LalmohanNews24.Com | logo

৭ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

গল্প : আঁধার রাত

গল্প : আঁধার রাত

ঘুটঘুটে অন্ধকার। হ্যারিকেন হাতে গায়ের পথে হেটে চলছে রহমত আলী। চোখে মুখে ভয়ের চিহ্ন। এই বুঝি কেউ তাকে দেখে ফেলবে। গ্রামের চারদিকেই স্বজাতি শত্রুরা ওঁৎ পেতে আছে। মাঝে মধ্যে পাকবাহিনীর জীপগাড়িও টহল দেয় মূল সড়কে। মূল সড়ক থেকে গ্রামের এই বিকল্প সড়কটি মোটামুটি নিরাপদ। কিন্তু ভয় থাকে জেলা সদরে তাদের ঘাঁটি। ভোলা থেকে ৪৭ কিলোমিটার দূরে লালমোহন উপজেলা সদর। শত্রুদের কানে খবর পৌছে গেলে এ পথেও ছুটে আসতে পারে তারা। রহমত আলী এশার নামাজ পড়েই হ্যারিকেন নিয়ে বিকল্প পথে হেটে চলছে লালমোহনের উদ্দেশ্যে। ভোলা সদর থেকে মুক্তিবাহিনী দলের জেলা প্রধানের বার্তা নিয়ে এসেছে। এলাকার মুক্তিবাহিনীর কাছে পৌছাতে হবে যে কোন মূল্যে। যদি ধরা পড়ে যায় তাহলে বাঁচার জন্য বিকল্প কিছু বলতে হবে। দীর্ঘ পথ হাটতে হাটতে ক্লান্ত। তবুও বিশ্রামের সুযোগ নেই। রাতের মধ্যেই খবরটা দিতে হবে। রহমত আলী হেটে চলছে অভিরাম। মধ্য রাতে পেছনে পড়ে থাকে ধানের ক্ষেত, শয়ে শয়ে শনের বাড়ি। বাড়ি থেকে নিভু নিভু আলো দেখা যাচ্ছে জোনাকির মতো। মানুষগুলো সব ঘুমে আচ্ছন্ন না হলেও এখনো জেগে আছে হয়তো কেউ কেউ। রহমত আলীর মনে সাহস জাগে। ইচ্ছে হচ্ছে একটি বাড়িতে যেয়ে একটু জিড়িয়ে নিতে। এক গ্লাস পানি খেতে। হাটতে হাটতে পানির প্রচুর তৃষ্ণা পেয়েছে। মধ্যরাতে হয়তো দু’একজনকে এখনো নির্ঘুম পাওয়া যাবে। সাহস করে একটি শনের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল রহমত আলী।
-ঘরে কেউ আছেননি? হাঁক ছাড়ে রহমত আলী।
কিন্তু না ঘর থেকে কোন জবাব আসছে না। অথচ ভেতরে আলো জ্বলতে দেখা যাচ্ছে বাইরে থেকে। আবার হাঁক ছাড়ে।
-ঘরে কেউ থাইকলে এট্টু বাইর অন। এক গ্লাস পানি খাওন দরকার।
আবারো কোন জবাব আসে না। রহমত আলী ডেকেই যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর হোগলা পাতার বেড়া দেওয়া দরজাটা ফাঁক করার শব্দ পায় রহমত আলী। কেউ একজন উঁকি মেরে বাইরের দিকে তাকালো। কিন্তু অন্ধকারে তার চেহারাটা দেখা যাচ্ছিল না। একটা আওয়াজ আসে
-কে আপনি এতো রাতে?
কন্ঠটা শুনে রহমত আলী কিছুটা আৎকে উঠলো। এতো পুরুষ কন্ঠ নয়। একজন জোয়ান মাইয়া মানুষের কন্ঠ।
-আমি লালমোহনের মানুষ। ভোলা থেইক্কা এই পথ দিয়া যাইতাছিলাম। অনেক পানির পিপাসা লাগছে। এট্টু পানি খাওয়াইবেন।
একটু পড়েই সিলভারের গ্লাসে পানি নিয়ে দরজা ফাঁক করে বাইরে বের হয়ে আসলো সে।
-এই ধরেন, পানি খান।
রহমত আলী হাতের হ্যারিকেনের আলোয় পানি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা নারীকে দেখলো একনজর। এতো পূর্ণ যুবতী একজন মাইয়া মানুষ। মুখটা অর্ধ গোমটায় ঢাকা থাকলেও অনুমান করা যায়। হাত থেকে পানির গ্লাসটি নিতে নিতে তাকিয়ে দেখলো এতো রূপবতী। একা একা এই ঘরে থাকে!
এক নিঃশ্বাসে পানি খেয়ে নিলো রহমত আলী। এরপরই খালী গ্লাসটি ফেরত দিয়ে বললো ‘আমনে এই ঘরে একলা থাকেন, আর কেউ ঘরে নাই?’
প্রশ্ন শুনে গোমটা পড়া নারী বললো, অহন একলাই থাকি। তবে আমার স্বামী আছিল।
-অহন কই?
– হ্যায় ভোলায় মুক্তিযুদ্ধের ট্রের্নিংয়ে গেছে, কবে আইবো ঠিক নাই।
– আমনেরে ঘরে একলা থুইয়া গেছে। বিপদ আপদের ভয় নাই?
অচেনা পুরুষের মুখে বিপদ আপদের কথা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো নারীটি। বিপদ আপদ যে সারাক্ষণ তাড়া করে বেড়ায় সে কথা কেমনে বলে পর পুরুষের কাছে। এই যে মধ্যরাতে এই অচেনা লোক, তার কাছ থেকেও তো বিপদ আপদের ভয় আছে।
নারীর মুখে কোন শব্দ বের না হওয়ায় রহমত আলী তার স্বামীর নাম জিজ্ঞেস করে।
-হ্যার নাম আলাউদ্দিন। ঢাকায় আনসারে চাকরী করতো। গত মাসে বাড়ি আসলো। আমারে পাশের গ্রাম থেইক্কা বিয়া কইরা আনলো। নতুন এই ঘর বাইন্ধা আমারে নিয়া থাকতো। কিন্তু তারে আর ঘরে রাখতে পারলাম না। আমারে একলা থুইয়া চইল্যা গেলো ট্রের্নিং দিতে। আমি তারে যাইতে না করছিলাম। কিন্তু হেয় হুনেনি। আমারে কইলো, দেশ স্বাধীনের ডাক পড়ছে। অহন ঘরে বইয়া থাইকলে দেশটারে কেমনে স্বাধীন করুম। এরপর হেয় চইল্যা গেলা।
আলাউদ্দিনের স্ত্রীর মুখে কথাগুলো শোনার পর রহমত আলী যেন কোথায় হারিয়ে গেলো। ‘এক মাস আগে বিয়া কইরা এভাবে বউরে কেউ একা থুইয়া যায়। আহহারে দেশের জন্য কত টান হের। নিজের নতুন বউয়ের চেয়ে দেশকে আলাউদ্দিন কতই না বড় কইরা দেখলো। এর মত মুক্তিযোদ্ধারে তো শতবার সালাম করা উচিত।’
-আচ্ছা, আপনি তো আপনার মা-বাবার কাছেও থাকতে পারতেন। প্রশ্ন করে রহমত আলী।
– আমার মা নাই। বাবাও ট্রের্নিংয়ে গেছে। তাই এখানেই রইয়া গেলাম। তাছাড়া এই গ্রাম তো আর শহরের কাছে না। এখানে কোন বিপদ আপদের ভয় নাই।
আলাউদ্দিনের স্ত্রীর সাহস দেখে মুগ্ধ হয় রহমত আলী। এই গাঁয়ে একলা থাইক্যাও কোন ভয় পায় না। কত বড় সাহসী। আজ মধ্য রাতে এই যে একজন পরপুরুষ এই ঘরে আসলো এটাও কি বিপদ হতে পারে না। তাছাড়া যদি আশেপাশের কেউ দেখে ফেলে তাহলে তো বিপদের সীমা থাকবে না। এসব চিন্তাও নেই আলাউদ্দিনের স্ত্রীর। হয়তা বা মনে মনে ভয় কাজ করে। যেটা লুকিয়ে রেখেছে সে। কত সহজ সরল গ্রামের মেয়েরা।
-আচ্ছা আমিও ট্রের্নিং থেইক্কা আইছি। ভোলায় আমাদের ট্রের্নিং হইছে। আপনার স্বামীর নাম আলাউদ্দিন বলেছেন। আগে জানলে তারে খুইজ্যা বের করতে পারতাম। যাক পরশু আবার যাবো, তখন না হয় তারে খুইজ্যা পরিচয় কইরা নিব।
রহমত আলীও ট্রেনিং থেকে এসেছে জানতে পেরে আলাউদ্দিনের স্ত্রীর মুখে উচ্ছ্বাস দেখা দেয়। ইনিও তাহলে মুক্তিযোদ্ধা। যাক কোন ভয় নেই। এতোক্ষণ মনে মনে কিছু একটা ভয় কাজ করলেও এতক্ষণে সে ভয়টা কেটে গেছে। এখন আরো সাহসী মনে হচ্ছে তাকে।
-আপনিও মুক্তিযোদ্ধা শুইনা আমার মনটা ভইরা গেল। আমার স্বামীর সাথে দেখা হইলে কইয়েন আমনের বউ আমনেরে নিয়া খুব চিন্তা করে। কবে ফিররা আইবো। তারে কইয়েন আমি ভালা আছি।
– আমনে কোন চিন্তা কইরেন না। আমি তারে খুইজ্যা বাইর করুম। আমনের কথা কমু। আমনে আমারে পানি খাইতে দিছেন। ঠিক আছে আর দেরি করুম না। আমনেরে এই মাঝ রাইতে জাগাইয়া কষ্ট দিছি। তাছাড়া বেশিক্ষণ থাকা ঠিক না। কেউ দেইখা পালাইলে আমনেরও বিপদ, আমারও বিপদ।
– ঠিক আছে আমনে যান। তয় আমার স্বামীরে একটু দেইখা রাইখেন।
-রাখুম, রাখুম। তারে কমু, অমন সুন্দরী বউ থুইয়া তুমি কেমনে যুদ্ধের জন্য ট্রের্নিংয়ে আইতে পারলা মিয়া। বউর জন্য কি কোন টান নাই?
রহমত আলীর মুখে ‘সুন্দরী’ কথা শুনে একটু হাসলো আলাউদ্দিনের স্ত্রী। এ হাসি এক অজানা অচেনা পুরুষকে বিমোহিত করে তোলে। মোমের শিখায় হাওয়া লাগার মতো মনটা দুলতে থাকে। তবুও বিদায় জানিয়ে হাতের হ্যারিকেন ঠিক করে বেরিয়ে পরে রহমত আলী।

Facebook Comments


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়

লালমোহন, ভোলা

মোবাইলঃ 01712740138

মেইলঃ jasimjany@gmail.com

সম্পাদক মন্ডলি

error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!! মোঃ জসিম জনি