LalmohanNews24.Com | logo

৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২০শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং

আতঙ্কের নাম যখন ডেঙ্গু

আতঙ্কের নাম যখন ডেঙ্গু

বছরের জুন-জুলাই মাসে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার প্রজনন মৌসুম। এসময় প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে নগরীর বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকে। আর এসব জমে থাকা পানি থেকেই জন্ম হয় এডিস মশার।

চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি থেকে মে) রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ৩২৪। কিন্তু জুনে এক লাফে এর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ গুণ অর্থাৎ ১ হাজার ৭৫০ জনে দাঁড়ায়। এ মাসের প্রথম ৮ দিনে ১ হাজার ১৮২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, গত মাসের তুলনায় চলতি মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আরো বাড়বে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার জানান, ১ জানুয়ারি থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ২৫৬। তাদের মধ্যে জানুয়ারিতে ৩৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৮, মার্চে ১৭, এপ্রিলে ৫৮, মে মাসে ১৯৩, জুনে ১ হাজার ৭৫০ এবং জুলাই এর ৯ তারিখ পর্যন্ত ১ হাজার ১৮২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে এপ্রিলে ২ জন ও জুলাইয়ে একজনের মৃত্যু হয়। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন এমন রোগীর সংখ্যা ৬৩৩ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে  রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ২১৪ জন ভর্তি হয়েছেন। এ হিসাবে প্রতি ৭ মিনিটে কমপক্ষে একজন ডেঙ্গু জ্বরের রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. একেএম শামসুজ্জামান জানান, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ১ ও ২ নম্বর সেরোটাইপের মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটেছিল। কিন্তু গতবছর ৩ নম্বর সেরোটাইপের দেখা পাওয়া যায়। আগে থেকে সেরোটাইপ সম্পর্কে জানতে পারলে রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি রোধে বিশেষ ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়।

রোববার রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, মহাখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, এলাকাবাসীর মধ্যে ডেঙ্গু আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির পানি ও ময়লা পানি জমে থাকতে দেখা গেছে।

বেসরকারি কর্মকর্তা ইকবাল হাসান নামের মিরপুরের এক বাসিন্দা জানান, ময়লা-আবর্জনার কারণে ও বৃষ্টির পানি জমে থাকার ফলে এলাকায় মশার উৎপাত অনেক বেড়েছে।

তিনি আরো বলেন, বাসায় ঘুমানোর সময় সব সময় মশারি ব্যাবহার করি তারপরও খুব আতঙ্কে থাকি কখন যে পরিবারের কোন সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রন্ত হয়।

মহাখালী কাঁচাবাজারের পাশে একটি ফ্লাটের বাসিন্দা রিনা আক্তার। ডেঙ্গু আতঙ্ক সম্পর্কে তিনি বলেন, ডেঙ্গুর কারণে তার একমাত্র ছেলে গত ৭দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।

তিনি আরো বলেন, সিটি কর্পোরেশন থেকে মশা নিধনের ওষুধ নিয়ে আসার কথা থাকলেও নিয়মিত তারা আসেন না। ওষুধ দিলে কিছু সময়ের জন্য মশা একটু কম থাকে। কিছুক্ষণ পর আবার সেই আগের মতই হয়ে যায়।

গত দশ দশকে ডেঙ্গু-

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টারের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আকতার জানান, ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের ৬ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডেঙ্গুতে মোট ৫২ হাজার ৮৪০ জন ভর্তি হন।

এ সময়কালে (২০০০ থেকে ২০১৯ সাল) ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যু হয় ২৯৯ জনের।

বর্ষার আগে করা একটি জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৭টি আর দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১৫টি ওয়ার্ড রয়েছে ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে।

সিটি কর্পোরেশন বলছে, ঢাকা ও এর আশেপাশে ২৮টি সরকারি ও ৩৬টি বেসরকারি হাসপাতালের ১ হাজার ৩৫০ জন চিকিৎসক ও ১৫৯ জন সেবিকাকে দেয়া হয়েছে ডেঙ্গু চিকিৎসার বিশেষ প্রশিক্ষণ।

চিকিৎসকরা জানান, কোনো ব্যক্তি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তার জ্বরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়। ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর উঠতে পারে। তরুণ ও শিশুদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পরেও উপসর্গ দেখা যায় খুবই সামান্য। কখনো বা একেবারেই উপসর্গহীন থাকে। তবে এসব উপসর্গ স্পষ্টভাবে লক্ষণীয় হয় ডেঙ্গুর ভাইরাসবাহী মশা কামড়ানোর তিন থেকে সাত দিন পর। ডেঙ্গু সচরাচর এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়। তবে কোনো কোনো পরিস্থিতে কিছু রোগী মৃত্যুঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

ডেঙ্গুর কিছু সাধারণ উপসর্গ হল- মাথাব্যথা, হাড়ের জোড় ও পেশিতে ব্যথা, বমিভাব ও বমি হওয়া, গ্রন্থি ফুলে যাওয়া, সারা শরীরের ফুসকুড়ি দেখা দেয়া, চোখের পেছনে ব্যথা হওয়া ইত্যাদি।

ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের উপসর্গ হল- শ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা হওয়া অথবা শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে যাওয়া। অবিরাম অস্বস্তি, ত্বকের ভেতরের অংশে রক্তক্ষরণের কারণে ত্বকের উপরের অংশে লাল ছোপ সৃষ্টি হওয়া। বমি, মল কিংবা প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, প্রচণ্ড পেটব্যথা ও অনবরত বমি হওয়া, নাক ও দাঁতের মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ ও অবসাদ।

বিশেষজ্ঞ মতে, মশার কামড়ের মাধ্যমে ভাইরাসজনিত রোগ ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে। ডেঙ্গু প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হলো সর্তকতা।

তারা বলেন, বাসা বাড়ির প্রতিটি আঙ্গিনার দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে করে কোথাও যেন বৃষ্টির পানি বা ময়লা পানি জমে না থাকে। বাড়ির আঙ্গিনাসহ আশপাশের সব জায়গা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখলে ও ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করলে এ রোগ থেকে প্রতিকার পাওয়া যায়।

Facebook Comments


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি