LalmohanNews24.Com | logo

৩রা পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৬ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং

ইউসুফ-জুলেখার কাহিনীর জানা অজানা অধ্যায়

মোঃ জসিম জনি মোঃ জসিম জনি

সম্পাদক ও প্রকাশক

প্রকাশিত : এপ্রিল ০৩, ২০১৮, ১৪:১৮

ইউসুফ-জুলেখার কাহিনীর জানা অজানা অধ্যায়

আব্দুল্লা বিন মাহমুদ।।  রাজকুমারী রাঈলের ঘুম হঠাৎ করে ভেঙে গেল মাঝরাতে। ঘুম ভাঙার কারণটা স্পষ্ট মনে পড়ছে। এক পরম সুদর্শন পুরুষ দেখা দিয়েছিল তার স্বপ্নে। প্রতি রাতেই সে একই স্বপ্ন দেখছে। এ লোকটির সাথে নাকি তার বিয়ে হবে?

রাজকুমারীর নাম রাঈল হলেও তাকে লোকে জুলেখা বা জুলাইখা বলেই ডাকে। তার বাবা তাইমুর আবার রাজা রাআ’বীল নামেও খ্যাত, মিসরের ওপরের দিকের এক আরব ভূমির রাজ্যের রাজা তিনি। তার একমাত্র কন্যা রাঈল তথা জুলাইখার নামডাক চারিদিকে অসম্ভব সুন্দরী হিসেবে।

প্রতি রাত্রের সুখস্বপ্ন ভেঙে যেতে লাগলো স্বপ্নপুরুষকে দেখে দেখে, সেখানেই তার প্রেমে পড়ে যায় জুলাইখা। জিজ্ঞেস করে বসে এক রাতে, “আপনি কে?” উত্তর এলো যে, তিনি মিসরের উজির। এরপরই আবার ঘুম ভেঙে যায়।

রাজকন্যার জন্য একের পর এক বিবাহ প্রস্তাব আসতে থাকে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, সব প্রস্তাব সে প্রত্যাখ্যান করে দেয়। স্পষ্ট বলে দেয়, মিসরের উজির ছাড়া সে কাউকে বিয়ে করবে না। একগুঁয়ে মেয়ের কথা শুনলেন রাজা। প্রস্তাব পাঠাবার পর সেটি গ্রহণও করলেন মিসরের উজির। না দেখেই বিয়েতে রাজি হয়ে গেল জুলাইখা। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বরের কক্ষে গিয়ে চমকে ওঠে সে। এ তো সেই লোক না, এ তো বয়স্ক একজন! এ কী করলো জুলাইখা? কেন আগে পরখ করে দেখেনি? এখন তার একগুঁয়ে বিয়ে তো সে নিজে ভেঙে দিতে পারে না।

এতক্ষণে বুঝে যাবার কথা, কোন কাহিনী বলছি। তবে অচেনা শুরু দেখে থমকে যাবার কিছু নেই। হযরত ইউসুফ (আ:) এর কাহিনীর পাঠকদের একটা বড় অংশের প্রশ্ন ছিল, জুলাইখার ভাগ্যে কী হয়েছিল? জুলাইখার আসল পরিচয়ই বা কী? সেজন্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদীদের প্রধান গ্রন্থগুলো। দেখেছি পবিত্র কুরআন ও বাইবেল ছাড়াও অন্য কোথাও জুলাইখার কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় কিনা। এবং ইউসুফ জুলাইখার বিস্তারিত কাহিনীটা কেমন? প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কুরআন এবং বাইবেলে জুলাইখা নিয়ে খুব কমই বর্ণনা আছে। এমনকি তার নামটিও উল্লেখ নেই। দুই জায়গাতেই তাকে আজিজ মিসরির স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে। জুলাইখা নামটা আসলে মুসলিম ও ইহুদিদের সহায়ক ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে।

নামহীনা এ নারীকে নিয়ে হয়তো এতটা আগ্রহ মানুষের থাকতো না, যদি না পারস্যের কবি নুরুদ্দিন জামি (১৪১৪-১৪৯২)-র কবিতা বিখ্যাত না হতো। তিনি তার হাফত আওরাং (সাত সিংহাসন) গ্রন্থে এ গল্প বলেন। এরপর থেকে মুসলিম বিশ্বে এর জনপ্রিয়তা হয়ে যায় আকাশচুম্বী। আরবি, ফারসি, তুর্কি, উর্দু, হিন্দি এমনকি বাংলাতেও অনুবাদ হয়ে আসে সেটি। যেমন পঞ্চদশ শতকে শাহ মুহাম্মাদ সগির বাংলায় ইউসুফ-জুলেখা রচনা করেন। তিনি ছিলেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের রাজকবি। সুলতানের অনুরোধেই তিনি এটা লিখেছিলেন। অবশ্য তিনি কবিতার শেষে গিয়ে অদ্ভুত কিছু সংযোজন করে দিয়েছিলেন। এরপর আব্দুল হাকিব, শাহ গরিবুল্লাহ, গোলাম সাফাতুল্লাহ, সাদেক আলী ও ফকির মোহাম্মদও একই বিষয়ে লিখে যান।

কিন্তু লোকসমাজে এটি প্রেমকাহিনী নামে পরিচিতি পেলেও, আসলে এটি একপক্ষীয় রোমান্সের একটি উদাহরণ। এ কাহিনীর যে অংশ পাঠকেরা এখানে পড়লেন এটিও আসলে লোককাহিনী, যার নিশ্চয়তা দেয়া যায় না। তবে মূল কাহিনী যা কুরআন ও বাইবেলে রয়েছে তার আগে, পরে ও মাঝের কাহিনী বর্ণনার জন্য আবির্ভাব হয় আরব দেশীয় ও ইসরাইলী লোককাহিনীর, যা ‘কাসাসুল আম্বিয়া’ গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে। তবে কুরআন ও বাইবেল থেকে মূল বর্ণনা করবার সময় আমরা উল্লেখ করে নেব। আর, অধিকতর নির্ভরযোগ্যতার জন্য আমরা কুরআনের আয়াতও উল্লেখ করব। এছাড়াও সাহায্য নেয়া হবে তাফসিরে ইবনে কাসিরের। এ কাহিনীর লেজুড় হিসেবে আরেকটি অবিশ্বাস্য কাহিনীও আমরা বলব যেটির সূত্র যথা জায়গায় উল্লেখ করা হবে।

তবে অনেকেই ভাবতে পারেন, ইসলামি একটি কাহিনীর আগে-পরে লোককাহিনী কেন জুড়ে দিচ্ছি আমরা? এর কারণ হাজারো পাঠকের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তাদের জানার আগ্রহ মেটানো। অতিরিক্ত অংশ নিয়ে এখানে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন নয়, বরং এ বিষয়ে পৃথিবীতে কী কী বর্ণনা রয়েছে সেটা জানাই মুখ্য। তবে আর দেরি কেন? চলুন ফিরে যাওয়া যাক গল্পটির মাঝে।

কেন জুলেখা আগে পরখ করে দেখেনি? এখন তার একগুঁয়ে বিয়ে তো সে নিজে ভেঙে দিতে পারে না। কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো, বাসর রাত্রেই জুলেখা বুঝে গেল তার স্বামী প্রজননে অক্ষম। তিনি সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর সাথে সঙ্গমের চেষ্টাই করলেন না। অথচ, স্ত্রী তার সারা মিসরে, এমনকি সারা ভুবনে বিখ্যাত সুন্দরী।

নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মেরে এখানেই সংসার করতে লাগল জুলাইখা। নিজেদের সন্তান হবে না দেখে এক মেয়ে শিশুকে দত্তক নিলো তারা। নাম তার আসেনাথ।

সারা বাড়িতে অনেক চাকর বাকর, মোটামুটি চাকরদের পরিবারই প্রায় ৪০ খানা। একেকজনের কাজ একেক রকম। আগেকার প্রাসাদসম বাড়িতে যেমনটা হত আর কী। তার উপর স্বামী বিশাল বড় পদে, মিসরের উজির। অবশ্য বাইবেল বা তাওরাতের আদিপুস্তক বলছে, তিনি ছিলেন প্রাসাদরক্ষীদের প্রধান, বা মিসরীয় সেনাবাহিনীরও প্রধান। কোথাও আবার বলা তিনি ছিলেন অর্থমন্ত্রী। অর্থাৎ, তিনি যে উচ্চপদস্থ ছিলেন এ ব্যাপারে কোনোই সন্দেহ নেই। বাইবেলে তার নাম পতিফার (פוטיפר), তাফসিরে কিতফির। ‘পতিফেরা’ নামের সংক্ষিপ্ত হিব্রু ভার্সন পতিফার। পতিফেরা অর্থ ‘সূর্যদেবতা রা-এর উপহার’। এ থেকেই বোঝা যায় তখন যে মিসরে দেবদেবীর পূজো চলত পুরো দমে, একেশ্বরবাদ তখনো সেখানে পৌঁছেনি।

এরকম এক সময়, উজির একদিন বাজার থেকে ফিরে এলেন সাথে একজন দাসকে নিয়ে, মিসরের বাজারে তাকে বিক্রি হতে দেখেছিলেন তিনি, আরব ইসমাইলি বণিকদের থেকে তিনি তাকে কিনে নেন। ১৮ বছর বয়স তার। কুরআন অনুযায়ী, উজির জুলাইখাকে বলেছিলেন, একে সম্মানে রাখতে। তাকে পালিত পুত্র হিসেবেও তিনি রাখতে চেয়েছিলেন।

লোককথা বলছে, বাড়িতে তাকে নিয়ে আসার পর জুলাইখা যখন তাকে প্রথম দেখল, তার চোখ আটকে গেল, ছানাবড়া হয়ে গেল। এ কী মানুষ না ফেরেশতা? এত সুন্দর কোনো পুরুষ হতে পারে? কিন্তু বিস্ময়ের আসল কারণ এটা ছিল না, কারণটা ছিল- এ যে তার স্বপ্নে দেখা সেই মানুষটাই! উজির ভেবে উজিরের দাসকে দেখেছিল জুলাইখা?

জানা গেল, দাস ব্যবসায়ীরা এক কুয়া থেকে তুলে এই হিব্রু কিশোরকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছে। নাম তার ইউসুফ।

এমনিতেই জুলাইখার কামনা পূরণ হয়নি। তার উপর তার স্বপ্নপুরুষ তারই সামনে সারাদিন কাজ করে। তার বাসনা বাড়তেই লাগল।ইউসুফ (আ) এর পদ ছিল উজিরের স্ত্রীর প্রধান সেবক। ধীরে ধীরে বাড়ির প্রধান পরিচারক হয়ে উঠলেন ইউসুফ (আ), বাইবেল তা-ই বলছে। জুলাইখা আর সইতে পারল না।

কুরআনে তাকে ‘সে মহিলা’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। এরপর যা হল, কুরআনের ভাষায়, “আর সে যে মহিলার ঘরে ছিল, ঐ মহিলা তাকে ফুসলাতে লাগল এবং দরজাসমূহ বন্ধ করে দিল। সে মহিলা বলল, “শোন! তোমাকে বলছি, এদিকে আস।” সে বলল, “আল্লাহ রক্ষা করুন; তোমার স্বামী আমার মালিক। তিনি আমাকে সযত্নে থাকতে দিয়েছেন। নিশ্চয় সীমা লংঘনকারীগণ সফল হয় না।”

একই ঘটনা বাইবেল বলছে এভাবে, “তাই পতিফার তার বাড়ীর সব কিছুর ভারই ইউসুফের হাতে দিয়ে দিলেন, কেবল নিজের খাবারটা ছাড়া আর কিছুরই জন্য তিনি চিন্তিত ছিলেন না। ইউসুফ ছিলেন অত্যন্ত রূপবান ও সুদর্শন পুরুষ। কিছু সময় পরে ইউসুফের মনিবের স্ত্রীও তাকে পছন্দ করতে শুরু করল। একদিন সে তাকে বলল, “আমার সঙ্গে শোও।” কিন্তু ইউসুফ প্রত্যাখ্যান করে বলল, “আমার মনিব জানেন তার বাড়ীর প্রতিটি বিষযের প্রতি আমি বিশ্বস্ত। তিনি এখানকার সব কিছুর দায় দায়িত্বই আমাকে দিয়েছেন। আমার মনিব আমাকে এই বাড়ীতে প্রায় তার সমান স্থানেই রেখেছেন। আমি কখনই তার স্ত্রীর সঙ্গে শুতে পারি না। এটা মারাত্মক ভুল কাজ! ঈশ্বরের বিরুদ্ধে পাপ কাজ।” স্ত্রীলোকটি রোজই ইউসুফকে এ কথা বলত, কিন্তু ইউসুফ রাজী হতেন না।”

ইউসুফ (আ) হাজার হলেও মানুষ, একজন পরমা সুন্দরী তাকে প্রতিদিন এরকম প্রস্তাব দিলে মন গলবারই কথা। কিন্তু তিনি ছিলেন অটল। কিন্তু হ্যাঁ, তার মন গলা অসম্ভব ছিল না বলে জানায় কুরআন– “নিশ্চয় মহিলা তার বিষয়ে চিন্তা করেছিল এবং সেও মহিলার বিষয়ে চিন্তা করত যদি না সে স্বীয় পালনকর্তার মহিমা অবলোকন করত। এমনি হয়েছে,আমি তার কাছ থেকে মন্দ বিষয় ও নির্লজ্জ বিষয় সরিয়ে দেই। নিশ্চয় সে আমার মনোনীত বান্দাদের একজন।”

লোককাহিনী জানায়, কদিন বাদে বাইরের কাজ সেরে যখন ইউসুফ (আ) বাসায় এলেন, তখন জুলাইখা তাকে অন্দরমহলে ডাকলো। আশেপাশে ছিল নানা চিত্রকর্ম। সেখানে দেখা যাচ্ছিল, কপোত-কপোতীরা যৌনক্রিয়ায় রত।

কক্ষে ইউসুফ (আ) ঢোকার পর জুলাইখা আনুবিসের মূর্তিতে চোখের উপর রুমাল দিয়ে দিল। জোসেফ জিজ্ঞেস করল, “কী করছেন?”

জুলাইখার উত্তর ছিল, “আমি চাই না দেবতা আনুবিস দেখুক, আমরা কী করতে যাচ্ছি…”

ইউসুফ (আ) একটু পিছিয়ে গেলেন।

জুলাইখা বলল, “দেখ এ ছবিগুলো, এরা করতে পারলে, আমরা কেন পারব না? এসো…” বলে বিছানায় শুয়ে পড়ল জুলাইখা।

কিন্তু, ইউসুফ (আ) উলটো দরজা খুলে দৌড় দিলেন। ইউসুফ (আ) এর প্রত্যাখ্যান জুলাইখাকে আরও উত্তেজিত করে তুলল, সেও তাকে ধরবার জন্য দৌড় দিল। একপর্যায়ে তাকে প্রায় ধরেই ফেলল।

ইউসুফ (আ) এর জামার পেছনের অংশ ছিঁড়ে জুলাইখার হাতে চলে এল। ঠিক একই মুহূর্তে দরজায় পৌঁছাল তারা। আর সাথে সাথে দরজা খুলে গেল ওপাশ থেকে।

জুলাইখার স্বামী দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। (কোনো কোনো বর্ণনায় স্বামীর সাথে এক আত্মীয়ের কথাও বলা হয়) এবং তখনই জুলাইখা স্বর পরিবর্তন করে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ করে বসল।

কুরআনের ভাষ্যে, “তারা উভয়ে ছুটে দরজার দিকে গেল এবং মহিলা ইউসুফের জামা পিছন দিক থেকে ছিঁড়ে ফেলল। উভয়ে মহিলার স্বামীকে দরজার কাছে পেল। মহিলা বলল: “যে ব্যক্তি তোমার পরিজনের সাথে কুকর্মের ইচ্ছা করে, তাকে কারাগারে পাঠানো অথবা অন্য কোনো যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেয়া ছাড়া তার আর কি শাস্তি হতে পারে?” ইউসুফ (আঃ) বললেন, “সেই আমাকে আত্মসংবরণ না করতে ফুসলিয়েছে।”

লোককাহিনী মতে, সেই আত্মীয় তখন বলল, যদি ইউসুফ (আ) এর জামার সামনের দিক ছেঁড়া থাকে, তবে ইউসুফ (আ) দোষী, আর তার পেছনের দিক ছেঁড়া হলে, জুলাইখা দোষী। কুরআনের ভাষ্যে, “মহিলার পরিবারে জনৈক সাক্ষী দিল যে, যদি তার জামা সামনের দিক থেকে ছিন্ন থাকে, তবে মহিলা সত্যবাদিনী এবং সে মিথ্যাবাদী। এবং যদি তার জামা পেছনের দিক থেকে ছিন্ন থাকে, তবে মহিলা মিথ্যাবাদিনী এবং সে সত্যবাদী।”

উপকথায় এমনটাও বলা আছে যে, এই কথাটা অলৌকিকগুণে দত্তক কন্যা শিশু আসেনাথ বলেছিল। এমনকি ইবনে কাসিরের তাফসিরেও বলা আছে যে, ইবনে আব্বাস (রা) এর হাদিসে, রাসুল (সা) বলেছেন, চারজন শিশু অবস্থায় কথা বলেছিল, যার মাঝে একজন ইউসুফ (আ) এর সাক্ষী।

দেখা গেল, আসলে দোষী জুলাইখা। তাই জুলাইখাকে উজির বললেন মাফ চাইতে ইউসুফ (আ) এর কাছে।

কুরআন বলছে, “অতঃপর গৃহস্বামী যখন দেখল যে, তার জামা পেছন দিক থেকে ছিন্ন, তখন সে বলল, নিশ্চয় এটা তোমাদের ছলনা। নিঃসন্দেহে তোমাদের ছলনা খুবই মারাত্মক। ইউসুফ, এ প্রসঙ্গ বাদ দাও! আর হে নারী, এ পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর নিঃসন্দেহে তুমিই পাপাচারিণী।”

কিন্তু এরকম একটা ঘটনা চাপা থাকে না। ঘটনাচক্রে, ৫ জন চাকরের স্ত্রী বাইরে গিয়ে এ ব্যাপারটা মানুষকে বলে দিল, তারা নিজেরাও ঈর্ষান্বিত ছিল জোসেফের সঙ্গ না পেয়ে। লোককাহিনীতে এমনটাই বলা। শহরে এ গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে উজিরের স্ত্রী এক হিব্রু দাসের প্রেমে পড়েছে।

কুরআনের ভাষায়, “নগরে মহিলারা বলাবলি করতে লাগল যে, আযীযের স্ত্রী স্বীয় গোলামকে কুমতলব চরিতার্থ করার জন্য ফুসলায়। সে তার প্রেমে উন্মত্ত হয়ে গেছে। আমরা তো তাকে প্রকাশ্য ভ্রান্তিতে দেখতে পাচ্ছি।”

এরকম সময় জুলাইখা সে নারীদের আমন্ত্রণ করল। ভোজসভায় সবাইকে ছুরি দিয়ে যখন সে বলল ফল কাটতে, তখনই ইউসুফ (আ)-কে হাজির করল সকলের সামনে। এরপর আর কী, সকলের হাত কেটে গেল এ সুপুরুষকে দেখতে গিয়ে।

কুরআনের ভাষায়, “যখন সে তাদের চক্রান্ত শুনল, তখন তাদেরকে ডেকে পাঠাল এবং তাদের জন্যে একটি ভোজ সভার আয়োজন করল। সে তাদের প্রত্যেককে একটি ছুরি দিয়ে বলল: “ইউসুফ, এদের সামনে চলে এস।” যখন তারা তাকে দেখল, হতভম্ব হয়ে গেল এবং আপন হাত কেটে ফেলল। তারা বলল: “কখনই নয়, এ ব্যক্তি মানব নয়। এ তো কোনো মহান দেবদূত।” মহিলা বলল: “এ ঐ ব্যক্তি, যার জন্যে তোমরা আমাকে ভৎর্সনা করছিলে। আমি ওরই মন জয় করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে। আর আমি যা আদেশ দেই, সে যদি তা না করে, তবে অবশ্যই সে কারাগারে প্রেরিত হবে এবং লাঞ্চিত হবে।” ইউসুফ বলল: “হে পালনকর্তা. তারা আমাকে যে কাজের দিকে আহবান করে, তার চাইতে আমি কারাগারই পছন্দ করি। যদি আপনি তাদের চক্রান্ত আমার উপর থেকে প্রতিহত না করেন, তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাব।” অতঃপর তার পালনকর্তা তার দোয়া কবুল করে নিলেন। এরপর তাদের চক্রান্ত প্রতিহত করলেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। অতঃপর এসব নিদর্শন দেখার পর তারা তাকে কিছুদিন কারাগারে রাখা সমীচীন মনে করল।”

জুলাইখার অনুরোধে উজির ইউসুফ (আ)-কে দোষী সাব্যস্ত করে জেলে প্রেরণ করতে বাধ্য হলেন। কিন্তু তিনি জানতেন যে, ইউসুফ (আ) নির্দোষ।

জুলাইখার সংসার আর স্বাভাবিক থাকল না। তবে সে ঠিকই তার স্বপ্নপুরুষের খবর রাখতে লাগল।

একসময় সে জানল, ইউসুফ (আ) এর সাহায্যে মিসর-রাজ স্বপ্নের অর্থ পেয়েছেন। তিনি মনে করেন, ইউসুফ (আ) নির্দোষ। জুলাইখার তলব পড়ল। সে সব দোষ স্বীকার করে নিল।

কুরআনের ভাষায় ঘটনা এরকম- “বাদশাহ বলল: “তোমরা ইউসুফকে আমার কাছে নিয়ে এসো।” যখন দূত ইউসুফের কাছে হাজির হলো তখন সে বলল, “ফিরে যাও তোমাদের প্রভুর কাছে এবং জিজ্ঞেস কর তাকে ঐ মহিলার স্বরূপ কী, যারা স্বীয় হস্ত কর্তন করেছিল! আমার পালনকর্তা তো তাদের ছলনা সবই জানেন।” বাদশাহ মহিলাদেরকে বললেন: “তোমাদের হাল-হাকিকত কি, যখন তোমরা ইউসুফকে আত্মসংবরণ থেকে ফুসলিয়েছিলে?” তারা বলল: “আল্লাহ মহান, আমরা তার সম্পর্কে মন্দ কিছু জানি না।” আযীয-পত্নী বলল: “এখন সত্য কথা প্রকাশ হয়ে গেছে। আমিই তাকে আত্মসংবরণ থেকে ফুসলিয়েছিলাম এবং সে সত্যবাদী।” ইউসুফ বললেন: “এটা এজন্য, যাতে আযীয জেনে নেয় যে, আমি গোপনে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি। আরও এই যে, আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের প্রতারণাকে এগোতে দেন না। আমি নিজেকে নির্দোষ বলি না। নিশ্চয় মানুষের মন মন্দ কর্মপ্রবণ, কিন্তু সে নয়-আমার পালনকর্তা যার প্রতি অনুগ্রহ করেন। নিশ্চয় আমার পালনকর্তা ক্ষমাশীল, দয়ালু।”

এ পর্যায়ে উপকথার কোনো কোনো ভার্সন বলে, জুলাইখাকে কিছু করা হয়নি। কোথাও বা বলে, তাকে কয়েক বছরের জেল দেয়া হয়। আর উজির মারা যান। উল্লেখ্য, বাইবেল বা কুরআন কোথাও জুলাইখার ভাগ্যে এরপর কী হয়েছিল তার কথা বলা নেই। তাই আমরা এখন ফিরে যাব অন্য উৎসের দিকে। আর সেটি হলো বাইবেলের অ্যাপোক্রাইফা। ব্রিটিশ লাইব্রেরির ১৭২০২ নং পাণ্ডুলিপি হলো সিরিয়াক ভাষায় লিখিত ‘জোসেফ (ইউসুফ) ও আসেনাথ’। ষষ্ঠ শতকে এটি লেখা হয়েছিল। মূল গ্রিক ভাষার আদি এক কপির অনুবাদ সেটা। ৫৫০ সালের দিকে সিরিয়াক লেখক মোজেস অফ ইঙ্গিলা এ অনুবাদ কাজটি করেছিলেন। পরে ৫৭০ সালের দিকে সবগুলো পাণ্ডুলিপির একত্রীকরণ করা হয়। উল্লেখ্য, সে বছরই জন্ম হয় হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর।

তবে বাইবেলের এ অ্যাপোক্রাইফা পাণ্ডুলিপির ক্ষেত্রে আমরা নামটা জোসেফই বলব, যতক্ষণ এ কাহিনী চলবে।

সেই শিশু কন্যা আসেনাথ-এর কথায় আসা যাক। জুলাইখা আর উজিরের সেই দত্তক কন্যা, মনে আছে? কোনো কোনো উপকথা মতে, সংসার ভেঙে যাবার পর আসেনাথকে পাঠিয়ে দেয়া হয় দূরের এক সম্ভ্রান্ত লোকের পরিবারে। (হতে পারে তার নিজেরই পরিবার, শখের বশে তাদের কাছ থেকে কন্যা নিয়েছিলেন উজির) বলা যায়, এক জমিদার পরিবার। প্রাচীন মিসরের হেলিওপলিস নগরীর রা দেবতার মন্দিরের পুরোহিত ছিলেন তিনি, নাম তার পতিফেরা। (একই নাম ছিল জুলাইখার স্বামীরও)

ধীরে ধীরে আসেনাথ বড় হল, সুন্দরী এক তরুণী। তবে তার মধ্যে পুরুষ বিদ্বেষ কাজ করত। ততদিনে জোসেফ হয়ে গেছেন উজির, মিসরিয় ভাষায় তার নাম দেয়া হলো সাফনত্‌-পানেহ (Zaphnath-Paaneah)।

কোনো এক কাজে জোসেফ এই জমিদারের বাড়িতে একদিন বেড়াতে এলেন। জমিদার চাইতেন আসেনাথের সাথে তার বিয়ে দিতে। কিন্তু আসেনাথ পুরুষদের ঘৃণা করে। বিয়ের প্রশ্নই আসে না।

কিন্তু সুপুরুষ জোসেফকে প্রথম যেদিন দেখল সে, সেদিনই কোনো এক জাদুবলে তার পুরুষবিদ্বেষ উধাও! বিয়ে করতে আগ্রহী সে।

সেদিন রাত্রে এক দেবদূত এলেন তার কক্ষে। এসে তাকে দেবদেবীদের থেকে দূরে থাকতে বললেন যদি জোসেফকে বিয়ে করতে চায়, সে রাজি হয়ে গেল। দেবদূত তার সামনে স্বর্গীয় এক মৌচাক রাখলেন, সেখান থেকে মৌমাছি এসে আসেনাথের ঠোঁটে দংশন করে গেল। কিছু সময় পর আবার সেটা ঠিক হয়ে গেল।

এরপর ধুমধাম করে জোসেফের সাথে বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু মিসররাজের ছেলে আসেনাথকে ভালবাসত। তাই তাকে বিয়ে করতে না পারায় জোসেফের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে গেল।

ততদিনে মিসরে আস্তানা গেড়েছে জোসেফের ভাইয়েরাও। এরপরের কাহিনী সংক্ষেপে এমন, এক রাতে জোসেফের দুজন বিশ্বাসঘাতক ভাইয়ের সাহায্য নিয়ে যুবরাজ জোসেফকে খুন করতে গেল। ওদিকে আসেনাথ গুপ্তচরের সাহায্যে জেনে গেল সেটা। সাইমন আর লেভি নামের দুজন ভাই-এর সহায়তায় জোসেফকে রক্ষা করা হল। তারা তাকে বহুদিন আগে কুয়ায় ফেলার প্রায়শ্চিত্ত করল। পরে ছোট ভাই বিনইয়ামিন হত্যা করল সেই রাজপুত্রকে।

ভাগ্যের চাকা ঘুরে জুলাইখার পরিবারের আসেনাথ জুলাইখারই ভালোবাসা ইউসুফ (আ) এর স্ত্রী।

এরপর বাকি গল্পটা বলতে আশ্রয় নিতে হবে লোককাহিনীর।

সবই শুনত জুলাইখা, এখন জেল থেকে বেরিয়ে সে ভিখারিনী। শুনল আসেনাথের দুই পুত্র হয়েছে।

একদিন পথের ধারে বসে আছে জুলাইখা, তখন হঠাৎ জটলা বেধে গেল সামনে। জানা গেল, উজির ইউসুফ (আ) আসছেন। কী মনে করে জুলাইখা এগিয়ে গেল তার দিকে, যদিও বেশিদূর যেতে পারল না। তাফসির বলছে, জুলাইখা বলে উঠল, “সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি তার প্রতি আনুগত্যের কারণে দাসদের বাদশাহী আসনে বসিয়েছেন আর নাফরমানির কারণে বাদশাহদের দাসে পরিণত করেছেন।”

ইউসুফ (আ) খেয়াল করলেন, বয়স্কা এক মহিলা তার দিকে আসতে চাচ্ছে। তিনি নিজেই তার কাছে গেলেন, “কে আপনি? কী বলতে চান?”

“আমি জুলাইখা। আমি আজও তোমাকে ছাড়া কাউকে চাইনি…”

নবী ইউসুফ (আ) বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। পরে, উপকথা মতে ইউসুফ (আ) তার হাত রাখলেন জুলাইখার কপালে। হাত সরাতেই দেখা গেল, জুলাইখার বয়সের ছাপ চলে গিয়েছে। সেই আগের সুন্দরী জুলাইখা দাঁড়িয়ে আছে ওখানে।

কোনো কোনো মতে, এরপর ইউসুফ (আ) এর দ্বিতীয় স্ত্রী হন জুলাইখা। সেদিনই জুলাইখা বুঝতে পারেন, বহু আগে দেখা সে স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। সুদর্শন সে স্বপ্নপুরুষ আসলেই মিসরের উজির। আর সত্যি আজ সে তার স্ত্রী।

স্ত্রী আসেনাথের গর্ভে ইউসুফের দুই পুত্র সন্তান জন্ম নিয়েছিল, তাদের নাম ছিল আফ্রাসীম বা এফ্রায়িম (אֶפְרַיִם) ও মিশা বা মানাসেহ (מְנַשֶּׁה)। তবে কোনো কোনো বর্ণনা এটাও দাবি করে যে, এ সন্তান দুজন আসলে রাঈল বা জুলাইখার গর্ভে জন্মেছিল। এদের মাঝে প্রথম জনের ঔরসে জন্ম নিয়েছিলেন নূন নামের এক এক ব্যক্তি। নূনের পুত্র ইউশা (আ) হযরত মূসা (আ) এর মৃত্যুর পর নবী হয়েছিলেন এবং বনী ইসরাইলকে পবিত্র ভূমিতে নিয়ে যান।

 

 

Facebook Comments


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি