চলার জন্য নিজের আয়ের উপর নির্ভর করে চলতেন। যদি কখনো কেউ প্রশ্ন করতো তিনি সৎপেশার গুরুত্বেও কথা বলতেন। আপনারা কি বিশ্বাস করবেন, তিনি যখন দোকানদারি করতেন তখন তার দল বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এবং স্থানীয় এমপি মেজর হাফিজ উদ্দিন সাহেব (বীর বিক্রম) ডাকসাইটে মন্ত্রী। কামাল পারভেজ তখন ছিলেন একাধারে লালমোহন উপজেলার ছাত্রদলের সভাপতি এবং শাহবাজপুর সরকারি কলেজের ভিপি।
আজ তো ছাত্র নেতাদের নামে কত দুর্নাম। ছাত্রনেতাদের কারো কারো আয় মন্ত্রীর সমপরিমান। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোথাও সরকারি কেনাকাটা হোক বা নির্মাণ কাজ, ছাত্রনেতা বা এলাকার জননেতাদের বখরা না দিয়ে কাজই করা যায় না। অথচ কামাল পারভেজের সময় এলাকায় রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে কত নির্মাণ কাজ হয়েছে, কিন্তু কখনো কামাল পারভেজ কোথাও বখরা চাইতে যাননি। তার দল ক্ষমতায়, তিনি ইচ্ছে করলে কী না করতে পারতেন। অথচ কখনো শুনিনি পার্শ¦বর্তী সংখ্যালঘু থেকে শুরু করে কোথাও কেউ তার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বরং উল্টোটা দেখেছি। কারো কোন সমস্যা হলে, সে নারী হোক বা পুরুষ, হিন্দু হোক বা মুসলিম তার কাছে সমাধান চাইতে এলে তিনি দু’পক্ষকে ডেকে তার একটা সম্মানজনক সমাধান দিয়ে দিতেন।

কামাল পারভেজকে যদি শুধু সততার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি তাহলে বোধ হয় ভুল হবে। একজন নেতার অসংখ্য গুণ থাকে, সততা তার একটি। কামাল পারভেজের ক্ষেত্রেও সেই সত্য প্রযোজ্য। তিনি একজন ত্যাগী পরিশ্রমী বুদ্ধিমান, সেবাপরায়ণ ও বন্ধুবৎসল নেতা ছিলেন। ছিলেন সদা হাশিখুশি এবং সদালাপী। আমরা তার ব্যস্ততা-কর্মতৎপরতা দেখে ভাবতাম তার মত নেতা নেতৃত্ব দিলে এলাকার চেহারা পাল্টে যাবে। কারণ, জনগণ সবসময় একজন নেতার মধ্যে একজন সৎ পরামর্শদাতাকে খোঁজে। মূলত তিনি তাদের চাওয়ার মতই একজন উদার নেতা ছিলেন এবং যে কোন রকম সমস্যা, চাই সেটা পারিবারিক, সামাজিক বা ব্যবসায়িক তিনি তার একটা জুৎসই সমাধান দিতে পারতেন। এজন্য দলমত ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকলের সহজ প্রবেশাধিকার ছিল তার কাছে।

আজ তো রাজনীতি কিছু লোকের ধর্মীয় গোঁড়ামির চেয়ে ভয়ংকর হয়ে গেছে। অবস্থা এমন যে, আপনি একটি দলের কর্মী বা সমর্থক, আপনি অন্যদলের কারো মেয়ের বিয়ে বা তার জানাজায় পর্যন্ত যেতে পারবেন না। গেলে আপনার সংগঠনের লোকদের কাছেই আপনাকে হেনস্তার শিকার হতে হবে। অথচ এ অবস্থা লালমোহনে আগে মানুষ কল্পনাও করতে পারতো না। যে যেই রাজনৈতিক মতাদর্শেই বিশ্বাসী হোন না কেন সামাজিক বন্ধনে তাদের মধ্যে চিরকাল প্রীতির সম্পর্ক বজায় ছিল। সেটা নিয়ে কখনো কাউকে প্রশ্ন তুলতে দেখিনি। কামাল পারভেজের কাছে এসে এরকম কত লোক নালিশ জানাতে আসতো, যারা তার সরাসরি প্রতিপক্ষ কিন্তু কামাল পারভেজ কখনো তার কার্যক্রমে দলীয় সংকীর্ণতার পরিচয় দেননি। এটা সে আমলে কেউ ভাবতেও পারতো না।

কামাল পারভেজের নিজের একটি সামাজিক সংগঠন ছিল বন্ধুমহল নামে। তিনি ছিলেন সে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। তিনি মনে করতেন কোন কারণে রাজনীতির পদ তার নাও থাকতে পারে। তাছাড়া রাজনৈতিক সংগঠনের কিছু সীমাবদ্ধতাও থাকে। ইচ্ছা করলেই সে সংগঠনের ব্যানারে যেকোন সমাজিক কর্ম করা যায় না। তিনি মূলত এ সংগঠনের মাধ্যমে সীমার উর্ধে উঠে স্থানীয় লোকজনের সেবা দিতে চেয়েছিলেন। শুধু লালমোহন তজুমদ্দিন নয়, তিনি চেয়েছিলেন সারা ভোলার বিভিন্ন স্থানে তার বন্ধুমহলকে ছড়িয়ে দিতে। এজন্য লালমোহন তজুমদ্দিনের বিভিন্ন এলাকায় যেমন এর শাখা স্থাপন করেছিলেন, তেমনি শাখা করেছেন বোরহানুদ্দিন-চরফ্যাশনে। আমি নিজে চরশষিভূষণের (লেতরা বাজার) শাখা উদ্বোধনের দিন উপস্থিত ছিলাম। সেদিন কামাল পারভেজের জনপ্রিয়তা আমি সেই দূর চরাঞ্চলেও দেখেছি। সে দিন তার অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য হাজারের উর্ধ্বে লোক সমাগম হয়েছিল। যারা এসেছিল তাদের প্রায় সকলে শিক্ষিত, শিক্ষার আলোকপ্রাপ্ত তরুণ-যুবক।

কামাল পারভেজ লালমোহনের মানুষের কাছে এক কিংবদন্তি। তারা যে কোন সময় যে কোন আলোচনায় তার উদাহরণ টানে। লালমোহন সরকারি কলেজের ভিপি হওয়ার জন্যও তাকে বিন্দুমাত্র জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিতে হয়নি। এখন তো দেশ থেকে ভোটের কারবার উঠে গেছে। এখন সব নির্বাচনই হয় সিলেকশনের মাধ্যমে। অথচ আগে এমন ছিল না। ইউপি নির্বাচন, শ্রমিক সংগঠনের নির্বাচন, কলেজ সংসদ নির্বাচন, ব্যবসায়ী সংস্থা বা ক্লাব নির্বাচন সর্বত্র উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজমান ছিল এবং আনন্দ উল্লাসের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট ভোটাররা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতো। কামাল পারভেজও সাধারণ ছাত্রদের ভোটেই কলেজ ভিপি এবং লালামোহন ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। লালমোহন শাহাবাজপুর কলেজে তখন কেবল লালমোহনের ছাত্রছাত্রী হয়, আশপাশের উপজেলার ছাত্ররাও পড়তে আসতো। এজন্য ভোটের সময় ভোট চাইতে কত রাত বিরাতে দূর চরাঞ্চলে পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। এক একটা ভোটার তখন কত মূল্য। অথচ এখন ভোটের কারবার নেই বলে এর মূল্যও নেই। মানুুষের গণতান্ত্রিক অধিকারই নষ্ট হয়ে গেছে। এ কারণে নেতাদের প্রতি মানুষের আস্থা এবং সম্মানও কমে গেছে।

নেতা হল একজন বীরের মত। বীর যেমন প্রকাশ্যে যুদ্ধ করে পারদর্শিতা দেখিয়ে বীরের মর্যাদা লাভ করেন, নেতার ক্ষেত্রেও একই রকম প্রতিযোগিতা প্রযোজ্য। জনতার ম্যাণ্ডেট নিয়ে এলে মানুষ তাকে সম্মানের সাথে দেখে। যেমন আমরা দেখেছি কামাল পারভেজকে। অবশ্য এক্ষেত্রে নেতার একটা চিন্তাও থাকে। উল্টাপাল্টা কিছু করলে তো ভোট চাওয়ার জন্য তাদের কাছে যাওয়া যাবে না । মানুষও ভোট দিবে না। অথচ এখন সে ভয়ও কেউ পায় না। বাধ্য না হলে সম্মানও কেউ করে না।

কামাল পারভেজ একজন ক্ষনজন্মা ছাত্রনেতা, একজন সামাজিক বীর। তিনি মারাও গেছেন এক নিবীহ ছাত্রের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে। তার মৃত্যুর পর লালমোহনের মানুষের শোক প্রকাশ করতে দেখেছি। সে কি দৃশ্য! তার জানাজায় এত মানুষ উপস্থিত ছিল- শুধু লালমোহনের মানুষ নয়, সারা ভোলার বিভিন্ন এলাকার মানুষ তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করতে আসে, তার জন্য অঝোর ধারায় চোখের পানি ফেলে, নারী পুরুষ, ছেলে বুড়ো, ছাত্র-ছাত্রী, কৃষক জেলে, ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদ সকলে তার জন্য কেঁদেছে।
মানুষ মরার গোষ্ঠী মরবেই। কিন্তু কামাল পারভেজের শহীদী মৃত্যু আমাদের কাছে সব সময় একজন বীরের মৃত্যু হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক, কালাম ফয়েজী, কথা সাহিত্যিক।

Facebook Comments Box


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি